ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষদের কাছে একেকটি সকাল যেন আগের চেয়ে বেশি ঘোলাটে, বেশি বিষণ্ন হয়ে উঠছে। কারণ, নতুন সকাল শুরু হওয়ার মানে হলো, আরেকটি রাত শেষ হয়ে যাওয়া, যে রাতে নিখোঁজ প্রিয়জনের অলৌকিকভাবে ফিরে পাওয়ার প্রার্থনা করে সাড়া পাওয়া যায়নি।

ভেনেজুয়েলার সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা জান কার্লোস রোয়া গার্সিয়া ও তাঁর পরিবারও অনেকের মতোই খোলা আকাশের নিচে দুঃস্বপ্নের রাত কাটাচ্ছে। কারাকাসে তাঁদের আবাসিক ভবন ধসে পড়েনি ঠিকই, কিন্তু সেটি এতটা ঝুঁকিপূর্ণ যে সেখানে ফেরা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় পরিবারকে কীভাবে আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নেবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন তিনি।

রোয়া গার্সিয়া বলেন, ‘আমার এখন ৫০ বছর না হয়ে যদি ৩০ বছর বয়স হতো, তবে হয়তো পারতাম। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করব, সেটাই জানি না। আর এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।’

গার্সিয়া ভেনেজুয়েলা সরকারের ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করলেও সাবেক সরকারি কর্মচারী হওয়ায় তিনি কড়া সমালোচনা করার বিষয়ে সংযত ছিলেন।

তবে সংগীতশিল্পী জাইরা কাস্ত্রোর ক্ষেত্রে এমন সংযম দেখা যায়নি। ধসে পড়া দুটি ভবনের কাছে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই ভীষণ হতাশ। কারণ, সরকার কার্যকর ও দৃশ্যমান সহায়তা দেখাতে পারছে না।’

মৃত্যু ১৪০০ ছাড়াল, ৫০ হাজার নিখোঁজ

এই সংগীতশিল্পী আরও বলেন, ‘আসলে আমরা ভেনেজুয়েলার বাসিন্দারা একে অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছি। আমাদের সমাজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে মানুষ নিজেরাই একে অপরকে সাহায্য করে। আমরা সরকারের ওপর নির্ভর করি না।’

অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ স্থানীয় মেয়রকে সঙ্গে নিয়ে কারাকাসের ক্ষতিগ্রস্ত চাকাও এলাকা পরিদর্শন করেন। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র ক্ষোভের মুখোমুখি হন তিনি।

এক বাসিন্দা চিৎকার করে বলেন, ‘এত বড় একটি ট্র্যাজেডির মধ্যেও আপনারা প্রচার চালাচ্ছেন! সরকার সাধারণ মানুষের জন্য কিছুই করছে না!’

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো, বিশেষ করে উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরার অবস্থা বেশ করুণ। সেখানে শতাধিক ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। এসব ভবনের চারপাশে দেখলে মনে হয়, কোনো ভীষণ বিপর্যয় ঘটে গেছে।

এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবিত ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়ার আশা যত ক্ষীণ হচ্ছে, মানুষের ক্ষোভও তত বাড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের একজন আইলিন লাদা বলেন, ‘এখনো ধ্বংসস্তূপে মানুষ আটকে আছে। আমাদের ভারী যন্ত্রপাতি দরকার। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন।’

বিধ্বস্ত ভবনে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা

ভেনেজুয়েলার স্থানীয় উদ্ধারকারী দল ও আন্তর্জাতিক সহায়তাকারীরা অসাধারণ ধৈর্য, দৃঢ়তা ও একাগ্রতা নিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অনেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত মানুষকে বের করে আনছেন। সেই মুহূর্তগুলোয় ভেনেজুয়েলার মানুষদের স্বভাবসুলভ প্রাণশক্তি, হাস্যরস ও মানবিক উচ্ছ্বাসের প্রকাশ অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে।

ভেনেজুয়েলায় কয়েক দশক ধরে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলো এখন বিপুল রোগী ও আহত মানুষের চাপ সামলানোর চেষ্টা করছে।

শিশুসন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই ধ্বংসস্তূপে প্রাণ দিলেন মা

চিকিৎসক ও নার্সরা তাঁদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিগুলোর একটি মোকাবিলা করছেন। তাঁরা তাঁদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষেরা ভূমিকম্পের সময়কার বর্ণনা দিচ্ছেন। এমনই একজন মারিয়া ভার্গাস এএফপিকে বলেন, ‘এটা ছিল ভয়াবহ ঘটনা। এত মানুষ মারা গেছে, এত পরিবারের সদস্য নিখোঁজ হয়ে গেছে। আমি আমার বাড়িটা পুরোপুরি হারিয়েছি, কিন্তু স্রষ্টার কৃপায় আমরা বেঁচে আছি।’

উদ্ধারকর্মীরা বলে থাকেন, ভূমিকম্পের পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। এখন ভেনেজুয়েলা এমন এক কঠিন মুহূর্তের মুখোমুখি, যা দেশটির আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি বলে মনে হচ্ছে।