বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রায় স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে আরও বেশি চীনা বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব প্রত্যাশা করছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছে ঢাকা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত মাসে প্রথম সরকারি সফরে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। এই সফরকে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির নতুন দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সফরের জন্য এই দুটি দেশ বেছে নেওয়া বাংলাদেশের কৌশলগত অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ প্রচেষ্টার প্রতিফলন। যদিও তারেক রহমান প্রথমে মালয়েশিয়া সফর করেন, তবে চীন সফরকেই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার নবনির্বাচিত নেতাদের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে ভারতই ছিল সাধারণ ও প্রথম পছন্দ। ভারতীয় নীতি নির্ধারকদের একাংশ তারেক রহমানের চীন সফরকে দিল্লির উদ্দেশে একটি বার্তা হিসেবেও দেখেছেন। কারণ, ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের নেতা শেখ হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল ভারত।
দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন চুক্তির মধ্যে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় বেইজিংয়ের সহযোগিতা চাওয়া এবং মোংলা বন্দরের কাছে চীনের সহযোগিতায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার চুক্তি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার নিয়ে এশিয়ার দুই পরাশক্তি ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এই বিষয়গুলো দিল্লি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের অবনতি ঘটে। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও কূটনৈতিক সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। ভারত সে সময় ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের সফর এড়িয়ে চলে।
তবে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল বিজয় অর্জনের পর তারেক রহমান সরকার গঠন করলে দুই দেশই সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তুলনামূলকভাবে কমেছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’ তিনি বলেন, ‘সীমান্তপারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে এবং ভারতও বাংলাদেশিদের জন্য আবার পর্যটন ভিসা দেওয়া শুরু করেছে।’
দেড় বছরের বিরতির পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যাত্রীবাহী বাস চলাচল আংশিকভাবে পুনরায় চালু হয়েছে। বর্তমানে কলকাতা-ঢাকা এবং ঢাকা-আগরতলা রুটে বাস চলাচল করছে। চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়লে ভারত সীমান্তবর্তী ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে কয়েক হাজার টন জ্বালানি বাংলাদেশে পাঠায়।
গত মাসে ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিরল এক পদক্ষেপ হিসেবে দিল্লি তাঁকে মন্ত্রিসভার সদস্যের সমমর্যাদা দেয়, যা দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের আগ্রহের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং উভয় দেশের পাল্টাপাল্টি বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যার বড় অংশই ভারতের অনুকূলে ছিল।
তবু ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত মাত্রায় এগোয়নি। দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে এখনো বিভিন্ন অস্বস্তিকর বিষয় রয়ে গেছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে সমর্থন দেওয়ায় ভারতবিরোধী জনমত বেশ জোরালো। পাশাপাশি, অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর প্রচেষ্টা ঢাকায় বিতর্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত যথাযথ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই মূলত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমসহ হাজার হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে। বাংলাদেশি বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নির্বাচনের সময় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকদের বাংলাদেশবিরোধী উসকানিমূলক মন্তব্যও ঢাকার কাছে পরস্পরবিরোধী বার্তা পাঠাচ্ছে।
বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এসব বিষয় বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে এবং জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। এক অর্থে তা ঢাকার নীতিনির্ধারণী চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার এসব বিষয় কিংবা ইতিবাচক ইঙ্গিতগুলোর দিকে সেভাবে নজর দেয়নি।’
মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে প্রায় ১৬ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও জাতিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
এদিকে, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের যেকোনো ভূমিকা ভারতের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হয়। নদীটি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিন্ন। তবে দুই দেশের মধ্যে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির চেষ্টা বহু বছর ধরেই অচলাবস্থায় আটকে আছে। তারেক রহমানের বেইজিং সফরের সময় বাংলাদেশ জানায়, নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে যৌথ কারিগরি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (টেকনিক্যাল ফিজিবিলিটি স্টাডি) পরিচালনায় দুই পক্ষ একমত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকাজের জন্য নদীটির প্রবাহ পুনরুদ্ধারে খনন, পলি অপসারণ (ডিসিলটিং) এবং পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বলেন, ‘আমাদের সীমান্তের এত কাছে কোনো প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা সব সময়ই আমাদের উদ্বেগের বিষয় হবে। তাই আমরা অবশ্যই এমন কিছু স্বাগত জানাব না।’
এদিকে, ভারত ও চীনের মধ্যে কয়েক দশক ধরে সীমান্ত বিরোধ চলছে। ১৯৬২ সালের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ ভারতের জন্য অপমানজনক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল। এরপর সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও সীমান্ত সংঘর্ষে দুই পক্ষেরই প্রাণহানি ঘটেছে। এই প্রকল্পে চীনের যেকোনো ভূমিকা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের আরও কাছাকাছি তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করবে। ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত মাত্র ২২ কিলোমিটার (১৪ মাইল) দীর্ঘ এই ভূখণ্ড ভারতের মূল ভূখণ্ডকে দেশটির সাতটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বলছেন, আগের সরকারগুলোও তিস্তা প্রকল্পে ভারতকে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে দিল্লির অনেক বেশি সময় লেগেছে। তাঁদের যুক্তি, এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও আর্থিক সক্ষমতা চীনের রয়েছে।
এদিকে ভারতের উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করেছে বেইজিং। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফরের সময় বেইজিংয়ে সাংবাদিকদের চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, ‘আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, চীন ও বাংলাদেশের সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটি তৃতীয় পক্ষের প্রভাবমুক্ত থাকা উচিত।’
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ ইতোমধ্যেই চীন। বাংলাদেশের মোট অস্ত্র আমদানির ৭০ শতাংশেরও বেশি আসে চীন থেকে। পাশাপাশি বেইজিংয়ের কাছে ঢাকার ঋণের পরিমাণ ৬০০ কোটিরও বেশি মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৫০ কোটি পাউন্ড)।
তারেক রহমানের সফরের সময় চীন চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলারও প্রস্তাব দেয়। এই করিডরের মাধ্যমে চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারত দক্ষিণ এশিয়াকে নিজেদের প্রভাব বলয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। তবে চীন ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে নিজেদের উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ভারতের প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনো দিল্লিতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ সরকার তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়েছে।
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া বিক্ষোভ দমনে শত শত মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অনুপস্থিত অবস্থায় শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গত বছর একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
শ্যাম শরণ বলেন, ‘যত দিন শেখ হাসিনা দিল্লিতে থাকবেন, তত দিন রাজনৈতিকভাবে তারেক রহমানের জন্য ভারত সফর করা কিছুটা কঠিন হতে পারে।’ তবে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতে, এরপরও রহমান দিল্লি সফর করতে পারেন। কারণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই ভারত বাংলাদেশের জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, যাকে উপেক্ষা করার সুযোগ ঢাকার নেই।
অন্যদিকে ভারতও জানে, বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তারেক রহমানের জন্য তাই আঞ্চলিক এই দুই পরাশক্তির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা হবে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল এক কূটনৈতিক ম্যানুভার বা কসরত।
বিবিসি থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান







