বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় এ খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা আগের তুলনায় কমানো হয়েছে। তবে ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানোর পদক্ষেপ নেওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আগের চেয়ে বাড়বে বলে আশাবাদী কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে নীতি সুদের হারসহ সব ধরনের নীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম হবে, তবে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যেই নামানো সম্ভব হবে বলে আশা সংস্থাটির। এসব আশাবাদ ব্যক্ত করে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। শুরুতে মুদ্রানীতির ওপর একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যান্য ডেপুটি গভর্নরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আজ ১ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে নতুন অর্থবছর। ফলে নতুন মুদ্রানীতিও আজ থেকে কার্যকর হবে।
চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। পুরো অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ শতাংশ। মঙ্গলবার শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ পুরো অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কমেছে। এদিকে চলতি অর্থবছরের মে পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। বিদায়ি জুনের তথ্যসহ চলতি অর্থবছরে এ খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। এ খাতে ঋণপ্রবাহ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বৃদ্ধি না পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর কারণে ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়বে।
মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় নীতি সুদহার (পলিসি রেট) আগের মতোই ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর আন্তঃব্যাংক ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে নীতি সুদহার স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে। ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে টাকা রাখার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সুদহার অর্থাৎ স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) আগের মতো ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নতুন মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবীবুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার পর বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেখানে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হওয়া উচিত, সেখানে বর্তমানে তা ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এই নীতিগত অবস্থানের ফলে ছয় মাসের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইতিবাচক উদ্দীপনা দেখা যাবে এবং বাজারের মূল্যস্ফীতিও ক্রমান্বয়ে কমে আসবে।
মুদ্রানীতিতে বলা হয়, সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন অর্থবছরের জন্য জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এই লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুদ্রানীতি করেছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৭ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে, যা সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম।
অনুষ্ঠানে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৮ মাসের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসের নীতি সোমবার জারি করা হয়েছে। নতুন এ নীতিমালার আওতায় আর্থিক সংকটে আছেন, তবে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। এখন আর আগের মতো পুনঃতফসিলীকরণ একেবারেই উৎসাহিত করা হচ্ছে না।
গভর্নর আরও জানান, আগামী বছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি আইন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি হচ্ছে অর্থঋণ আদালত আইন এবং অন্যটি সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন। সরকারের কাছে প্রস্তাব, যেন এই আদালতের বিচার প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে শেষ হয়। বর্তমানে অর্থঋণ আদালত বা অন্য আদালতে মামলাগুলো দীর্ঘ সময় চলে। সেই সুযোগ কমানোর জন্যই এই সুপারিশ। এ আইন পাশ হলে ২০২৭ সালে বিষয়টি ভিন্নমাত্রা পাবে। নতুন আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ক্ষতিকর সম্পদ নির্দিষ্ট সীমার বাইরে নিজেদের আর্থিক বিবরণীতে রাখা যাবে না, বরং তা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হবে।
ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে যে কোনো ধরনের বিচ্যুতি বা অনিয়মের ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি পালন করা হবে বলে জানান গভর্নর। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং সুপারভিশন বিভাগকে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে, ব্যাংক খাতে কোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে শাস্তি সর্বোচ্চ দিতে হবে। আগে হয়তো সর্বনিম্ন মাত্রার শাস্তি দেওয়া হতো।
মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ডিসেম্বরের মধ্যে সাড়ে ২১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পুরো অর্থবছরের জন্য ১৭ দশমিক ২ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ১০ শতাংশ এবং পুরো অর্থবছরে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, নতুন গভর্নর ও নতুন সরকারের আমলে এটিই প্রথম মুদ্রানীতি।








