গ্রামের এক কোণে ছোট ফটোস্টুডিও আর মুঠোফোন মেরামতের দোকান। স্কুল ছুটির পর কিংবা অবসর মিললেই সেখানে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত এক কিশোর। নিজের কোনো কম্পিউটার ছিল না, তাই দোকানদারের অনুপস্থিতিতে ক্যাশ সামলানোর বিনিময়ে মিলত কি–বোর্ডে আঙুল ছোঁয়ানোর সুযোগ। ইয়াহু আর এমএসএন মেসেঞ্জারের সেই যুগে যে প্রযুক্তির মায়ায় পড়েছিলেন নেয়ামত উল্যাহ, সেই মায়াই আজ রূপ নিয়েছে দেশের ভিডিও স্ট্রিমিং ও ওটিটি দুনিয়ার অন্যতম শক্তিশালী মেরুদণ্ডে।
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার চনুয়া গ্রামে নেয়ামত উল্যাহর বেড়ে ওঠা। বাবা শরাফত উল্যাহ মফস্সলে ছোট একটি কনফেকশনারি দোকান চালাতেন, মা মরিয়ম বেগম সামলাতেন সংসার। দুই ভাই ও এক বোনের পরিবারে সচ্ছলতার টানাপোড়েন থাকলেও শেখার তীব্র আগ্রহে ভাটা পড়েনি কখনো। চাঁদপুরের শাহরাস্তির বেরনাইয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এসএসসি এবং ২০১৩ সালে কুমিল্লা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন নেয়ামত উল্যাহ। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পা রাখেন রাজধানীতে। ভর্তি হন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলী (সিএসই) বিভাগে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জনের চেয়ে বাস্তবিক প্রয়োগ ও উদ্ভাবনের নেশাই তাঁকে বেশি টানত, যার ফলে এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে দেন।
২০১৪ সালে ঢাকায় এসে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসে সাধারণ কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন নেয়ামত উল্যাহ। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি ছিল দূরদিগন্তে। কাজের ফাঁকে প্রিন্টিং অটোমেশন নিয়ে ভাবতেন, যুক্ত হয়েছিলেন দেশের ই-কমার্স খাতের আঁতুড়ঘর ই-ক্যাবের নীতি প্রণয়ন ও পাঠক্রম তৈরিতে। পরে কম্পিউটার সোর্স লিমিটেডেও চাকরি করেন। তবে নিজের কিছু করার অদম্য স্বপ্ন তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি।

নেয়ামত উল্যাহর চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুর দিনগুলো ছিল তীব্র সংগ্রামের। তখন সম্বল বলতে ছিল মাত্র এক মাসের বেতন আর উৎসব বোনাসের জমানো মোট ১৬ হাজার টাকা। এই সামান্য অর্থ দিয়েই তাঁকে পার করতে হয়েছিল টানা ছয় মাস। প্রতিদিনের যাতায়াত খরচ বাঁচাতে মতিঝিলের বাসা থেকে ধানমন্ডিতে অবস্থিত ই-ক্যাব কার্যালয় বা বিভিন্ন প্রযুক্তির অনুষ্ঠানে বেশির ভাগ সময় হেঁটেই যাতায়াত করতেন তিনি। সেই কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়েই ২০১৫ সালের নভেম্বরে মাত্র কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সফটওয়্যার তৈরির প্রতিষ্ঠান ‘নুসরাটেক’। পাশাপাশি সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গড়ে তোলেন ভাষা শিক্ষার জনপ্রিয় মাধ্যম ‘সার্চ ইংলিশ’, যা পরবর্তী সময় ফেসবুকের বৈশ্বিক স্বীকৃতিও অর্জন করে।
২০১৮-১৯ সালের দিকে একটি লাইভ কুইজ স্ট্রিমিং অ্যাপ তৈরি করতে গিয়ে বড় ধাক্কা খান নেয়ামত উল্যাহ। বিজ্ঞাপন মডেল কার্যকর না হওয়ায় প্রকল্পটি বন্ধ করে দিতে হয়। কিন্তু এই ব্যর্থতাই তাঁর সামনে খুলে দেয় এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। লাইভ ভিডিওর গতি ও নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ ঠিক রাখতে গিয়ে তিনি রপ্ত করে ফেলেন কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক (সিডিএন) ও ভিডিও ল্যাটেন্সির অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তি। সেই ব্যর্থতার ছাই থেকেই জন্ম নেয় আজকের সফল ব্র্যান্ড ‘গতিপথ’।
নাশতার ৩০ টাকা বাঁচানো গালিব কুয়েট প্রকৌশলী, অতঃপর লাখ ডলারের নায়কনেয়ামত উল্যাহর মূল দর্শন অত্যন্ত স্পষ্ট—অহেতুক অন্ধ উদ্ভাবনের চেয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সঠিক ‘লোকালাইজেশন’। বিদেশি ক্লাউড প্ল্যাটফর্মগুলোতে কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাওয়ার বিপরীতে তিনি দেশেই গড়ে তুললেন বিশ্বমানের ভিডিও অবকাঠামো। আজ দেশের ওটিটি ও ডিজিটাল দুনিয়ার সিংহভাগ রোমাঞ্চের নেপথ্য চালিকাশক্তি ‘গতিপথ’। চরকি, দীপ্ত প্লে, বায়োস্কোপ+, আকাশ গো, দোয়েল, ঘুড্ডি টিভি, উৎসব কিংবা টেন মিনিট স্কুল আর টফির মতো শীর্ষ মাধ্যমগুলোর দ্রুতগতির ভিডিও ডেলিভারি, অ্যাপ তৈরি কিংবা ক্লাউড অবকাঠামোর পেছনে দিনরাত কাজ করছে নেয়ামত উল্যাহর নেতৃত্বাধীন প্রায় ২৭ জন তরুণ তুর্কির একটি দক্ষ দল।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত দেখা গেছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ আসরে। বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক দর্শকের লাইভ স্ট্রিম দেখার চাপ সামলানো ছিল এক বিশাল কারিগরি চ্যালেঞ্জ। এ সময় ‘গতিপথ’ বায়োস্কোপকে একটি সর্বাধুনিক ‘মাল্টি-সিডিএন’ সমাধান সরবরাহ করে। একাধিক সিডিএন সরবরাহকারীর মধ্যে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ট্রাফিক বণ্টন করে কোটি দর্শকের জন্য নিশ্চিত করা হয় নিরবচ্ছিন্ন ও বাফারবিহীন ম্যাচ উপভোগের অভিজ্ঞতা, যা দেশের ভিডিও অবকাঠামোর সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
ঘুরে দাঁড়ালেন দেনায় জর্জর রুহুল আমিন, এখন সফল উদ্যোক্তাকেবল লাইভ স্ট্রিমিং নয়, কনটেন্ট ফরম্যাটের উদ্ভাবনেও গতিপথ রেখেছে অগ্রণী ভূমিকা। দীপ্ত প্লে-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ওটিটি ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথমবারের মতো চালু করা হয় সাড়া জাগানো ‘মাইক্রো-ড্রামা’ ফরম্যাট। স্বল্পদৈর্ঘ্যের এই কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম তৈরির অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গতিপথ এখন একটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বে বিশ্ববাজারের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ মাইক্রো-ড্রামা প্ল্যাটফর্ম নির্মাণে কাজ করছে। অর্থাৎ দেশে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা এবার সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হতে চলেছে।
দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গতিপথ এরই মধ্যে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সফলভাবে কাজ করছে মালয়েশিয়ার সরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠান ‘টেলিকম মালয়েশিয়া’র সঙ্গে এবং দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে।
প্রথম আলোর সংবাদ পড়ে বিষণ্নতা কাটালাম, হয়ে উঠলাম তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তাভবিষ্যতের গতিপথ নিয়ে নেয়ামত উল্যাহর পরিকল্পনা আরও সুদূরপ্রসারী। নেয়ামত উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের মেধাবী তরুণ প্রকৌশলীদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক প্রযুক্তি (ফিনটেক) ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি (হেলথটেক) খাতে বিশ্বমানের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য। ওটিটি ও স্ট্রিমিং অবকাঠামোতে বিদেশি কোম্পানির নির্ভরতা কমিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার যে দৃষ্টান্ত গতিপথ তৈরি করেছে, ভবিষ্যতে সেই একই মডেল প্রয়োগ করা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিকস এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা খাতে।’
নেয়ামত উল্যাহর দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের মেধা আন্তর্জাতিক মানের, প্রয়োজন কেবল সঠিক প্ল্যাটফর্ম, বিনিয়োগ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। গতিপথ সেই সেতুবন্ধনটিই তৈরি করতে চায়, যাতে দেশি মেধার উদ্ভাবন বিশ্ববাজারে রপ্তানি হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ শুধু তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রদানকারী হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ‘প্রযুক্তি রপ্তানিকারক দেশ’ হিসেবে নিজের স্থায়ী পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে পারে।



