সংকটে থাকা টেক্সটাইল শিল্পের দিকে নজর দিল সরকার। দেশীয় সুতা ব্যবহারে নগদ সহায়তা দেড় শতাংশ থেকে বাড়িয়ে পাঁচ শতাংশ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করতে বৃহস্পতিবার একটি চিঠি বাংলাদেশ ব্যাংককে পাঠিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা নেওয়ার আগে দেশীয় উৎস থেকে সুতা বা কাপড় সংগ্রহের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে। এই সুবিধা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশীয় সুতা ব্যবহারে ৪ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হতো। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির অজুহাতে সহায়তা কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়। এর ছয় মাস সেই সহায়তা কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়। তখন এই সিদ্ধান্তকে টেক্সটাইল মিল মালিকরা ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর থেকেই বাংলাদেশে ভারতীয় সুতা আমদানি বাড়তে থাকে।
অথচ ভারত অঞ্চলভেদে টেক্সটাইল শিল্পে বিকল্প সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন ও বিনিয়োগ পিএলআই স্কিমের (প্রডাকশন লিংকড ইনসেনটিভ) আওতায় ম্যান-মেড ফাইবার পোশাক, ফেব্রিক এবং টেকনিক্যাল টেক্সটাইল উৎপাদনে প্রায় ১০ হাজার ৬৮৩ কোটি রুপির আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে দেশটি। টিম (টেক্সটাইল এক্সপানসন অ্যান্ড ইমপ্লয়মেন্ট) স্কিমের আওতায় ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইল ক্লাস্টারগুলোর আধুনিকীকরণ, নতুন যন্ত্রপাতি কেনা এবং টেস্টিং সেন্টার তৈরির জন্য সরাসরি ক্যাপিটাল বা মূলধনী সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়া ভারতজুড়ে সাতটি মেগা সমন্বিত টেক্সটাইল পার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। উদ্যোক্তারা এক ছাদের নিচে প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে (প্রস্তুতকৃত কারখানা) উৎপাদন সুবিধা, উন্নত লজিস্টিকস এবং কম খরচে বিশ্বমানের অবকাঠামো ব্যবহারের সুবিধা পান।
এছাড়া ভারতে টেক্সটাইল শিল্পের কাঁচামাল ও শুল্কসংক্রান্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে। পলিয়েস্টার, ভিসকোজ স্ট্যাপল ফাইবারের মতো কৃত্রিম কাঁচামাল এবং বিশেষায়িত টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি বিশেষ করে শাটল-লেস লুম (বুননযন্ত্র) আমদানিতে শুল্কের ওপর বড় ছাড় দেওয়া হচ্ছে। রোডট্যাপ স্কিমের আওতায় পণ্য উৎপাদনে এবং পরিবহণে ব্যয় হওয়া সব অভ্যন্তরীণ কর ও শুল্কের শতভাগ রিফান্ড বা ফেরত পাওয়া যায়। দেশটিতে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে টেক্সটাইল খাতে প্রতিটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিপরীতে নিয়োগকর্তাদের আর্থিক প্রণোদনা ও মজুরি ভর্তুকি দেওয়া হয়। সামর্থ্য ২.০ স্কিমের আওতায় কারখানার শ্রমিক ও কারিগরদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও পরিচালনা করা হয়।
কাস্টমসের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ ২০২২-২৩ অর্থবছরে সুতা আমদানি করে ১৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকার। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ওই সিদ্ধান্তের পর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২১ হাজার ১৪২ কোটি টাকার সুতা আমদানি হয়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সুতা আমদানি হয়েছে ভারত থেকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশে এই ধরনের নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। বিশেষ করে গত কয়েক মাস ধরে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পোশাক ও বস্ত্র খাতের মালিকরা চরম চাপের মধ্যে ছিলেন। সরকারের এই ৫ শতাংশ নগদ সহায়তার সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে আসবে। তারা বলছেন, দেশীয় সুতা ও কাপড় ব্যবহারের শর্ত থাকায় এই সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে যেমন স্থানীয় স্পিনিং ও উইভিং মিলগুলো লাভবান হবে, অন্যদিকে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দেশীয় মূল্য সংযোজন (লোকাল ভ্যালু এডিশন) অনেক বাড়বে। এতে ডলার সাশ্রয়ের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে কর্মসংস্থানও সুরক্ষিত থাকবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘টেক্সটাইল খাতে নগদ সহায়তা বাড়ানোর সিদ্ধান্তে সংকটে থাকা স্পিনিং মিলগুলো শ্বাস নিতে পারবে। ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে। তবে টেক্সটাইল মিলগুলো এখনো কিছু নীতিগত বৈষম্যের শিকার। যেমন, গার্মেন্টসের করপোরেট কর ১২ শতাংশ, কিন্তু একই প্রকৃতির ব্যবসা করে টেক্সটাইলের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর দিতে হয়। আমরা আশা করেছিলাম, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার বিষয়টি সুরাহা করবে। তাছাড়া মূল্য সংযোজন শর্ত শিথিল করে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় উপকরণ আমদানি সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত টেক্সটাইল শিল্পের জন্য নতুন ঝুঁকি।








