প্রকৃতির অকৃপণ দানে ধন্য কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত শুধু দেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণই নয়, এটি একটি অনন্য প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)। পরিবেশ আইন ও উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, সৈকতের জোয়ার-ভাটার অঞ্চল থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত বালিয়াড়িতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, আইন ও আদালতের তোয়াক্কা না করে সৈকত এলাকা অবৈধ দখলদারদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। উচ্ছেদের পরপরই সেখানে আবার দখলবাজি শুরু হয়ে যায়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশ ও উচ্চ আদালতের তাগিদে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ি থেকে ৯৩০টি অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করেছিল। কিন্তু সেই উচ্ছেদের ধুলাবালু না সরতেই, বিশেষ করে ঈদুল আজহার ছুটিকে কেন্দ্র করে এক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে আবারও রাতারাতি চাকাযুক্ত কয়েক শ দোকান বসিয়ে ফেলা হয়েছে, যার সংখ্যা বর্তমানে আট শতাধিক। এখন দিনে-রাতে সেখানে চলছে কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য। সমুদ্রের বিশালতা ও নীল জলরাশি দেখতে এসে পর্যটকেরা এখন বালিয়াড়িজুড়ে দেখছেন হকার আর ঝুপড়ি দোকানের মেলা। এই ঘিঞ্জি পরিবেশ যেমন পর্যটকদের চরম বিরক্তি ও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তেমনি মারাত্মকভাবে ধ্বংস করছে সৈকতের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য।
প্রশ্ন হলো, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনার পরও কার খুঁটির জোরে এই দখলদারেরা বারবার সৈকত দখল করার সাহস পায়? সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, এই কোটি টাকার বাণিজ্যের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক সিন্ডিকেট এবং প্রশাসনের একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ও স্বার্থসংশ্লিষ্টতা। সরকার বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কেবল সিন্ডিকেটের চেহারা বদলায়, কিন্তু সৈকত দখলের সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন হয় না। এমনকি উচ্ছেদ ঠেকাতে এখন চাকাযুক্ত দোকান ব্যবহার এবং আইনি ফাঁকফোকর খোঁজার মতো চাতুর্যের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের দূরদর্শিতার অভাবে পর্যটকদের সব চাপ গিয়ে পড়ছে সুগন্ধা পয়েন্টের মাত্র এক কিলোমিটার এলাকায়। অথচ মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সৈকত আজ পর্যন্ত অরক্ষিত ও লাইফগার্ডহীন রয়ে গেছে। অন্য পয়েন্টগুলোয় নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে সুগন্ধার ওপর এই অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ কমত এবং অবৈধ বাণিজ্যের সিন্ডিকেটও দুর্বল হতো। আমরা মনে করি, আদালতের দোহাই বা আমলাতান্ত্রিক টালবাহানা দিয়ে এই দখলবাজিকে দীর্ঘায়িত করার কোনো সুযোগ নেই। জেলা প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে বালিয়াড়ির এই দখলদারদের বিরুদ্ধে স্থায়ী ও কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হবে।








