(পূর্বপ্রকাশের পর- ৫ম পর্ব)
আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু দাউদকান্দিতে, সম্ভবত ১৯৫৪ সালে। বড় হয়ে জেনেছিলাম, এই বছরটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিশেষত যখন যুক্তফ্রন্ট প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ধরাশায়ী করেছিল। যাক সে কথা। দাউদকান্দি তখন তৎকালীন ত্রিপুরা (বর্তমানে কুমিল্লা) জেলার একটি থানা। ওই বয়সে যতটুকু ধর্মীয় ও অন্যান্য শিক্ষা পাওয়ার কথা, তার পুরোটাই পেয়েছিলাম মসজিদে এবং বাসায় আব্বা-আম্মার কাছ থেকে।
আমার আব্বা-আম্মা দুজনেই অত্যন্ত পরহেজগার মানুষ ছিলেন। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করে দিন শুরু করতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁদের নামাজ কাজা হতে দেখিনি। সন্তানদের নাম রেখেছিলেন ইসলামি তরিকায়—উম্মে হানি, আব্দুল বায়েস, উম্মে আমারা, উম্মুল হিনা, আব্দুল মুইদ, আব্দুল্লাহ আল মামুন, আব্দুল্লাহ আল হাসান। তবে আমাদের ধর্মকর্মের ব্যাপারে আব্বা ছিলেন একটু লিবারেল, আম্মা ছিলেন খুব রক্ষণশীল। এতটাই রক্ষণশীল যে, ছবি তুলতে বারণ করতেন—গুনাহ হবে বলে।
চীন দেশের একটা কথা আছে—বিড়াল কালো না সাদা, সেটা বড় কথা নয়; বড় কথা, বিড়ালটা ইঁদুর মারে কি না। আমাদের আম্মার কাছে সন্তানেরা ভিসি হলো না ডিসি হলো, তা আসল কথা নয়; তারা নামাজ-রোজা করে কি না, সেটাই আসল কথা। সুতরাং, শিশুকাল থেকেই আমরা ধর্মপ্রাণ—ভাইয়েরা আজান দিয়ে নামাজ পড়তাম।
দাউদকান্দির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময় একবার ফার্স্ট বেঞ্চে বসব বলে বেশ আগে পৌঁছে যাই। গিয়ে দেখি, ক্লাসের দরজা বন্ধ, তবে বেশ উঁচুতে থাকা জানালাটি খোলা। কোনোমতে জানালার কার্নিশে উঠে লাফ দিয়ে নিচে নামতে গিয়ে আমার বাঁ হাত মচকে গেল। কী আর করা! বগলের নিচে বই-খাতা আর এক হাতের ওপর অন্য হাত ঝুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরেছিলাম। ভাগ্যিস, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র আমার ছোট কাকা তখন বাসায় ছিলেন। আমাকে দেখেই বললেন, হাতটা ভেঙে গেছে। অগত্যা ঢাকা যাওয়া এবং প্লাস্টার করে বাড়ি ফেরা।
অবশ্য পরবর্তীকালে আম্মা দেখেছিলেন মিশ্র ফলাফল। ছোট ছেলে থিয়েটার ও নাটক নিয়ে, টিভিতে অভিনয় ও স্ক্রিপ্ট তৈরিতে ব্যস্ত এবং নিরীশ্বরবাদী; দ্বিতীয় ছেলে সাচ্চা কমিউনিস্ট; মেঝো ছেলে নামাজ-রোজায় যেমন নিয়মিত, তেমনি নিয়মিত সিনেমা দেখায়, চলচ্চিত্র জগতে এডিশনে; বড় ছেলে নড়বড়ে। সুতরাং, আম্মার প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত আফসোসের সীমা রইল না। তবে মেয়েদের পারফরম্যান্সে তিনি তুষ্ট ছিলেন বলে মনে হতো। বড় মেয়ে মোটামুটি ধার্মিক, মেঝো মেয়ে ধর্মে-কর্মে আম্মার কার্বন কপি, ছোটজন ইহকাল-পরকাল নিয়ে চলনসই।
আমার আব্বা বৈষয়িক ছিলেন না, সামাজিকও না। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা ক্লাব অথবা চায়ের স্টলে আড্ডায় উৎসাহী ছিলেন না। অফিস করে বাসায় ফিরে চুলার ধারে চৌকিতে বসে হুক্কা টানতেন আর কেটলি থেকে কাপের পর কাপ চা খেতেন। এক চুমুক আমার মুখেও পড়ত। বলাবাহুল্য, আমার পরবর্তী জীবনের চায়ের নেশার আদি উৎস আমার আব্বা। চা আর হুক্কার ফাঁকে টুকটাক আম্মার কাজে সাহায্য করতেন, দুনিয়ার তাবৎ গল্প করতেন। আব্বা ছিলেন ‘বকাউল্লাহ’, আম্মা ‘শোনাউল্লাহ’। তাঁদের মধ্যে কখনও কথা-কাটাকাটি হয়নি। কেনাকাটার জন্য কোনো দিন বাজারে গেছেন—এমন ‘অত্যাশ্চর্য’ ঘটনার সাক্ষী অন্তত আমি ছিলাম না।
তা হলে সংসার চলত কীভাবে?
আমার আম্মা গুলেনুর বেগম, ওরফে গুলবাহার বেগম, জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ—সবই করতেন। আব্বা-আম্মা যেহেতু ঘুষ ঘৃণা করতেন, তাই সর্বসাকুল্যে ১৩০ টাকা মাইনের সংসারে এতগুলো বাচ্চাকাচ্চা সামাল দেওয়ার প্রয়োজনে তিনি ছিলেন ব্যয়সাশ্রয়ী পথ বেছে নেওয়া একজন ‘অর্থনীতিবিদ’। আব্বা ও আম্মার তেমন কোনো চাহিদা ছিল না—একখানা চৌকিতে কাঁথা বিছিয়ে শোওয়া, আলুভর্তা আর শুঁটকি তাঁদের কাছে জম্পেশ খাবার। কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য বাসায় কোনো কাজের লোক ছিল না। প্রায়ই আম্মার পরনে দেখতাম ছেঁড়া শাড়ি। একে-ওকে দিয়ে বাজার করানো, অতিরিক্ত আয়ের জন্য সামান্য জমি বর্গা দেওয়া কিংবা কোনো বেপারির ব্যবসায় সামান্য কিছু টাকা লগ্নি করার জন্য ছুটে যেতেন গ্রামে। তাঁর একটি হিসাবের খাতা ছিল, যেখানে মাসের আয় ও ব্যয়ের উৎস লিখে রাখতেন। আমার অর্থনীতিবিদ মায়ের বাজেট সব সময় ভারসাম্যপূর্ণ ছিল—কাপড় অনুযায়ী তিনি কোট কাটতেন; ধারের ধার ধারতেন না।
শুধু কি তাই?
গৌরীপুর না দেবীদ্বারে, তা মনে নেই। আম্মা যে তলে তলে কোনো এক বীমা কোম্পানির—খুব সম্ভব আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির—মহিলাদের পলিসি এজেন্ট ছিলেন, তা জানা ছিল না। একবার বেশি পলিসি বিক্রির সহায়তার জন্য পুরস্কার হিসেবে তাঁকে একটি বড় ডিনার সেট বাসায় পাঠানো হয়। শুনেছি, আরও একটি পুরস্কার নিতে তাঁর করাচি যাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু পর্দানশীন আম্মা কোনোভাবেই রাজি ছিলেন না।
আব্বা ছিলেন দাউদকান্দি ও হোমনা—উভয় থানার সাব-ইন্সপেক্টর অব স্কুলস (এসআই); নামের আগে লিখতেন মৌলভী সিদ্দিকুর রহমান, বিএবিটি। পরবর্তীকালে অবশ্য তাঁকে আর ‘মৌলভী’ পদবি ব্যবহার করতে দেখিনি। গায়ে পাজামা, পাঞ্জাবি, কালো শেরওয়ানি এবং মাথায় জিন্নাহ কিংবা লিয়াকত আলী টুপি পরে আব্বা স্কুল পরিদর্শনে যেতেন।
গোমতী ও মেঘনা নদীর শাখা-সংযোগে অবস্থিত সেই কালের দাউদকান্দি ছিল একটি ব্যস্ত এবং বিখ্যাত নৌবন্দর।
পুরো চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে ঢাকা আসা-যাওয়ার জন্য, রেল ও বিমান ব্যতীত, প্রধান ফটক ছিল দাউদকান্দি। পারাপারের কাজে ছোট-বড় কয়েকটি লঞ্চ সব সময় ঘাটে নোঙর করা থাকত—এমএল দাউদকান্দি, এমএল আমেনা ইত্যাদি। দেখেছি, লঞ্চঘাটে পানির ওপর ভাসছে তেল। লঞ্চ ভেড়ামাত্রই কুলিদের চিৎকার-চেঁচামেচি এবং বানরের মতো লঞ্চ ডিঙিয়ে যাত্রীদের মালামাল নিয়ে টানাহেঁচড়া। লঞ্চ চলত দাউদকান্দি–গোয়ালমারি–কালীরবাজার–বেলতলী–কালিপুর এবং তারপর মূল মেঘনা নদী ধরে সোজাসুজি নারায়ণগঞ্জে। সর্বসাকুল্যে তিন-চার ঘণ্টার ব্যাপার।
দাউদকান্দি থেকে কুমিল্লা যাতায়াতের জন্য ছিল বাস। পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরপর কিংবা একটি বাস আসার পর আরেকটি ছাড়ত। সরু পিচঢালা পথ হওয়ায় একটি বাস সাইড করে অন্যটিকে যেতে বা আসতে দিত। আর তখন বাস বলতে ছিল ‘মুড়ির টিন’—পেছনে পাদানি দিয়ে ওঠানামা, সামনে বড় জায়গাজুড়ে গাড়ির ইঞ্জিন। কন্ডাক্টর ইঞ্জিনের সামনের ফুটো দিয়ে লম্বা রড ঢুকিয়ে ঘোরালে তবেই চালক গাড়ি স্টার্ট দিতে পারতেন। ড্রাইভারের পাশে—মানে ‘ভিআইপি’ ক্লাসে—দুজন বসতে পারত এবং সে জন্য অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হতো। অবশ্য আব্বার মতো অফিসারদের জন্য ওটা ছিল রিজার্ভ সিট।
বাসের পেছনের পাদানি থেকে চালকের সিট পর্যন্ত লম্বা চিকন দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকত একটি ঘণ্টা। এক টুং মানে থামুন, দুই টুং মানে চলুন, তিন বা ততোধিক টুং মানে জরুরি সাইড দিন। যাত্রীর গন্তব্যে পৌঁছামাত্রই কন্ডাক্টর দড়ি টেনে ঘণ্টা বাজিয়ে চালককে গাড়ি থামানোর ইঙ্গিত করতেন। বাসের ভেঁপু ছিল বিউগলের বাঁশির মতো। রাবারে চাপ দিলে অনেক দূর থেকে ‘ভোঁয়াত ভোঁয়াত’ আওয়াজ ভেসে আসত। রাস্তায় কয়েকবার সামনের ডালা তুলে বাসটিকে পানি না খাওয়ালে বাসটি বিদ্রোহ করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত।
মোটকথা, বাসস্টেশন আর লঞ্চঘাট নিয়ে গোমতী ও মেঘনাবিধৌত দাউদকান্দি ছিল এ অঞ্চলের বিখ্যাত এক বন্দর। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকত। বড় সাহেবদের বিশ্রামের জন্য বিশাল জায়গাজুড়ে নির্মিত একটি ডাকবাংলো ছিল এর অন্যতম সাক্ষী। সুলতান আহমেদ চৌধুরী নামের একজন লঞ্চের মালিক ছিলেন বেশ প্রভাবশালী। শুনেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শান্তি কমিটির সভাপতি ছিলেন।
গোমতী নদীর কাছাকাছি একটি দালানঘরে ছিল আমাদের বাসা। বাসার সামনে এক দোকানে বাজত কলের গান। একটি ঘুরন্ত রেকর্ডের ওপর একটি পিন বসানো মাত্রই গান বেরিয়ে আসত—বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকত সেই শিশু। সে সময়ের দাউদকান্দিতে লাইসেন্সধারী গাঁজা ও আফিমের দোকানও ছিল।
দাউদকান্দির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময় একবার ফার্স্ট বেঞ্চে বসব বলে বেশ আগে পৌঁছে যাই। গিয়ে দেখি, ক্লাসের দরজা বন্ধ, তবে বেশ উঁচুতে থাকা জানালাটি খোলা। কোনোমতে জানালার কার্নিশে উঠে লাফ দিয়ে নিচে নামতে গিয়ে আমার বাঁ হাত মচকে গেল। কী আর করা! বগলের নিচে বই-খাতা আর এক হাতের ওপর অন্য হাত ঝুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরেছিলাম। ভাগ্যিস, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র আমার ছোট কাকা তখন বাসায় ছিলেন। আমাকে দেখেই বললেন, হাতটা ভেঙে গেছে। অগত্যা ঢাকা যাওয়া এবং প্লাস্টার করে বাড়ি ফেরা।
এর আগেও নাকি, যখন আমি কোলের শিশু, কালাজ্বরের চিকিৎসার জন্য আমাকে নিতে হয়েছিল ঢাকা মেডিকেলে। শুনেছি, বুড়িগঙ্গায় একটি গিনিস নৌকা (হাউসবোট) ভাড়া করা হয়েছিল আমাদের থাকার জন্য। ওই নৌকা থেকে একবার নামতে গিয়ে আম্মার হাত থেকে আমি ছিটকে পানিতে পড়ে যাচ্ছিলাম। এমন সময় বড় মামা মুজিবুর রহমান দুই হাতে ক্যাচ ধরে আমাকে বাঁচান।
আমার স্কুলটি ছিল থানা পেরিয়ে। লক্ষ করতাম, থানার সামনের বারান্দায় দু পা ফাঁক করে, রাইফেলের বাট মাটিতে রেখে ব্যারেল ওপরে ধরে সটান দাঁড়িয়ে আছেন একজন পুলিশ। গায়ে খাকি হাফপ্যান্ট, হাফশার্ট; পায়ে পামশু, আর মোজা হাঁটু পর্যন্ত টানা।
স্কুলে যেতে যেতে প্রায়ই শুনতে হতো পুলিশের বেধড়ক পিটুনি খাওয়া আসামির গগনবিদারী চিৎকার। কখনো ভীতসন্ত্রস্ত, দুরুদুরু বুকে চুপিসারে খুব কাছে গিয়ে দেখতাম, লম্বা একটি বাঁশ আসামির মুখে ঢুকিয়ে কিংবা মুখে কাপড় গুঁজে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা চলছে—‘বল, শুয়োরের বাচ্চা, তুই চুরি করছিস কি না।’
আমার পরিচিত এক কাকাকে রেশনের মাল এদিক-ওদিক করার অভিযোগে গারদে যেতে হয়েছিল। উঁকি মেরে তাকেও দেখেছিলাম।
গল্পে আছে, এক বাবা তাঁর শিশুকে নিয়ে গেলেন চোর দেখাতে। চোরটিকে মেরে প্রায় আধমরা করে ঘিরে রেখেছে লোকজন। শিশুটিকে কাঁধের ওপর বসিয়ে ভিড় ঠেলে বাবা যেই না বললেন, ‘ওই দেখ, চোর’, শিশুটি বলে উঠল, ‘চোর কই, বাবা? ও তো একজন মানুষ।’
পাদটীকা
পুলিশের পিটুনি আর আসামির বিকট চিৎকার আমার শিশুমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে থাকে। মনে মনে কামনা করতে থাকলাম—আর যাই হোক, ভবিষ্যতে চোর হওয়া চলবে না।
আম্মা বলতেন, শবে বরাত ও শবে কদরের রাতে আল্লাহর কাছে যা চাওয়া হয়, তিনি তা কবুল করেন। বলাবাহুল্য, ওই দুই রাতে শিশুটির একমাত্র প্রার্থনা ছিল—
‘হে আল্লাহ, আমাকে চোর বানিও না।’
(চলবে)
লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
এইচআর/এএসএম








