দেশবাসী আশা করেছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে জানা যায়, শুধু জুন মাসে মব ও রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছে ৪০ জন। পরিস্থিতি কত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, সেটা এ পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’ (এইচআরএসএস) প্রকাশিত জুন মাসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জুন মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছে। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় নিহত ৩১, আহত ৬৯ জন। এ ছাড়া ৩৫২ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ৩৯ ঘটনায় ৪৭ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে মবের ঘটনা শুরু হয়েছিল, সেটা থামেনি। সেই সময়ে নারী নিগ্রহ, মাজার গুঁড়িয়ে দেওয়াসহ নানা রকম মবের ঘটনা ঘটেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেটা অন্য রূপ ধারণ করেছে। এখন মব রাজনৈতিক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। যেমন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এনসিপি, জামায়াতসহ নানা দলের মধ্যে বিরোধে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ ঘটনা দলীয় কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, হামলা, চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ঘটেছে।
ইউনূস সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং জুলাই আন্দোলনের পক্ষের দলগুলোর অতি বাড়াবাড়ির কারণে মবের ঘটনাগুলো ঘটেছিল। বিশেষ করে কট্টরপন্থী ধর্মভিত্তিক কোনো কোনো গোষ্ঠী ‘তৌহিদি জনতা’ ব্যানারে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু মবের ঘটনা ঘটিয়েছিল। ইসলামপন্থী বেশ কিছু দলেরও তাতে সমর্থন ছিল। জনগণের মধ্যে এদের কোনো প্রভাব না থাকলেও সরকার এদের সহিংসতায় বাধা দেয়নি। একই সঙ্গে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অপকর্মের অজুহাত দিয়ে হত্যা-নির্যাতনসহ ভাঙচুরের ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। এটাই মব সন্ত্রাসীদের বড় শক্তিতে রূপান্তর করেছে। এখনো যদি ট্যাগ লাইন দিয়ে মব সৃষ্টি করা হয় আর সরকার চুপ থাকে, তাহলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। আমরা এখন সেটাই দেখতে পাচ্ছি।
এখন ক্ষমতায় আছে নির্বাচিত সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় থাকার পরও কেন মবের ঘটনাগুলো ঘটছে, তার উত্তর কি ক্ষমতাসীন দল দিতে পারে? এর দায় তারা এড়িয়ে যেতে পারে না। বিএনপি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পরপরই দলবদ্ধ সহিংসতা বা মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা ঘোষণা করেছিল। এই ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না বলেও সরকারপ্রধান স্পষ্টভাবে বলেছিলেন। কিন্তু সরকারপ্রধানের বক্তব্যের পরও পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকার মৌখিকভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে উল্টো পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মবের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স না দেখালে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্পটি বাস্তবে রূপান্তরিত হয়ে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে তুলবে।







