বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দক্ষ শাসনব্যবস্থা এবং জনআস্থার অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক হলো দুর্নীতি। উন্নয়নশীল বিশ্বে কয়েক দশক ধরে ব্যাপক সংস্কার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দুর্নীতি আশ্চর্যজনকভাবে সমাজে টিকে আছে। বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করে, তথ্য অধিকার আইন প্রবর্তন করে এবং সরকারি পরিষেবাগুলোকে প্রযুক্তির সাহায্যে ডিজিটাল করে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার এবং দাতা সংস্থাগুলোও শাসনব্যবস্থার আধুনিকায়নে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করে। তা সত্ত্বেও, দুর্নীতি প্রায়শই পারিপার্শ্বিকতার সাথে নিখুঁতভাবে মানিয়ে নেয় এবং নতুন কৌশলে পুনরায় আবির্ভূত হয়। দুর্নীতির এই দীর্ঘস্থায়ী টিকে থাকা একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে যে, দুর্নীতিবিরোধী এতসব সংস্কার কেন প্রায়শই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
এর প্রকৃত উত্তর এই তীক্ষ সত্যের মধ্যেই নিহিত আছে যে, দুর্নীতি কেবল একটি আইনি বা প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি আসলে একটি রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জটিল মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা। অনেক সংস্কার সফল হয় না কারণ সেগুলো সংকটের অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামোগত কারণ অনুসন্ধান না করে কেবল বাহ্যিক উপসর্গগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়। প্রথাগত দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগগুলো প্রায়শই সেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ জটিলতাকে অবমূল্যায়ন করে, যেগুলোকে তারা পরিবর্তন করতে চায়।
বিশ্বজুড়ে দুর্নীতি এবং এর প্রতিকার বোঝার জন্য সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও প্রভাবশালী কাঠামোটি মূলত প্রধান-কর্তা (প্রিন্সিপাল-এজেন্ট) তত্ত্ব থেকে এসেছে। অর্থনীতিবিদ মাইকেল সি. জেনসেন এবং উইলিয়াম এইচ. মেকলিং ১৯৭৬ সালে তাঁদের যুগান্তকারী গবেষণা প্রবন্ধ ‘থিওরি অফ দ্য ফার্ম: ম্যানেজারিয়াল বিহেভিয়ার, অগানাইজেশন, কস্টস অ্যান্ড ওনারশিপ স্ট্রাকচার’-এ এই মডেলটি বিশদ ব্যাখ্যা করেন। এই দৃষ্টিকোণ অনুসারে, দুর্নীতি তখনই ঘটে যখন সরকারি কর্মকর্তারা—যাদের প্রতিনিধি বা ‘এজেন্ট’ হিসেবে গণ্য করা হয়—তারা সাধারণ নাগরিক বা ‘প্রিন্সিপাল’দের অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত আখের গোছাতে লিপ্ত হন। এই তত্ত্বের আলোকে সমাধানের পথটি অত্যন্ত সরল বলে মনে হয়—সর্বোচ্চ নজরদারি বাড়ানো, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা উন্নত করা, আর্থিক নিরীক্ষা শক্তিশালী করা এবং অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
প্রধান-কর্তা তত্ত্ব, সম্মিলিত-কর্ম তত্ত্ব কিংবা রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি—প্রতিটি তাত্ত্বিক কাঠামোই টিআইবির এই বাস্তব জরিপের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। শুধুমাত্র কারিগরি বা প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে দুর্নীতিকে পরাস্ত করা অসম্ভব। টেকসই অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত অর্থে জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে, আইনের দৃষ্টিতে সকলে সমান হবে এবং প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ক্ষমতার ভারসাম্যকে ভেঙে একটি ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করা যাবে।
বিশ্বজুড়ে গত কয়েক দশকের অধিকাংশ দুর্নীতিবিরোধী কর্মসূচি ঠিক এই রৈখিক যুক্তিই অনুসরণ করে তৈরি হয়েছে। ফলে সরকারগুলো বিশাল নজরদারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলোর আইনি ক্ষমতা শক্তিশালী করে। তবে এই ধরনের সংস্কারগুলো প্রায়শই ব্যর্থ হয়, কারণ এগুলো সমাজে সর্বদা সৎ, নিরপেক্ষ এবং জনকল্যাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একদল উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের চিরন্তন অস্তিত্বকে পূর্বশর্ত হিসেবে ধরে নেয়। বাস্তবে রাজনৈতিক নেতা, ঊর্ধ্বতন আমলা এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যক্তিরা নিজেরাই অনেক সময় এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। যখন সমাজের সর্বোচ্চ স্তরের জবাবদিহিতা প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই অনানুষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার জালে জড়িয়ে পড়েন, তখন রাষ্ট্রীয় তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং প্রধান-কর্তা মডেলটি ভেঙে যায়।
প্রধান-কর্তা তত্ত্বের এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পরবর্তীকালে দুর্নীতি বিষয়ক গবেষণায় একটি বড় ধরনের তাত্ত্বিক পরিবর্তনের সূচনা করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আনা পার্সন, বো রথস্টাইন এবং জায়ান টিওরেল যৌথভাবে ২০১৩ সালে তাঁদের একটি প্রভাবশালী প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘হোয়াই অ্যান্টিকরাপশন রিফর্মস ফেইল—সিস্টেমিক করাপশন অ্যাজ আ কালেকটিভ অ্যাকশন প্রবলেম’। এই গবেষণায় তাঁরা দেখিয়েছেন যে, পদ্ধতিগত দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোতে দুর্নীতি মূলত কোনো একক প্রধান-কর্তার সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর সম্মিলিত কর্মকাণ্ডের (কালেকটিভ অ্যাকশন) সংকট। তাঁদের এই বিশ্লেষণটি মূলত প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ম্যানকার ওলসন কর্তৃক ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত ধ্রুপদী গ্রন্থ ‘দ্য লজিক অফ কালেক্টিভ অ্যাকশন: পাবলিক গুডস অ্যান্ড দ্য থিওরি অফ গ্রুপস’-এর মৌলিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
ওলসন তাঁর গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ব্যক্তিমানুষ প্রায়শই সমষ্টিগত বা সাধারণ সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হয়, যখন সে বিশ্বাস করে যে অন্যরা সেই সাধারণ নিয়ম মেনে চলবে না। দুর্নীতির ক্ষেত্রে এর বাস্তব অর্থ হলো, একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি দপ্তরে ঘুষ দেয় কারণ সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস ও আশা করে যে অন্য সব নাগরিকও একই কাজ করছে। একইভাবে ব্যবসায়ীরা অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদান করে কারণ তারা জানে যে তাদের ব্যবসায়িক প্রতিযোগীরাও একই পথ অবলম্বন করছে। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীরাও দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় কারণ তারা ধরে নেয় যে একা সততা বজায় রাখলে তারা সামাজিকভাবে অসুবিধায় ও একঘরে হয়ে পড়বে। এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে দুর্নীতি সমাজে স্ব-টেকসই এবং স্বয়ংক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে সমষ্টিগত প্রত্যাশা এবং সামাজিক রীতিনীতি পরিবর্তন না করে শুধুমাত্র দৃশ্যমান কয়েকজন ব্যক্তিগত অপরাধীকে শাস্তি দিলে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সুফল পাওয়া যায় না।
এই সংকটের আরেকটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা আসে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস সি. নর্থ ১৯৯০ সালে প্রকাশিত তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘ইনস্টিটিউশনস, ইনস্টিটিউশনাল চেঞ্জ অ্যান্ড ইকোনমিক পারফরম্যান্স’-এ যুক্তি দিয়েছিলেন যে, কাগজের আনুষ্ঠানিক নিয়মকানুন বা আইনগুলো আসলে একটি সমাজের প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক রূপের কেবল আংশিক চিত্র তুলে ধরে। নর্থের মতে, সমাজের অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতিনীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ব্যবস্থা, আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক প্রত্যাশাগুলো প্রায়শই আনুষ্ঠানিক আইন ও লিখিত প্রবিধানের চেয়ে মানুষের আচরণের ওপর অনেক বেশি বাস্তব প্রভাব বিস্তার করে।
অনেক উন্নয়নশীল দেশে উন্নত পশ্চিমা গণতন্ত্রের আইনের মতোই অত্যন্ত চমৎকার এবং কঠোর দুর্নীতিবিরোধী আইন ও বিধিমালা রয়েছে। তবুও সেইসব দেশের সুশাসনের বাস্তব ফলাফল নাটকীয়ভাবে ভিন্ন ও বৈষম্যমূলক হয়। এর একমাত্র কারণ হলো, অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক আচারগুলো প্রায়শই আনুষ্ঠানিক নিয়মকানুনকে সম্পূর্ণভাবে ছাপিয়ে বা গ্রাস করে ফেলে। সমাজে বিদ্যমান পৃষ্ঠপোষক-আশ্রিত সম্পর্ক, অন্ধ রাজনৈতিক আনুগত্য এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিগত সংযোগই শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুযোগ ও সরকারি চুক্তি প্রাপ্তির আসল পথ নির্ধারণ করে দেয়। ফলস্বরূপ, যেকোনো সংস্কার প্রচেষ্টা কেবল কিছু চিত্তাকর্ষক আইন ও কাগুজে দলিল তৈরি করলেও নাগরিকদের বাস্তব আচরণে বা প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আধুনিক আইনগুলো তুলনামূলকভাবে খুব সহজেই অন্য দেশ থেকে আমদানি করা সম্ভব, কিন্তু একটি সমাজের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিকে রাতারাতি আমদানি করা যায় না।
সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ এই আলোচনাকে আরও গভীর এবং অর্থপূর্ণ রূপ প্রদান করে। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স বেবার তাঁর ১৯২২ সালে মরণোত্তর প্রকাশিত ধ্রুপদী গ্রন্থ ‘ইকোনমি অ্যান্ড সোসাইটি’-তে যোগ্যতা, কঠোর পেশাদারিত্ব, লিখিত বিধিমালা এবং সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক নিয়মের ওপর ভিত্তি করে একটি আধুনিক ও যুক্তিসঙ্গত-আইনি আমলাতন্ত্রের গুরুত্ব এবং তার রূপরেখা তুলে ধরেছেন। কিন্তু যেসব সমাজে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যক্তিগত আনুগত্য, আত্মীয়তার বন্ধন, আঞ্চলিকতা এবং অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক উপাদান দ্বারা ভেতর থেকে গঠিত হয়, সেখানে এই শাসন ব্যবস্থাগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিকৃত আঙ্গিক ধারণ করে। এই ধরনের সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক বৈরী সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দৈনন্দিন সাধারণ কার্যপ্রণালীর মধ্যেই স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়।
সুতরাং, দুর্নীতিকে সবসময় একক ব্যক্তির নৈতিক বিচ্যুতি বা অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা সমাজতাত্ত্বিকভাবে ভুল; এটি খোদ সামাজিক ব্যবস্থারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিউ তাঁর ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডিস্টিংশন: এ সোশ্যাল ক্রিটিক অব দ্য জাজমেন্ট অব টেস্ট’-এ সামাজিক পুঁজি, সাংস্কৃতিক পুঁজি এবং ক্ষমতার জাল নিয়ে এক অনবদ্য তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। বুর্দিউ-এর মতে, সমাজের উচ্চ স্তরের অভিজাত শ্রেণি তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক পুঁজির আন্তঃসংযুক্ত শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য ও সুবিধা বজায় রাখে। দুর্নীতিবিরোধী প্রচলিত সংস্কারগুলো প্রায়শই এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের নেটওয়ার্কগুলোর খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে অবমূল্যায়ন করে। এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো সংস্কারের ফলে তৈরি হওয়া যেকোনো নতুন নিয়মকানুনের সাথে নিজেদের স্বার্থকে চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়ে নিজেদের অন্যায্য সুবিধাগুলো চতুরতার সাথে চিরস্থায়ী করতে সক্ষম হয়।
রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ সম্ভবত দুর্নীতির এই স্থায়িত্বের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং নির্মম ব্যাখ্যা প্রদান করে। অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগলু এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস এ. রবিনসন তাঁদের ২০১২ সালের প্রভাবশালী গ্রন্থ ‘হোয়াই নেশনস ফেইল: দ্য অরিজিনস অব পাওয়ার, প্রসপারিটি, অ্যান্ড পভার্টি’-তে যুক্তি দিয়েছেন যে, একটি দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত সেই সমাজের অন্তর্নিহিত ক্ষমতার ভারসাম্য ও সম্পর্ককে প্রতিফলিত করে। দুর্নীতি সমাজে প্রায়শই টিকে থাকে কারণ এটি সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে। রাষ্ট্রীয় ক্রয়ের অস্বচ্ছ ব্যবস্থা, আমলাদের স্বেচ্ছাচারী প্রবিধান, একচেটিয়া বাণিজ্যিক সুবিধা এবং অত্যন্ত দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ব্যবস্থা থেকে সমাজে যারা প্রতিনিয়ত লাভবান হয়, তারা তাদের নিজেদের স্বার্থেই যেকোনো অর্থপূর্ণ বা গভীর সংস্কার প্রচেষ্টাকে ভেতর থেকে প্রতিহত করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, দুর্নীতি কেবল একটি সাধারণ শাসনতান্ত্রিক বা কারিগরি ব্যর্থতা নয়; এটি আসলে একটি সমাজের শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের এক ধরনের ভারসাম্য। সংস্কার প্রচেষ্টাগুলো প্রায়শই ব্যর্থ হয় কারণ আসল সংকট হলো কার্যকর ও গভীর সংস্কারগুলো সমাজের প্রতিষ্ঠিত স্বার্থান্বেষী মহলের অস্তিত্ব ও ক্ষমতার জন্য সরাসরি এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মুশতাক খান তাঁর বিভিন্ন গবেষণায় বিকশিত ‘রাজনৈতিক-মীমাংসা’ (পলিটিক্যাল সেটলমেন্ট) পদ্ধতির মাধ্যমেও একই ধরনের অমোঘ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, দুর্নীতিবিরোধী যেকোনো সংস্কার প্রায়শই ব্যর্থ হয় যখন তা একটি সমাজের রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্তর্নিহিত প্রকৃত বণ্টনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল কারিগরি পরিবর্তনের চেষ্টা করে। ক্ষমতার বাস্তব সম্পর্ককে পরিবর্তন না করে প্রতিষ্ঠিত স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলকে চ্যালেঞ্জ করা যেকোনো সংস্কার কৌশল শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত সীমিত ও সাময়িক ফল দেয়।
এই সমস্ত তাত্ত্বিক কাঠামোর বাস্তব এবং ভয়াবহ প্রতিফলন দেখা যায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত ‘‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’’-এর ফলাফলে। ১৫,৭১৫টি খানার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিচালিত এই জরিপটি দেখায় যে, দেশের বিভিন্ন সেবাখাতের সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম একটি খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে ৮১.৬ শতাংশ খানা এবং ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে ৬৩.৬ শতাংশ খানা। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার খানার পরিমাণ বেড়েছে যথাক্রমে ১৫.১ শতাংশ এবং ২৫.২ শতাংশ। ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২,৬৩৩.২ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫.৯ শতাংশ বেশি। এই বিপুল পরিমাণ ঘুষের অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১.৫৮ শতাংশ এবং জিডিপির ০.২৩ শতাংশ। জরিপ অনুযায়ী, দেশের নাগরিকেরা এবার সর্বোচ্চ দুর্নীতির শিকার হয়েছেন যথাক্রমে পাসপোর্ট, বিআরটিএ ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা নিতে গিয়ে।
নর্থের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি তত্ত্বকে সত্য প্রমাণ করে জরিপে দেখা গেছে, কিছু সেবাখাতে আংশিক ডিজিটাইজেশন বা প্রযুক্তিগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা সত্ত্বেও দুর্নীতি ও ঘুষের হার অত্যন্ত উচ্চ, যা প্রমাণ করে এই ব্যবস্থাগুলো এখনো অনানুষ্ঠানিক দুর্নীতির সহায়ক রয়ে গেছে। সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে মিশ্র পদ্ধতির জটিলতা ও দালালের ওপর নির্ভরতার কারণে ৯৮.১ শতাংশ খানা ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছে—যার মধ্যে ৯১.২ শতাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই সরাসরি ঘুষ আদায়ের সঙ্গে জড়িত। ঘুষ দেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে ৮১.৫ শতাংশ খানা জানিয়েছে ‘‘ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না’’। এটি ওলসনের সম্মিলিত-কর্ম তত্ত্ব এবং দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণকে পুরোপুরি স্পষ্ট করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকার ব্যবস্থার চরম ঘাটতি তুলে ধরে জরিপ জানায়, ৫৩.৩ শতাংশ খানা দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর পদ্ধতিই জানে না এবং সরকারের অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে জানে মাত্র ১.৪ শতাংশ খানা। দুর্নীতির শিকার খানার মধ্যে অভিযোগ দায়ের করেছে মাত্র ১০.৩ শতাংশ; কিন্তু এর মধ্যে ৫১ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থাপনাই নেওয়া হয়নি। অভিযোগ না করা ৬১.৩ শতাংশ খানার হতাশাজনক বক্তব্য ছিল—‘‘সেবা নেওয়ার ব্যবস্থা এ রকম, তাই প্রয়োজন মনে করিনি’’।
জরিপের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের ৫,৬৮০ টাকা থেকে ২০২৫ সালে সামান্য কমে ৫,১২৪ টাকা হলেও স্বাস্থ্যসেবায় টিকিট সংগ্রহ ও কৃষি খাতে সার প্রাপ্তির মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সেবায় ঘুষের হার দ্বিগুণ থেকে প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষা খাতে দুর্নীতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের হার ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এনজিও খাতেও দায়িত্বে অবহেলা ও অসদাচরণ বৃদ্ধির কারণে সার্বিক দুর্নীতি ৬.৫ শতাংশ থেকে ১৩.১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। দুর্নীতির এই বোঝার পেছনে উত্তরদাতারা প্রধান কারণ হিসেবে বিচারহীনতা (৭৪.৮ শতাংশ) এবং সচেতনতার অভাবকে (৬০.৮ শতাংশ) দায়ী করেছেন।
দুর্নীতির এই দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক জীবনের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো এর বৈষম্যমূলক চরিত্র, যা পলিটিক্যাল ইকোনমির মূল বক্তব্য। জরিপ অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে একটি পরিবার বছরে তার মোট আয়ের ১.৭ শতাংশ ঘুষ বাবদ ব্যয় করে। কিন্তু শীর্ষ পাঁচটি দুর্নীতিপ্রবণ খাতে এই হার দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা খানার জন্য ৫.১ শতাংশ, যেখানে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা পরিবারের জন্য তা ৩.২ শতাংশ। অর্থাৎ, নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর দুর্নীতির বোঝা উচ্চ আয়ের খানার তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। পাসপোর্ট সেবা গ্রহণে দারিদ্র্যসীমার নিচের খানাগুলোর মাসিক আয়ের ৭৮ শতাংশ ব্যয় হয়, যার মধ্যে ৩৭ শতাংশই যায় ঘুষে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেবা নিতে গিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোকে মাসিক আয়ের গড়ে ৩৪ শতাংশ ঘুষ দিতে হয়েছে, যা কিছু ক্ষেত্রে মাসিক আয়ের সাড়ে চার গুণ পর্যন্ত। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যথার্থই বলেছেন, ‘দুর্নীতি সকলের জন্যই ক্ষতিকর, তবে একইসঙ্গে বৈষম্যমূলক। গ্রামাঞ্চলের মানুষ এবং নারী, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন।’
এই প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ও আস্থার সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ (দুদক)-এর অকার্যকারিতা। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৯.৫ শতাংশ মানুষ এই সংস্থাটি সম্পর্কে জানলেও দুদকে অভিযোগ করেছেন মাত্র ০.৩ শতাংশ উত্তরদাতা, যা দুদকের ওপর জনগণের চরম আস্থার ঘাটতি নির্দেশ করে। রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণের কারণে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত স্থবির হয়ে আছে এবং দীর্ঘ প্রায় চার মাস ধরে কমিশনারদের পদ শূন্য রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার বণ্টন ও স্বার্থান্বেষী মহলের জিম্মিদশা থেকে দুদককে মুক্ত করতে না পারলে কেবল কারিগরি সংস্কার কোনো কাজে আসবে না। দুদককে স্বাধীন ও কার্যকর করতে হলে অনতিবিলম্বে সার্চ কমিটির মাধ্যমে এমন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও সৎ সাহসী নেতৃত্ব নিয়োগ দিতে হবে, যারা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।
দুর্নীতির এই সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যয় বিবেচনা করে টিআইবি সেবাখাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে ১০ দফা সুপারিশ প্রদান করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—সরকারের ৩১ দফাভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো মেরামত রূপরেখা ও জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সমন্বিত কৌশল প্রণয়ন; সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ কমাতে সরকারি সেবাসমূহ সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ করা; প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আচরণবিধি প্রণয়ন; অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা ও দুদকের হটলাইন নম্বর (১০৬) কার্যকর করা; এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী দাখিল বাধ্যতামূলক করা।
পরিশেষে বলা যায়, প্রধান-কর্তা তত্ত্ব, সম্মিলিত-কর্ম তত্ত্ব কিংবা রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি—প্রতিটি তাত্ত্বিক কাঠামোই টিআইবির এই বাস্তব জরিপের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। শুধুমাত্র কারিগরি বা প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে দুর্নীতিকে পরাস্ত করা অসম্ভব। টেকসই অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত অর্থে জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে, আইনের দৃষ্টিতে সকলে সমান হবে এবং প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ক্ষমতার ভারসাম্যকে ভেঙে একটি ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করা যাবে।
লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।
এইচআর/এএসএম








