প্যারাগুয়ের ও অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অনবদ্য জয়ের পর সাধারণত ফুটবল নিয়ে কিছুটা উদাসীন মার্কিন দর্শক হঠাৎ করেই নড়েচড়ে বসেছেন। মার্কিন দলের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনের কারণ খুঁজতে ব্যস্ত সবাই।

কেউ কেউ একে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের একটি ‘সোনালি প্রজন্ম’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। যাদের বেড়ে ওঠা স্থানীয় ইয়ুথ ফুটবল প্রোগ্রামগুলোর হাত ধরে, আর আজ তারা নিজেদের মাটিতে লড়তে প্রস্তুত। এই দলে আছেন টেক্সাসের লিটল এলম থেকে আসা ওয়েস্টন ম্যাককেনি, নিউইয়র্কের ওয়াঞ্জার্স ফলসের টাইলার অ্যাডামস এবং পেনসিলভানিয়ার হার্শির ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক। ম্যাককেনির জন্ম হয়েছিল এক সেনাঘাঁটিতে, অ্যাডামস বড় হয়েছেন এক ফুটবল কোচের অধীনে, আর পুলিসিকের ডাকনাম তো দেওয়া হয়েছে ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’।

গল্পটা যেন নিজেই নিজের চিত্রনাট্য তৈরি করে নিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ জাতীয় ফুটবল দলের এই জয়ের ফর্মুলা নিয়ে যে আখ্যান তৈরি করা হচ্ছে, তা বড়জোর আংশিক সত্য।

অবশ্যই এই দলটিতে প্রতিভার কোনো কমতি নেই। চার বছর আগে কাতারের চেয়ে তারা বহুগুণ ভালো খেলছে। তবে একে খাঁটি মার্কিন চেতনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখাটা মার্কিন দল এবং সামগ্রিকভাবে যেকোনো জাতীয় দল সম্পর্কেই ভুল ধারণার জন্ম দেবে।

বিশ্বকাপের বিশ্লেষণগুলোয় প্রায়ই খেলাকে তুলে ধরা হয় বিভিন্ন দেশের জাতীয় চরিত্রের লড়াই হিসেবে—যেমন জার্মানদের শৃঙ্খলা বনাম ব্রাজিলের নান্দনিকতা, কিংবা ইতালীয়দের চাতুর্য বনাম ইংলিশদের উদ্যম। জাতীয়তা নিয়ে আমাদের মনে যে সনাতন ধারণা গেঁথে আছে, এই গৎবাঁধা রূপগুলো তাকে বেশ তৃপ্তি দেয়। কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই ধারণা টিকিয়ে রাখা কঠিন; কারণ বিশ্বের বেশির ভাগ নামী ফুটবলারই আসলে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী, যাঁরা নিজেদের দেশের বাইরে বিভিন্ন ক্লাবে খেলে থাকেন।

মার্কিন জাতীয় দলের এই আন্তর্জাতিক রূপটি আজকের আমেরিকারই একখণ্ড প্রতিচ্ছবি। অভিবাসন, প্রবাসী এবং দেশের বাইরে থাকা প্রতিভাদের মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে এই দল। এর দায়িত্বে আছেন এমন এক বিদেশি কোচ, যিনি ভেতরকার মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভাবনাকে সহজেই ধরতে পারেন। মার্কিন দর্শকেরা যদি এই বৈচিত্র্যকে আড়াল না করে, বরং একে আলিঙ্গন করে দলকে আপন করে নেয়, তবে হয়তো আরও চমক অপেক্ষা করছে।

সম্প্রতি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ মরক্কোর কাছে নেদারল্যান্ডসের হারের জন্য কোচ রোনাল্ড কোম্যানের রক্ষণাত্মক কৌশলকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি ডাচদের চিরচেনা ফুটবলশৈলী নয়। আজ কোম্যানকে একজন ইতালীয় কোচের মতো মনে হয়েছে, যিনি মূলত না হারার জন্য খেলছিলেন। অথচ নেদারল্যান্ডস সব সময় খেলে জেতার জন্য। যদি হারতেই হয়, তবে অন্তত নিজের খেলার ধরন বজায় রেখে হারা উচিত।’ সুইডিশ-বসনিয়ান এই কিংবদন্তি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন, সাফল্য আসে নিজের দেশের ঐতিহ্য ধরে রাখার মাধ্যমেই।

সাংস্কৃতিক মিলই যদি দলগত বোঝাপড়ার মূল শর্ত হতো, তবে সমজাতীয় বা একই সংস্কৃতির খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত দলগুলোই সাফল্যের চূড়ায় থাকত। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বকাপের ইতিহাস অন্য কথাই বলে। ২০১৮ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফরাসি দলটির মূল ভিত্তিই গড়ে উঠেছিল অভিবাসী সন্তানদের ওপর।

২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠার নেপথ্যে ছিল স্পেন, ইতালি ও নেদারল্যান্ডসে ছড়িয়ে থাকা তাদের প্রবাসী ফুটবলাররা। ফুটবলবিশ্বে এটা এখন এক ক্রমবর্ধমান প্রবণতা। এমনকি সাম্প্রতিক চ্যাম্পিয়ন দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সমজাতীয় দল আর্জেন্টিনার প্রায় সব খেলোয়াড়ই খেলেন দেশের বাইরের ক্লাবগুলোয়। খোদ লিওনেল মেসিও মাত্র ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছিলেন।

মার্কিন জাতীয় দলটিতেও এই বৈচিত্র্যের সব উপাদানই বিদ্যমান। এই দলের ৭৩ শতাংশ খেলোয়াড়ই খেলেন বিদেশের ক্লাবগুলোতে। মালিক টিলম্যান বড় হয়েছেন জার্মানিতে; ফোলারিন বালোগানের বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডে; আর আলেহান্দ্রো জেন্দেহাস ও রিকার্ডো পেপি হলেন মেক্সিকান-আমেরিকান। দলের কোচ মরিসিও পচেত্তিনো একজন আর্জেন্টাইন, যিনি দীর্ঘদিন ইউরোপে কাটিয়েছেন। সাধারণ জাতীয় সংস্কৃতিই যদি দলের ঐক্যের মূল চালিকা শক্তি হতো, তবে মার্কিন দলটির আজ ছন্নছাড়া হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

তাহলে আসলে কোন জিনিসটি মাঠে খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি করে? আসলে এটি কোনো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জাতীয় আদর্শ নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট দলীয় পরিচয়, যা প্রতি মৌসুমে নতুন করে তৈরি করা হয় এবং প্রতিটি ম্যাচের পর তা ঝালাই করে নেওয়া হয়। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছিল ২০০২ সালে। সেবার বিশ্বকাপ আয়োজনের মাত্র ১৮ মাস আগে এক বিপর্যস্ত দক্ষিণ কোরিয়া দলের দায়িত্ব নেন ডাচ কোচ গুস হিডিঙ্ক। তরুণ খেলোয়াড়দের সঙ্গে অভিজ্ঞদের এবং স্থানীয়দের সঙ্গে প্রবাসী খেলোয়াড়দের মেলবন্ধন তৈরি করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। দেশটির নিজস্ব ঐতিহ্যের বাইরে থেকে আসা হিডিঙ্ক দলের চেনা রূপ, অনুশীলনের পদ্ধতি এবং খেলার কৌশল পুরোপুরি বদলে দেন। শুরুর দিকের নড়বড়ে ফলাফলে আতঙ্কিত হয়ে কোরিয়ান ক্রীড়া সাংবাদিকেরা তাঁর বরখাস্তের দাবিও তুলেছিলেন। কিন্তু মূল টুর্নামেন্ট শুরু হতেই সেই বদলে যাওয়া দলটি সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে দেয়, মেতে ওঠে উল্লাসে এবং ভক্তদের বিপুল সমর্থনে ভর করে সোজা সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয়।

মার্কিন দলের সঙ্গে পচেত্তিনোর কাজ যেন হিডিঙ্কের সেই কৌশলেরই হুবহু পুনরাবৃত্তি। দলে পরিবর্তনশীল কৌশল আনা, কঠোর কন্ডিশনিং এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্পের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কৃতির খেলোয়াড়দের এক সুতায় গেঁথে একটি যৌথ পরিচয় তৈরি করা। এটি মোটেও কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দেশের মধ্যে ২৬টি দেশের কোচই বিদেশি, যার মধ্যে ইংল্যান্ড ও ব্রাজিলের মতো দেশও রয়েছে। ফুটবলবিশ্ব এখন আর এই ধারণায় বিশ্বাস করে না যে একজন কোচকে তাঁর খেলোয়াড়দের সমগোত্রীয় হতে হবে কিংবা একটি দলের পরিচয় হবে কেবলই তাদের অপরিবর্তিত জাতীয় চরিত্রের প্রতিফলন।

বিশ্বকাপের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আয়োজক দেশগুলো সব সময়ই নিজেদের মাঠে দুর্দান্ত পারফর্ম করে। তারা ৯১ শতাংশ ক্ষেত্রে নকআউট পর্বে, ৫৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সেমিফাইনালে এবং ২৬ শতাংশ ক্ষেত্রে ফাইনালে উঠেছে। ক্রীড়াঙ্গনে নিজেদের মাঠের সুবিধার কথা উঠলেই ভক্তরা সাধারণত মাঠের কন্ডিশন, তাপমাত্রা বা বাতাসের মতো বাহ্যিক বিষয়গুলো নিয়ে ভাবেন। কিন্তু পেশাদার পর্যায়ে এই বস্তুগত বিষয়গুলো খুব একটা পার্থক্য গড়ে দেয় না, কারণ সব জায়গার সুযোগ-সুবিধা প্রায় একই রকম থাকে। আসল প্রভাব ফেলে মাঠের বাইরের কিছু বিষয়, যেমন আয়োজক হিসেবে সরাসরি খেলার সুযোগ পাওয়া এবং সরকার, ফেডারেশন ও স্পনসরদের কাছ থেকে পাওয়া অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা।

তবে আমার মতে, সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হলো গ্যালারির সমর্থন। স্বদেশি দর্শকদের গগনবিদারী চিৎকারের সামনে খেলোয়াড়েরা নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করেন। এই চিৎকার প্রতিপক্ষ দলের যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটায় এবং অবচেতনভাবেই রেফারির সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করতে পারে। ক্রীড়াবিজ্ঞান বারবার প্রমাণ করেছে, দর্শক যত বাড়ে, নিজের মাঠের সুবিধাও তত বৃদ্ধি পায়। এর বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে। কোভিডের সময় যখন দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে খেলা হয়েছিল, তখন এই সুবিধা প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছিল। ২০০২ এবং ২০০৬ বিশ্বকাপে ভক্তদের জোয়ার স্বাগতিক দলকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ঘরের মাঠের সুবিধা কেবল তখনই কাজে লাগে, যখন বিশ্বকাপ একটি যৌথ উদ্যাপনে পরিণত হয়।

অন্যান্যবারের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে এবারের আবহাওয়াটা ভিন্ন মনে হচ্ছে। দর্শকেরা এখন যা দেখছেন তা অভূতপূর্ব। ১৮ বছর বয়সে বিদেশে পাড়ি জমানো, ইউরোপের অভিজাত ব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা আমেরিকান খেলোয়াড়েরা এখন দেশের টানে ফিরছেন এবং মার্কিন ভক্তরাও তাঁদের বুকে আগলে নিচ্ছেন।

মার্কিন জাতীয় দলের এই আন্তর্জাতিক রূপটি আজকের আমেরিকারই একখণ্ড প্রতিচ্ছবি। অভিবাসন, প্রবাসী এবং দেশের বাইরে থাকা প্রতিভাদের মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে এই দল। এর দায়িত্বে আছেন এমন এক বিদেশি কোচ, যিনি ভেতরকার মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভাবনাকে সহজেই ধরতে পারেন। মার্কিন দর্শকেরা যদি এই বৈচিত্র্যকে আড়াল না করে, বরং একে আলিঙ্গন করে দলকে আপন করে নেয়, তবে হয়তো আরও চমক অপেক্ষা করছে।

মাইকেল মোরিস অধ্যাপক, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

টাইম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত।