সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় এক মিনিটের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ৯২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এতে আহত হয়েছে কয়েক হাজার হাজার মানুষ। ৫০ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

এরই মধ্যে ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া এক বাবার আকুতি—‘আমাকে টেনে তুলবেন না, আমার মেয়েরা আমার হাত ধরে আছে’—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে।

শেয়ার করা এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নেটিজেনদের একটি বড় অংশ দাবিটিকে সত্য মনে করে কমেন্ট করেছেন।

শেয়ার করা এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নেটিজেনদের একটি বড় অংশ দাবিটিকে সত্য মনে করে কমেন্ট করেছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ২৪ জুন ভেনেজুয়েলায় সংঘটিত ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বেশ কিছু মানবিক ঘটনার সত্যতা (, , )পাওয়া গেলেও আলোচিত দাবির বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে মেক্সিকান গণমাধ্যম ‘TV Azteca Bajio’–এর ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাটি ১৯৯৯ সালের ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভার্গাস ট্র্যাজেডিকে ঘিরে, যেখানে টানা ভারী বৃষ্টির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভূমিধস, কাদাপানির স্রোত ও আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এতে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান এবং প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেই দুর্যোগের সময় ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া এক বাবা উদ্ধারকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাকে বের করবেন না, আমার দুই মেয়ে এখনও আমার হাত ধরে আছে।’ যা পরবর্তীতে ভার্গাস ট্র্যাজেডির অন্যতম মানবিক গল্প হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচারিত ও আলোচিত হয়ে আসছে।

একই তথ্য পাওয়া যায়, সম্প্রতি শেয়ার করা বেশকিছু (, , ) ফেসবুক পোস্ট থেকেও।

তবে ছবিটি বাস্তব কোনো উদ্ধার অভিযানের কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও অনুসন্ধানে ব্রাজিলের ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা‘Aos Fatos’-এর একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।

চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক ব্যক্তি উদ্ধারকারীদের বলছেন, ‘আমাকে টেনে বের করবেন না, আমার মেয়েরা এখনও আমার হাত ধরে আছে’—দাবি সংবলিত এই ছবিটি কোনো বাস্তব উদ্ধার অভিযানের ছবি নয়, বরং এটি একটি অভিনীত দৃশ্য। মূলত, ২০০৭ সালে নির্মিত ‘Sofía y Daniela’ নামে ভেনেজুয়েলার একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের দৃশ্য (,) এটি। চলচ্চিত্রটি ১৯৯৯ সালের সেই ‘ভার্গাস ট্র্যাজেডি’-কে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হয়।

এ ছাড়া, যে গল্পের ভিত্তিতে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে, অর্থাৎ এক বাবা ধ্বংসস্তূপে আটকে থেকে মেয়েদের হাত না ছাড়ার কারণে উদ্ধার হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, সেই ঘটনারও কোনো নথি, ভিডিও বা সংবাদ প্রতিবেদনের কোনো প্রমাণ মেলেনি।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে তুরস্কের কাহরামানমারাস শহরে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে মৃত ১৫ বছর বয়সী মেয়ে ইরম্ক হ্যানসারের হাত ধরে বসে থাকা বাবা মেসুত হানসারের ছবিটি তখন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করেছিল। তবে ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্প নিয়ে আলোচিত দাবির সপক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ভেনেজুয়েলায় সম্প্রতিক জোড়া ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া বাবার আকুতির দাবিটি বানোয়াট। মূলত, ২০০৭ সালে ভেনেজুয়েলার ‘ভার্গাস ট্র্যাজেডি’র প্রেক্ষাপটে নির্মিত একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের দৃশ্যকে আলোচিত দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।