বাবার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি। এরপর ২৫ বছর ধরে নিয়েছেন সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আলোচিত সেই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলামকে বদলি করা হয়েছে। জাল সনদে নিয়োগ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে ‘সালামি’ হিসাবে মোটা অঙ্কের ঘুস নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, যা নিয়ে দুদকের তদন্তও চলমান। এতসব চাঞ্চল্যকর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে সাময়িক বরখাস্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু বদলির সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে শুধু বদলি করা কার্যত দায় এড়ানোর শামিল। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তার নিয়োগই অবৈধ হিসাবে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে ২৫ বছরের চাকরি, পদোন্নতি, বেতন-ভাতা ও সরকারি সুবিধাসহ সবকিছুই আইনি প্রশ্নের মুখে পড়বে।
জানতে চাইলে বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) অতিরিক্ত সচিব এসএম লাবলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান চলছে। অধিকতর তদন্ত শেষে প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বুধবার বেবিচকের প্রশাসন বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. তিরান হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে শরিফুল ইসলামের বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। আদেশ অনুযায়ী, সিভিল সার্কেল প্রকল্পে কর্মরত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামকে পিডিকিউ অ্যান্ড কিউএস সার্কেলে পদায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে ওই সার্কেলে সংযুক্ত রেখে পরিচালক (অ্যারোড্রাম স্ট্যান্ডার্ড), এফএস অ্যান্ড আর বিভাগে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১১ জুন যুগান্তরের প্রতিবেদনে উঠে আসে, ২০০১ সালে বাবার নামে একটি মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পান শরিফুল ইসলাম। পরে সরকারি মুক্তিযোদ্ধা গেজেট ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা ডেটাবেজ যাচাই করে দেখা যায়, তার বাবার নাম কোথাও নেই। এমনকি তার চাকরিসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় চারটি পৃথক মুক্তিযোদ্ধা সনদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। চারটি সনদে চার ধরনের ইস্যুর তারিখ, ভিন্ন ভিন্ন স্মারক নম্বর এবং আলাদা আলাদা স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো সনদে জেনারেল এমএজি ওসমানীর, কোনো সনদে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের, কোনো সনদে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবং অন্য একটি সনদে সেক্টর কমান্ডার আহাদ চৌধুরীর স্বাক্ষর রয়েছে। সরকারি গেজেট ও জাতীয় ডেটাবেজে তার বাবার নাম অনুপস্থিত থাকায় এসব সনদের বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠে। সে সময় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকলে কাউকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। মুক্তিযোদ্ধার সরকারি তালিকা ও গেজেটই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ভিত্তি।
যুগান্তরের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি আমলে নেয় বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। ১৬ জুন মন্ত্রণালয় থেকে বেবিচক চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে প্রকাশিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগও : শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুধু ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদের অভিযোগই নয়, বেবিচকের একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, কাওলা আবাসিক কোয়ার্টার রক্ষণাবেক্ষণে অর্থ আত্মসাৎ এবং কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্তও চলমান।
এমনকি ঠিকাদারদের একটি অংশের কাছে প্রকৌশলী শরিফুল ‘সালাম স্যার’ নামেই পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, তার দপ্তরে কোনো ঠিকাদার কাজের বিষয়ে গেলে শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ বা খোঁজখবর নেওয়াই যথেষ্ট ছিল না; তাকে ‘সালাম’ জানাতে হতো মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে। সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, এই ‘সালাম’র মূল্য ছিল প্রায় এক লাখ টাকা।
এক ভুক্তভোগী ঠিকাদার যুগান্তরকে বলেন, একবার একটি ফাইলের অগ্রগতি জানতে আমি তার দপ্তরে যাই। তখন তিনি বলেন, ‘খালি হাতে সালাম দিতে আসবেন না।’ পরে বাধ্য হয়ে তাকে এক লাখ টাকা দিতে হয়েছে।
এতসব অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু বদলি করায় প্রশ্ন উঠেছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত কি একজন অভিযুক্ত কর্মকর্তা একইভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, নাকি তাকে বিভাগীয়ভাবে সাময়িক অব্যাহতি দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা হবে?
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, শুধু বদলি কোনো শাস্তি নয়। যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে তিনি অবৈধ বা জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি নিয়েছেন, তাহলে তার পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াই অবৈধ। সেক্ষেত্রে এত বছর চাকরি করা, পদোন্নতি নেওয়া এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ সবই আইনের আওতায় পর্যালোচনার বিষয়। এমন ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের জালিয়াতি চলতেই থাকবে।







