দেশের চামড়া শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সাভার ট্যানারি এস্টেটের সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) বা কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার আধুনিকায়ন এবং কমপ্লায়েন্সের (পরিবেশগত মানদণ্ড) উন্নয়ন ঘটাতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই তথ্য জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) শাহজাহান চৌধুরীর আনা এক নোটিশের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকার সাভার সিইটিপির বর্জ্য শোধন ক্ষমতা দৈনিক ২৫,০০০ ঘনমিটারে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি এই খাতের পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স আরও জোরদার করতে সেখানে আরেকটি সিইটিপি স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অত্যন্ত সহনীয়: সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী

এর আগে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পের ক্রমাগত ধসের দিকে বাণিজ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কাঁচা চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, রপ্তানি সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং সাভার ট্যানারি এস্টেটের সিইটিপি সংকট সমাধানে তিনি সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেন।

তিনি উল্লেখ করেন, পাটের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই রপ্তানি খাতটি বর্তমানে তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ২০১৮ সালে যেখানে এই খাতের রপ্তানি আয় ছিল ১.২ বিলিয়ন (১২০ কোটি) ডলার, তা কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭০০ মিলিয়ন (৭০ কোটি) ডলারের নিচে নেমে এসেছে। কমপ্লায়েন্স সমস্যা এবং সাভারের সিইটিপি সংকটের কারণে ১ লাখেরও বেশি শ্রমিকের জীবিকা এখন হুমকির মুখে।

তিনি আরও বলেন, সাভার ট্যানারি কমপ্লেক্সটি এখনো আন্তর্জাতিক মানের সনদ (সার্টিফিকেশন) পায়নি, যার ফলে বড় বড় বৈশ্বিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে ক্রমান্বয়ে অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছে। তিনি চামড়া খাতে রপ্তানি নগদ প্রণোদনা বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যে বিশেষ সহায়তা প্রদান, কাঁচা চামড়া পাচার রোধ এবং চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে একটি মনিটরিং কমিটি গঠনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন

জানালেন বাণিজ্যমন্ত্রী / টেকসই উত্তরণের জন্য এলডিসি প্রস্তুতিকাল বাড়াতে চায় সরকার

জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর মূলত কমপ্লায়েন্স বা মানদণ্ড বজায় রাখতে না পারার কারণেই চামড়া খাত এই সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

তিনি বলেন, ১৫-২০ বছর আগে বেশিরভাগ ট্যানারি যখন হাজারীবাগে ছিল, তখন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কমপ্লায়েন্সের বিষয়ে এতটা কঠোর ছিল না। হাজারীবাগের অপরিশোধিত ট্যানারি বর্জ্য আশেপাশের জলাশয়গুলোতে মিশে পরিবেশ দূষণ করায় সাভারে স্থানান্তর জরুরি হয়ে পড়েছিল, তবে স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায়নি। স্থানান্তরের পর অনেক ট্যানারি মালিক তাদের ব্যবসায়িক গতি হারিয়ে ফেলেন এবং পুনরায় কার্যকরভাবে কার্যক্রম শুরু করতে ব্যর্থ হন।

বিদ্যমান সিইটিপির বেশ কিছু দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এর ধারণক্ষমতা সীমিত এবং এতে কোনো ‘ক্রোমিয়াম রিকভারি সিস্টেম’ নেই। তাছাড়া অনেক ট্যানারিতে নিজস্ব বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা (ইটিপি) নেই।

তিনি জানান, সাভার সিইটিপি দৈনিক প্রায় ২৫,০০০ ঘনমিটার বর্জ্য শোধনের জন্য ডিজাইন করা হলেও বর্তমানে এটি কেবল ১৪,০০০ থেকে ১৭,০০ ঘনমিটার বর্জ্য শোধন করতে পারছে। আন্তর্জাতিক চামড়া শিল্প সনদ প্রদানকারী সংস্থা ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (এলডব্লিউজি) এর সার্টিফিকেট পেতে হলে পরিবেশ ও কমপ্লায়েন্সের একগুচ্ছ মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। কিন্তু নিজস্ব বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা না থাকায় সাভারের অনেক ট্যানারিই এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, এই কমপ্লায়েন্সের ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের চামড়ার গ্রহণযোগ্যতা কমে গেছে, যা কাঁচা চামড়ার চাহিদা ও মূল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে কোরবানির পশুর চামড়া থেকে ঐতিহ্যগতভাবে উপকৃত হওয়া কওমি মাদরাসাসহ বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন

পাঁচ-সাতটি খাতেই বদলে যেতে পারে দেশের রপ্তানি অর্থনীতি: বাণিজ্যমন্ত্রী

চামড়া খাতের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পশু জবাইয়ের পর কাঁচা চামড়া যাতে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সেজন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশে ঈদুল আজহার মৌসুমে প্রায় ১ কোটি পশু কোরবানি হয়, যা এই শিল্পের জন্য একটি বিশাল সুযোগ। তবে চামড়ার গুণগত মান ঠিক রাখতে সঠিক পদ্ধতিতে চামড়া ছাড়ানো এবং জবাইয়ের ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে লবণ লাগানো অত্যন্ত জরুরি। সরকার এই দক্ষতা ছড়িয়ে দিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরকারের পরিকল্পনা হলো বর্জ্য শোধনের মূল দায়িত্ব দুটি কেন্দ্রীয় সিইটিপির ওপর রাখা, পাশাপাশি নির্দিষ্ট আকারের চেয়ে বড় ট্যানারিগুলোর জন্য নিজস্ব বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা (ইটিপি) বাধ্যতামূলক করা। ব্যবসায়ীদের কমপ্লায়েন্স অর্জন এবং এলডব্লিউজি সনদ পেতে কারিগরি ও প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে। এছাড়া যেসব ট্যানারি আর্থিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে এবং ব্যবসা চালাতে পারছে না, তাদের চিহ্নিত করে একটি ‘সম্মানজনক বিদায়’ (গ্রেসফুল এক্সিট) দেওয়া হবে, যাতে তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির শিকার না হয়।

মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ পুনরায় পূর্ণ চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্ষমতা ফিরে পাবে, সম্পূর্ণ কমপ্লায়েন্স অর্জন করবে এবং ভবিষ্যতে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতকে ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় রপ্তানি খাতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।

আলোচনাকালে শাহজাহান চৌধুরী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে এবারের ঈদুল আজহায় লাখ লাখ কাঁচা চামড়া নষ্ট বা ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে খবর এসেছে। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী সরকারগুলো চামড়া ব্যবসায়ীদের ঋণ দিত এবং ঈদের মৌসুমে লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করতো।

উত্তরে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, সরকার জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ বিতরণ করেছে। এছাড়া জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্বাচিত মাদরাসা শিক্ষক ও দায়িত্বরতদের চামড়া সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঈদের আগে প্রায় ৮ লাখ লিফলেট বিতরণ এবং টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সচেতনতা চালানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

বাণিজ্যমন্ত্রী / অনলাইনভিত্তিক ওয়ান-স্টপ সেবা চালুর উদ্যোগ জোরদার করছে সরকার

মন্ত্রীর দেওয়া সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এবারের ঈদুল আজহায় সারাদেশে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছে এবং সরকার দেশব্যাপী প্রায় ৭০ লাখ চামড়া সংরক্ষণ করতে পেরেছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সাভার ট্যানারিতে পৌঁছেছে।

সাভার সিইটিপির ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে সরকার জেলা প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ঈদের পর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ঢাকায় চামড়াবাহী ট্রাক প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল, যাতে সংরক্ষিত চামড়াগুলো ধাপে ধাপে সাভারে পৌঁছাতে পারে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার সচেতনভাবেই বাজারে ঢালাওভাবে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বা লোন সরবরাহ করেনি। কারণ অনেক নন-কমপ্লায়েন্ট ট্যানারির আর্থিক গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং সেই অর্থ থেকে সঠিক রিটার্ন নাও আসতে পারত। এর পরিবর্তে এই খাতকে স্থিতিশীল করতে সরকার প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে।

এমওএস/এমএমকে