বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। সাধারণ কৃষিজাত কাঁচামালের চেয়ে এখন বিশ্বজুড়ে প্রক্রিয়াজাত খাবারের কদর বেড়েছে কয়েকগুণ। ফল ও বিভিন্ন খাদ্যশস্যকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে দীর্ঘ সময় ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠেছে এক বিশাল বাণিজ্যিক বাজার।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সবশেষ বৈশ্বিক ডেটাবেজ থেকে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের এক চমৎকার চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ নিজেদের আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রযুক্তির জোরে এই খাতে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করছে। বিশেষ করে, এশিয়ার দেশগুলো কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য দেখাচ্ছে। বর্তমানে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে অর্ধেকের বেশি এ অঞ্চলে অবিস্থিত।

আরও পড়ুন

ফলের খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে জুতা-ব্যাগ! ফ্যাশনে সবুজ বিপ্লব

চলুন দেখে নেওয়া যাক বিশ্বজুড়ে ফল ও অন্যান্য শস্য প্রক্রিয়াজাতকরণে শীর্ষ ১০ দেশের বিস্তারিত চিত্র:

১. চীন: বৈশ্বিক উৎপাদনের একক চালিকাশক্তি

সবাইকে ছাড়িয়ে ফল ও ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণে বিশ্বের এক নম্বর দেশ হয়ে উঠেছে চীন। দেশটির মোট বার্ষিক প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ৯৫ লাখ ২৬ হাজার ৬৭৬ টন। চীনের এই বিশাল অর্জনের পেছনে রয়েছে তাদের দক্ষ জনশক্তি এবং সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যবস্থা। তাদের কারখানাগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রক্রিয়াজাত হয় বিয়ার, সয়াবিন তেল এবং চিনি। এছাড়া চা প্রক্রিয়াজাতকরণেও চীন বিশ্বে অনন্য ভূমিকা পালন করে।

২. ব্রাজিল: লাতিন আমেরিকার মুকুটহীন সম্রাট

তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ফুটবল ও সাম্বার দেশ ব্রাজিল। লাতিন আমেরিকার এই দেশটির মোট প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ ৯ কোটি ৯৩ লাখ ৪৬ হাজার ৩২৯ টন। ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান চিনি উৎপাদনকারী দেশ। আখের চিনি এবং এর উপজাত পণ্য হিসেবে চিটাগুড় উৎপাদনে ব্রাজিল বিশ্বে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে আছে। এছাড়া বিয়ার উৎপাদনেও দেশটি অনেক এগিয়ে।

grapes
আঙুর থেকে ওয়াইন তৈরির কারখানা/ ছবি: পেক্সেলস

৩. ভারত: দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ প্রক্রিয়াজাতকারী

তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম দেশ ভারত। ভারতের মোট ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ ৮ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫১৩ টন। বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং প্রচুর কাঁচামালের সহজলভ্যতার কারণে ভারত এই খাতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ভারতের প্রধান প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে চিনি, চিটাগুড় এবং বিপুল পরিমাণ তুলার বীজ।

৪. ইন্দোনেশিয়া: দ্বীপরাষ্ট্রের পাম বিপ্লব

তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া। ইন্দোনেশিয়ার মোট প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ ৬ কোটি ৮৩ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫১ টন। মালয়েশিয়ার মতো ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিও পাম তেল উৎপাদনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বৈশ্বিক বাজারে পাম তেলের সিংহভাগ জোগান আসে এই দেশ থেকেই। তাদের প্রধান পণ্যের মধ্যে পাম তেল এবং পাম কার্নেল তেল অন্যতম।

আরও পড়ুন

কাঁঠালের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব ‘চামড়া’, বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা

৫. যুক্তরাষ্ট্র: উত্তর আমেরিকার সুপার পাওয়ার

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের শীর্ষ তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে। দেশটির মোট বার্ষিক প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ ৫ কোটি ৯০ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৭ টন। আমেরিকার বিশাল কৃষিখাত থেকে উৎপাদিত কাঁচামাল দেশীয় উন্নত প্রযুক্তির কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা হয়। তাদের প্রধান পণ্যের মধ্যে সয়াবিন তেল, বিয়ার এবং চিনি অন্যতম।

berry
জাম প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা/ ছবি: পেক্সেলস

৬. রাশিয়া: বিশাল ভূখণ্ডের বৈচিত্র্যময় উৎপাদন

আয়তনে বিশ্বের বৃহত্তম দেশ রাশিয়া প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেও বেশ শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। ২ কোটি ৭০ লাখ ৫৩ হাজার ৫১৭ টন বার্ষিক উৎপাদন নিয়ে রাশিয়া রয়েছে তালিকার ষষ্ঠ স্থানে। দেশটির প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় বিয়ার, সূর্যমুখী তেল এবং আখের চিনি। ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে রাশিয়ার এই পণ্যগুলোর বিশাল সরবরাহ রয়েছে এবং দেশটি নিজস্ব অভ্যন্তরীণ চাহিদাও সহজে মেটায়।

আরও পড়ুন

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে মালয়েশিয়ার ডুরিয়ান ফলের চাহিদা

৭. মালয়েশিয়া: পাম তেলের স্বর্গরাজ্য

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরেক অর্থনৈতিক পরাশক্তি মালয়েশিয়া রয়েছে তালিকার সপ্তম স্থানে। দেশটির মোট প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ ২ কোটি ৫৬ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৫ টন। মালয়েশিয়ার পুরো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প মূলত পাম পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির মূল উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে পাম তেল এবং পাম কার্নেল তেল। ভোজ্যতেলের বৈশ্বিক বাজারে মালয়েশিয়া অন্যতম প্রধান অংশীদার।

৮. মেক্সিকো: উত্তর আমেরিকার বড় শক্তি

লাতিন আমেরিকার অন্যতম প্রধান অর্থনীতি মেক্সিকো রয়েছে আমাদের তালিকার অষ্টম স্থানে। মেক্সিকোর মোট বার্ষিক প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ ৫৪ হাজার ৪৪১ টন। বৈশ্বিক বাজারে মেক্সিকোর উৎপাদিত পণ্যের বেশ বড় চাহিদা রয়েছে। দেশটিতে সবচেয়ে বেশি প্রক্রিয়াজাত হয় বিয়ার, চিনি এবং বিভিন্ন প্রকার ভেষজ তেল। যুক্তরাষ্ট্র সংলগ্ন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তাদের রপ্তানি বাণিজ্য অনেক সহজ।

fruit
চীনের একটি ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা/ ফাইল ছবি: শিনহুয়া

৯. থাইল্যান্ড: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাওয়ার হাউজ

তালিকার নবম স্থানে জায়গা করে নিয়েছে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ থাইল্যান্ড। দেশটির মোট প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ ২ কোটি ১৫ লাখ ১০ হাজার ৭২৫ টন। থাইল্যান্ডের প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে চিনি উৎপাদন এবং এর উপজাত হিসেবে তৈরি হওয়া চিটাগুড়। এর পাশাপাশি এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে সরবরাহের জন্য দেশটি বিপুল পরিমাণে পাম তেলও প্রক্রিয়াজাত করে থাকে।

আরও পড়ুন

চীনে ১৬ হাজার টন তাজা লিচু রপ্তানি করেছে ভিয়েতনাম

১০. জার্মানি: ইউরোপের শীর্ষ প্রক্রিয়াজাতকারী

এই তালিকার ১০ম স্থানে রয়েছে ইউরোপের দেশ জার্মানি। জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জার্মানির ফল ও ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ ৪০ হাজার ৮৪২ টন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে দেশটি অত্যন্ত উন্নত। জার্মানির প্রধান প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে বিয়ার, চিনি এবং রেপসিড বা ক্যানোলা তেল। ইউরোপের বাজারে জার্মানির প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বিশাল আধিপত্য রয়েছে।

প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প শুধু খাদ্যের স্থায়িত্বই বাড়ায় না, বরং একটি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতেও বড় ভূমিকা রাখে। শীর্ষ দেশগুলোর এই উৎপাদন চিত্র প্রমাণ করে, আগামী দিনে বিশ্ব অর্থনীতিতে কৃষিজাত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের গুরুত্ব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোও এখন কাঁচামাল রপ্তানি কমিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের দিকে ঝুঁকছে।

সূত্র: জাতিসংঘ
কেএএ/