রাজধানীর মিরপুরে ব্যবসায়ী আফরোজ উদ্দিনের বাসায় ককটেল হামলার ঘটনায় মামলা করায় এজাহারভুক্ত আসামিরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর ছেলে মোহাইমিন ইসলাম ওরফে আশিকের ওপর হামলার চেষ্টা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার রাতে ব্যবসায়ী মোহাইমিন তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাসায় ফেরার সময় মিরপুরের উত্তর বিশিল এলাকায় এই ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

আজ বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশের মিরপুর বিভাগের কর্মকর্তারা আফরোজ উদ্দিনের ছেলের ওপর হামলার চেষ্টা ও হুমকির ঘটনায় দুই থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হওয়ার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন।

আফরোজ উদ্দিন অভিযোগ করেন, ৯ দিন আগে একই সন্ত্রাসীরা তাঁর বাসা লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করে। ওই ঘটনার ৯ দিন পরেও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করেনি। এই সুযোগে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তাদের হত্যার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় তারা বাসা থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। গোটা পরিবার আতঙ্কে আছে। আজ পুলিশের সহায়তা চেয়ে তিনি মিরপুর ও শাহ আলী থানায় পৃথক দুটি জিডি করেন।

পুলিশ বলেছে, এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নেতৃত্বে অভিযান চালানো হচ্ছে।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ২৩ জুন দুপুরে দুই সন্ত্রাসী অটোরিকশায় এসে মিরপুর ২ নম্বরের ‘ই’ ব্লকে আফরোজ উদ্দিনের বাসায় ককটেল ছুড়ে পালিয়ে যায়। ককটেলটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বাড়ির প্রধান ফটকে থাকা একটি মিনিট্রাকে লেগে বিস্ফোরিত হয়। এতে ট্রাকের ওপর থাকা ফুলের টব ও গাছ পুড়ে যায়। হামলার দৃশ্য সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

মিরপুর থানার পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া হামলাকারী সালাউদ্দিন ও করিমকে শনাক্ত করা হয়েছে।

আফরোজ উদ্দিনের ছেলে মোহাইমিনের ওপর হামলার চেষ্টার ঘটনায় শাহ আলী থানায় করা জিডিতে বলা হয়, গতকাল রাত সোয়া ১০টার দিকে মোহাইমিন তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে এক আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে বাসায় ফিরছিলেন। এ সময় সালাউদ্দিন ও করিমের নেতৃত্বে অজ্ঞাতনামা দুই-তিন ব্যক্তি তার মোটরসাইকেল থামাতে বলে। একপর্যায়ে মোহাইমিন মোটরসাইকেল না থামিয়ে দ্রুত চালিয়ে যাওয়ার সময় তারা চিৎকার করে মোহাইমিনকে অকথ্য গালাগাল দেন এবং পরিবারকে বিভিন্নভাবে ক্ষতি করার হুমকি দেন।

এ ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় করা আরেকটি জিডি করেছেন আফরোজউদ্দিন। তাতে তাঁর মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা যেকোনো সময় তাকে গুলি করে ও বোমা মেরে মেরে ফেলতে পারে আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।

আফরোজ উদ্দিন মিরপুরে আলোচিত ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন হত্যা মামলার বাদী ও তাঁর ছোট ভাই। ২০০৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর মিরপুর ২ নম্বর সেকশনে ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। আফতাব উদ্দিন মিরপুর ১ নম্বরের মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ওই ঘটনায় আফরোজ উদ্দিন বাদী হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদতসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। র‍্যাব-৪ তদন্ত শেষে শাহাদতসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। আসামিদের মধ্যে শাহাদত ও খোরশেদ একাধিক হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে তাঁরা বিদেশে পলাতক বলে পুলিশের ধারণা।

আফরোজ উদ্দিনের অভিযোগ, আফতাব উদ্দিন হত্যা মামলাটি তুলে নিতে এজাহারভুক্ত আসামিরা তাঁকে নিয়মিত হুমকি দিচ্ছিল। ওই মামলায় তিনি ও অন্য সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেওয়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদত হোসেন, খোরশেদ ও ‘ডিশ’ শাহীন ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে হত্যার পাঁয়তারা করছে। এর জের ধরেই গত ২৩ জুন তাঁর মিরপুরের বাসায় ককটেল হামলা চালানো হয়।

আদালত সূত্র জানায়, ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই মামলাটি ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ হিসেবে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে এ নিয়ে প্রথম আলোতে সংবাদ প্রকাশের পর হাইকোর্টের নির্দেশে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। ২০১৬ ও ২০২১ সালে মামলাটি নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হলেও বর্তমানে এটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩-এ সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।

আফরোজ উদ্দিন বলেন, প্রভাবশালী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ২১ বছর ধরে নানাভাবে এই মামলার বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত করছে। একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে হয়রানি করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।