একটি উদারনীতি ও সুন্দর সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি হলো বিভেদের বদলে ঐক্য এবং সংঘাতের বদলে শান্তির নীতি মেনে চলা। সমাজ থেকে হিংসা, হানাহানি ও অশান্তি দূর করে সবাই মিলেমিশে সুখে-শান্তিতে বসবাস করার মাঝেই মানবতার আসল সৌন্দর্য নিহিত। এ সুন্দর বার্তাটি বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য নেতৃত্বের জায়গা থেকে কিছু সহজ উপায় বের করে নিতে হয়। যেমন যে কোনো বিষয়ে মতের অমিল হলে ভুল বোঝাবুঝি বা সংঘাত তৈরি না করে, নেতৃত্বের দূরদর্শিতা নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে, কারণ আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব।

পাশাপাশি একে অপরের ধর্ম, বর্ণ ও ভিন্নমতকে সম্মান জানানো অপরিহার্য মনে করতে হবে। কারণ এ পারস্পরিক সম্মানই সমাজে একতা বা ঐক্য তৈরি করে। সেই সঙ্গে সমাজে যারা দুর্বল বা পিছিয়ে পড়া মানুষ, তাদের সাহায্য করতে সহমর্মিতা নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত, যা মানুষের মধ্যকার ভালোবাসার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। বাস্তব জীবনের ভিত্তিতে এর উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে একটি পরিবারে যেমন সব ভাই-বোন মিলে সুখে থাকে, তেমনই পুরো দেশ বা সমাজকে একটি বড় পরিবারের মতো ভেবে বাস্তবতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হয়।

একজনের বিপদে অন্যজন এগিয়ে এলে সমাজে কোনো অশান্তি থাকে না। সম্প্রীতির এই বার্তা নিয়ে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারা এবং একতাবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, কারণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে যে কোনো কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়। তাই বিভেদে না গিয়ে আমাদের সবার উচিত শান্তি ও ঐক্যের পথে হাঁটা।

ধর্মীয় জ্ঞান ও মানবতার মানদণ্ডে সাফল্য অর্জন করার এটিই হলো প্রথম ধাপ, যেখানে সমাজ পরিবর্তনের মূল হাতিয়ার হলো দর্শনভিত্তিক জ্ঞানসমৃদ্ধ বই। এরকম বই বাংলাদেশের সমাজ, নেতৃত্ব ও জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়া সচেতন নাগরিকদের নৈতিক দায়িত্ব, যা সমাজের গুণগত পরিবর্তনে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগও বটে। তাই দেশের অর্থশালী ব্যক্তিদেরও এই মহৎ কাজে এগিয়ে আসা উচিত, কারণ জ্ঞানদানের এ বুদ্ধিবৃত্তিক কাজটিই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্রতম কাজ।

ইতিহাসের মহামনীষীদের অনেকেরই হয়তো অন্যকে অর্থদান, গৃহদান বা বস্ত্রদানের সামর্থ্য ছিল না, তবুও তারা আমৃত্যু জ্ঞানদান করে গেছেন। অর্থ, বস্ত্র কিংবা সুন্দর গাড়ি-বাড়ি মানুষকে কখনোই শান্তির পথ দেখায় না, বরং সেই প্রকৃত শান্তির পথ দেখায় মানবিক জ্ঞান ও সভ্যতার আলো।

বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জ্ঞানদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অতীতের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে শহীদ ও নির্যাতিতদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তাদের আদর্শের পথটি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।

৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-আন্দোলন, ৭০-এর নির্বাচন, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, এর সবটুকুতেই গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানব সভ্যতার শান্তি নিহিত রয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এর প্রতিটি অধ্যায় যে মহান লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু ও সমাপ্ত হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত কি আমরা সেই পরিকল্পিত ও কার্যকর সাফল্য পূর্ণাঙ্গভাবে অর্জন করতে পেরেছি?

দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভৌগোলিক দিক থেকে ছোট কিন্তু বীরত্বে অনন্য এক দেশ বাংলাদেশ, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যার জন্ম এবং যার উত্তরে হিমালয় ও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশি। এ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করেই স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে এসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর-উত্তম স্বনির্ভর বাংলাদেশকে নিজস্ব জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মেলবন্ধনে এক মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যার দূরদর্শী চিন্তাকে ধারণ করেই মূলত দেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

সময়ের চাহিদা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কারের এ ধারাবাহিকতা সুদীর্ঘ; যেমন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, ‘জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় পরিবর্তন ছিল’ (‘বাংলাদেশ : পলিটিক্স অ্যান্ড গভর্ন্যান্স’)। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালের একদলীয় শাসন ‘বাকশাল’ বিলুপ্ত করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার পতনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে সংবিধানে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থার প্রবর্তন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে সমৃদ্ধ করেছে। এরই পথ ধরে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষাই ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশ এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর, দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকার প্রথম দিন থেকেই সেই সংস্কার ও জবাবদিহির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। দেশের সচেতন মহল গভীরভাবে আশাবাদী যে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতি ও আদর্শের যোগ্য উত্তরাধিকারী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘৩১-দফা’ রাষ্ট্রীয় সংস্কার কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই অর্জিত হবে টেকসই শান্তি, দূর হবে সামাজিক বৈষম্য এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ রূপান্তরিত হবে একটি প্রকৃত মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্রে।

শায়রুল কবির খান : সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী