বর্ষা নামলেই চাঁদপুরের নদী-নালা যেমন পানিতে ভরে ওঠে, তেমনি জেগে ওঠে জেলার নৌকা নির্মাণশিল্পও। সড়কের পাশের অস্থায়ী কারখানাগুলোয় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে কাঠ চেরা, তক্তা বসানো আর হাতুড়ির অবিরাম শব্দ। বর্ষা মৌসুম বাড়তি চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগর, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা। তবে এই কর্মচাঞ্চলের আড়ালে রয়েছে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, কমে যাওয়া বিক্রি এবং টিকে থাকার কঠিন বাস্তবতার গল্প।
সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদপুরের আট উপজেলায় নৌকা তৈরির কাজও গতি পায়। বাবুরহাট-মতলব, নারায়ণপুর, মতলব উত্তর, কচুয়া ও হাইমচরের বিভিন্ন সড়কের পাশে গড়ে ওঠা অস্থায়ী কারখানায় তৈরি হচ্ছে ছোট-বড় নানা ধরনের নৌকা। কিছু নৌকা আগেই তৈরি করে রাখা হয়েছে, আবার কিছু নৌকা ক্রেতাদের চাহিদা ও পছন্দ অনুযায়ী বানানো হচ্ছে। কেউ ছোট নৌকা চান মাছ ধরার জন্য, কেউ চান বড় নৌকা পরিবার নিয়ে চলাচলের জন্য।
আরও পড়ুন‘একটা সময় আমাদের এলাকার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই নৌকা তৈরির কাজ হতো। বর্ষা মৌসুম এলেই অন্তত ১০০ থেকে ১৫০টি নৌকা তৈরি করা হতো। তখন নদী-খালভিত্তিক জীবনযাত্রার কারণে নৌকার চাহিদাও ছিল অনেক বেশি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। বর্তমানে পুরো ইউনিয়নে বছরে ৫০ থেকে ১০০টি নৌকাও তৈরি হয় না।’
মৃত্যু থামাতে পারেনি কোটি টাকার বজ্রনিরোধক দণ্ড
নৌকা ব্যবসায়ী হান্নান প্রধানিয়া বলেন, একসময় বর্ষা মৌসুম এলেই নৌকার বাজারে অন্যরকম ব্যস্ততা দেখা যেতো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্রেতারা নৌকা দেখতে আসতেন। অনেক সময় একদিনেই ১০-১৫টি নৌকা বিক্রি হতো। আগে শুধু চাঁদপুরের বিভিন্ন এলাকা নয়, আশপাশের জেলা থেকেও মানুষ এসে নৌকা কিনে নিয়ে যেতো। তখন পুরো মৌসুমে ৩০০ থেকে ৪০০ নৌকা বিক্রি হতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্রও বদলে গেছে।

তিনি বলেন, এখন আর আগের মতো পানি দীর্ঘ সময় থাকে না। আগে বর্ষা শুরু হলে খাল-বিল, নদী-নালা অনেক দিন পানিতে পরিপূর্ণ থাকত। মানুষ চলাচল, মাছ ধরা ও কৃষিকাজের জন্য নৌকার ওপর নির্ভর করতো। বর্তমানে রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন হয়েছে, অনেক এলাকায় সেতু হয়েছে। তাছাড়া বর্ষার পানি আগের মতো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ফলে মানুষের নৌকার প্রয়োজনও কমে গেছে।
আরও পড়ুন
৪ বছরেও জোড়া লাগেনি সাবমেরিন ক্যাবল, আজও অন্ধকারে মদনপুর ইউনিয়ন
‘যারা নৌকা তৈরি করেন, তারা মূলত কুটির শিল্পের আওতাভুক্ত। তবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত কারিগররা কখনো জেলা প্রশাসনের কাছে কোনো ধরনের সহযোগিতা বা সমস্যার কথা নিয়ে আসেননি। যদি তারা মনে করেন এই ঐতিহ্যবাহী পেশা টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ বা আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন, তাহলে জেলা প্রশাসন তাদের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত।’
হান্নান প্রধানিয়া বলেন, বর্তমানে কাঠ, পেরেক, লোহার পাত, রং, তেলসহ সব ধরনের মালামালের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরিও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় নৌকার বিক্রি বাড়েনি। একটি নৌকা তৈরি করতে যে খরচ হয়, অনেক সময় বিক্রি করে তেমন লাভ থাকে না। তারপরও দীর্ঘদিনের এই পেশা ছেড়ে দেওয়া কঠিন। কারণ এই কাজের সঙ্গে আমাদের জীবন ও জীবিকা জড়িয়ে আছে।
মতলব দক্ষিণ উপজেলার আড়ং বাজার এলাকার ক্রেতা মো. সুমন বলেন, আমাদের গ্রামাঞ্চলে এখনো বর্ষা মৌসুমে নৌকার প্রয়োজন অনেক বেশি। বিশেষ করে বর্ষার সময় রাস্তাঘাট পানির নিচে চলে গেলে মানুষের চলাচলের জন্য নৌকাই ভরসা হয়ে ওঠে। এছাড়া মাছ ধরা, গবাদিপশুর খাবার সংগ্রহ করা কিংবা বিভিন্ন কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও নৌকার প্রয়োজন পড়ে।
তিনি বলেন, একটি ভালো মানের নৌকা কিনলে দুই থেকে তিন বছর অনায়াসে ব্যবহার করা যায়। তাই অনেকে একটু বেশি দাম হলেও ভালো নৌকা কেনার চেষ্টা করেন। কারণ কম দামের নৌকা খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তখন আবার নতুন করে টাকা খরচ করতে হয়।
আরও পড়ুন
অস্তিত্ব সংকটে হোসনিগঞ্জের বেতশিল্প, পেশা ছাড়ছেন কারিগররা
আরেক ক্রেতা সেলিম মিয়াজী বলেন, যারা নৌকা তৈরি করেন তাদের কাছে বিভিন্ন আকার ও মানের নৌকা পাওয়া যায়। ছোট নৌকার দাম একরকম, মাঝারি ও বড় নৌকার দাম ভিন্ন। সাধারণ মানের একটি নৌকা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। তবে কম দামে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায়ও নৌকা পাওয়া যায়, কিন্তু সেগুলো বেশি দিন টেকে না।
নৌকা তৈরির কারিগর মো. রাসেল জানান, বর্ষা মৌসুম এলেই আমাদের কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। একটি নৌকা তৈরি করতে অনেক ধাপ রয়েছে। প্রথমে কাঠ নির্বাচন, তারপর কাঠ চিরানো, তক্তা তৈরি, মাপ অনুযায়ী কাঠ বসানো, পরে লোহার পাত ও পেরেক দিয়ে জোড়া লাগানোর কাজ করতে হয়।

তিনি আরও জানান, একটি নৌকা তৈরি করতে একজন মিস্ত্রির প্রায় দুই দিনের শ্রম লাগে। বর্তমানে একজন শ্রমিককে দৈনিক প্রায় এক হাজার টাকা মজুরি দিতে হয়। পাশাপাশি কাঠসহ অন্যান্য সরঞ্জামের দামও অনেক বেড়েছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করি ক্রেতাদের সাধ্যের মধ্যে ভালো মানের নৌকা তৈরি করে দিতে।
‘একটি নৌকা তৈরি করতে একজন মিস্ত্রির প্রায় দুই দিনের শ্রম লাগে। বর্তমানে একজন শ্রমিককে দৈনিক প্রায় এক হাজার টাকা মজুরি দিতে হয়। পাশাপাশি কাঠসহ অন্যান্য সরঞ্জামের দামও অনেক বেড়েছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করি ক্রেতাদের সাধ্যের মধ্যে ভালো মানের নৌকা তৈরি করে দিতে।’
চাঁদপুর সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোস্তাফা কাজী বলেন, একটা সময় আমাদের এলাকার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই নৌকা তৈরির কাজ হতো। বর্ষা মৌসুম এলেই অন্তত ১০০ থেকে ১৫০টি নৌকা তৈরি করা হতো। তখন নদী-খালভিত্তিক জীবনযাত্রার কারণে নৌকার চাহিদাও ছিল অনেক বেশি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। বর্তমানে পুরো ইউনিয়নে বছরে ৫০ থেকে ১০০টি নৌকাও তৈরি হয় না।
তিনি আরও বলেন, প্রধান কারণ হলো নদী-খাল আগের মতো আর মাছসমৃদ্ধ নেই। একসময় বর্ষায় চারদিকে টইটম্বুর পানি থাকতো, খাল-বিল পানিতে ভরে যেত এবং প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। এখন বর্ষার পানিও আগের মতো থাকে না, ফলে মাছও অনেক কমে গেছে। এছাড়া গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপকভাবে সড়ক ও সেতু নির্মাণ হওয়ায় মানুষের যাতায়াতের জন্য নৌকার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে। এসব কারণে নৌকা তৈরির ঐতিহ্যবাহী পেশাটিও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জানান, আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, আগের তুলনায় নৌকা তৈরির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তবে বর্তমানে জেলায় বছরে ঠিক কতটি নৌকা তৈরি হয় বা কতটা কমেছে এ ধরনের নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই।
মৎস্য কর্মকর্তা আরও বলেন, আগে নৌকা তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বর্ষা মৌসুমে মাছ শিকার, নদীপথে যাতায়াত এবং মানুষ পারাপার করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদী, খাল ও বিলের পরিমাণ কমেছে, মাছের উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় অসংখ্য সড়ক ও সেতু নির্মাণ হওয়ায় নৌকার ব্যবহারও অনেক কমে গেছে। ফলে নৌকা তৈরির চাহিদা কমেছে এবং যারা একসময় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেই জীবিকার প্রয়োজনে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. এরশাদ উদ্দিন বলেন, যারা নৌকা তৈরি করেন, তারা মূলত কুটির শিল্পের আওতাভুক্ত। তবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত কারিগররা কখনো জেলা প্রশাসনের কাছে কোনো ধরনের সহযোগিতা বা সমস্যার কথা নিয়ে আসেননি। যদি তারা মনে করেন এই ঐতিহ্যবাহী পেশা টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ বা আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন, তাহলে জেলা প্রশাসন তাদের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন ও বিসিক শিল্প নগরীর মাধ্যমেও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব। আমরা চাই এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প টিকে থাকুক। তবে এজন্য কারিগরদেরও এগিয়ে এসে তাদের সমস্যা ও চাহিদার বিষয়গুলো আমাদের জানাতে হবে। তাহলেই তাদের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা সহজ হবে।
এনএইচআর/জেআইএম








