বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরগুলো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদের ভান্ডার। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে হাওর বিস্তৃত। এ হাওরগুলো শুধু অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত নয়, একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদেরও আধার। দেশের অভ্যন্তরীণ এ উন্মুক্ত জলাশয়গুলো থেকে মাছের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে এই হাওরগুলো থেকে। লাখো মানুষের জীবিকা, পুষ্টি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হাওরের মাছের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষ কর্তৃক নানা ধরনের উৎপাতের কারণে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যা মাছের উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। নিম্নে সেসব চ্যালেঞ্জের কারণ নিয়ে কথা বলা যাক।
হাওরাঞ্চলের জীবন ও জীবিকা প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেই ছন্দে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে, বর্ষা অনিয়মিত হচ্ছে এবং পাহাড়ি ঢল থেকে পানি আগের তুলনায় দ্রুত ও তীব্রভাবে নেমে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনার সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে হাওরের জলধারণক্ষমতা, পানির প্রবাহ এবং প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রগুলো ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় যে হাওরগুলো দেশীয় মাছের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল, সেগুলোর অনেকগুলো এখন পরিবেশগত চাপের মুখে পড়ছে।
হাওরকে বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছের অন্যতম প্রাকৃতিক প্রজননকেন্দ্র বলা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, হাওরাঞ্চলে প্রায় ১৪৩টি দেশীয় এবং ১২টি বিদেশি মাছের প্রজাতি পাওয়া যায়। রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, চিতল, আইড়, পাবদা, ট্যাংরা, গুলশা, পুঁটি, শিং, মাগুরসহ অসংখ্য মাছের জন্য হাওর একটি নিরাপদ আবাসস্থল। দেশের মোট উন্মুক্ত জলাশয়ভিত্তিক মাছ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ হাওর অঞ্চল থেকে আসে, যা জাতীয় পুষ্টি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
তবে হাওরের মাছের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হলো আগাম বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন মাস দেশীয় মাছের প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্চ বা এপ্রিলেই পাহাড়ি ঢল থেকে পানি নেমে আসছে। ফলে এই আকস্মিক বন্যায় মাছের ডিম ও রেণুপোনা ভেসে যায়, প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হয় এবং মা মাছের স্বাভাবিক প্রজনন আচরণ ব্যাহত হয়। পানির তাপমাত্রা, গভীরতা ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে হঠাৎ পরিবর্তন ঘটায় মাছের ডিম ফোটার হারও কমে যায়। ফলে নতুন প্রজন্মের মাছের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।
হাওর, বিল, খাল, ডোবা ও জলাবদ্ধ এলাকাগুলো মাছের প্রাকৃতিক নার্সারি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী খরা ও পানির ঘাটতির কারণে এসব জলাশয়ের অনেকগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘কুঁড়ি’ বা ‘ডাবর’ এলাকাগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে মা মাছ আশ্রয় নেয়। এসব জলাধার শুকিয়ে গেলে মা মাছের সংখ্যা কমে যায় এবং পরবর্তী মৌসুমে প্রজনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে গজার, শোল, টাকি, শিং ও মাগুরের মতো দেশীয় প্রজাতিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও দ্রবীভূত অক্সিজেনের সংকট
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানসম্মতভাবে জানা যায় যে পানির তাপমাত্রা যত বাড়ে, দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ তত কমে যায়।
অক্সিজেনের ঘাটতি মাছের শ্বাস-প্রশ্বাস, বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে পানিতে অ্যামোনিয়ার মাত্রাও বৃদ্ধি পায়, যা মাছের জন্য বিষাক্ত। অনেক সময় অক্সিজেন সংকটের কারণে মাছ পানির ওপরে ভেসে ওঠে এবং ব্যাপক মাছের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
একসময় হাওরাঞ্চল ছিল শতাধিক দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক স্বর্গরাজ্য। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক প্রজাতির মাছের প্রাচুর্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। হাকালুকি হাওর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিতে মাছের বৈচিত্র্য হ্রাসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত আহরণ, আবাসস্থল ধ্বংস এবং দূষণকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কাওয়াদীঘি হাওরে পরিচালিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, সেখানকার ৮৭ প্রজাতির মাছ ও চিংড়ি শনাক্ত করা হলেও, প্রায় ২০ শতাংশ প্রজাতিকে বিরল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি দেশীয় মাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, পাবদা, গুলশা, চিতল, আইড়, মহাশোল এবং বিভিন্ন ছোট দেশীয় মাছ ভবিষ্যতে আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
হাওরের কয়েক লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মাছ আহরণ, বিপণন, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে জড়িত। মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে জেলেদের আয় কমছে, ঋণগ্রস্ততা বাড়ছে এবং অনেকেই বিকল্প পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে পরিণত হয়েছে।
হাওরের বর্তমান পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হলেও, সম্পূর্ণ হতাশাজনক নয়। হাওরের মাছ রক্ষায় এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি এবং সঠিক পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ কিছু পদক্ষেপের কথা বলা যেতে পারে: প্রজননক্ষেত্র ও মাছের অভয়াশ্রম বৃদ্ধি; প্রজনন মৌসুমে অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক মাছ ধরা বন্ধ; দেশীয় মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ; কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ; জিআইএস, রিমোট সেন্সিং ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে হাওরের পরিবেশগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ; স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সম্প্রদায়ভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অভয়াশ্রম স্থাপন ও সম্প্রদায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক হাওরে মাছের বৈচিত্র্য ও উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
পরিশেষে হাওর বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও মৎস্য অর্থনীতির এক অমূল্য সম্পদ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই সম্পদ আজ অস্তিত্বের সংকটে। অকাল বন্যা, খরা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পানিদূষণ ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসের কারণে দেশীয় মাছের ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
তবে এখনো সময় আছে। বিজ্ঞানভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীল পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে হাওরের মৎস্যসম্পদকে টেকসইভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব। হাওর বাঁচলে বাঁচবে দেশীয় মাছ, বাঁচবে জীববৈচিত্র্য, বাঁচবে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় হাওরের মাছ সংরক্ষণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। এ জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ খুব জরুরি।
লেখক: প্রভাষক, ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়








