বর্ষা শুরু হতেই আবারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। সদ্যসমাপ্ত জুন মাসে এ রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। রাজধানী পেরিয়ে এবার সবচেয়ে বেশি রোগী মিলেছে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৯০৭ জন, যা মে মাসের তুলনায় প্রায় চার গুণ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ১০৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের। শুধু জুনেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন।

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত বরিশাল বিভাগে ১ হাজার ৬২৯ জন। এরপর চট্টগ্রামে ১ হাজার ১৪০ এবং খুলনায় ৭০১ জন। রাজধানীর দুই সিটির মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে এ রোগের রোগী বেশি। সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন ৮৭১ জন, আর ঢাকা উত্তরে ৫৩২ জন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগের দিক হলো সংক্রমণের কেন্দ্র বদলে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও রাজধানী ছিল ডেঙ্গুর প্রধান কেন্দ্র। এখন বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এতে স্থানীয় হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে রাজধানীতেও ঝুঁকি কম নয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিজস্ব জরিপে ২০টি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভার উদ্বেগজনক উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব এলাকাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘এখন থেকে প্রতিদিনই রোগী বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জুলাই ও আগস্টে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এবার ঢাকার তুলনায় ঢাকার বাইরের এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোকে এখনই প্রস্তুত করতে হবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘অনেক রোগী চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে আসতে বাধ্য হন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় পানিশূন্যতা বা প্লাজমা লিকেজের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়।’’

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশার ওষুধ ছিটানো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পানির ট্যাংক, এসির ট্রে, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা যে কোনো স্থানে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলেও তারা মনে করেন। 

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমদ রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘ডেঙ্গু দেশে ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী রোগে পরিণত হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বর্তমান মশক নিধন কার্যক্রম কার্যকর হচ্ছে না।’’

তিনি বলেন, ‘‘সাধারণ মশা নিধন পদ্ধতিতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ জন্য এডিসের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিশেষায়িত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’’