অরল্যান্ডো ব্লুমের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের ইতি, বিচ্ছেদের কষ্ট সামলে বিশ্বজুড়ে কনসার্ট, তারপর নতুন প্রেম। ব্যক্তিগত জীবনের বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া কেটি পেরি এখন ভালোবাসার কথা বলছেন খোলামেলাই। কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে বর্ণনা করেছেন নিজের জীবনের ভালোবাসার মানুষ হিসেবে। আজ রোববার, ২৫ অক্টোবর মার্কিন এই পপ তারকার ৪২তম জন্মদিন।
গত ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত পিপল সাময়িকীর সাক্ষাৎকারে কেটি জানান, ‘লাইফটাইমস ট্যুর’ তাঁকে ভক্তদের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ভালোবাসার মানুষেরও দেখা পাইয়ে দিয়েছে। বিচ্ছেদের কঠিন সময় পেরিয়ে এখন জীবনের ছোট ছোট আনন্দ উপভোগ করছেন তিনি। নতুন গান, কনসার্ট চলচ্চিত্র আর মেয়ে ডেইজিকে ঘিরে এগিয়ে চলেছে তাঁর জীবন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রেম
২০২৫ সালের জুলাইয়ে কানাডায় কনসার্ট সফরের সময় ট্রুডোর সঙ্গে কেটির ঘনিষ্ঠতার খবর সামনে আসে। ২৮ জুলাই মন্ট্রিয়লে তাঁদের একসঙ্গে নৈশভোজে দেখা যায়। এর দুই দিন পর মেয়েকে নিয়ে কেটির কনসার্টে যান ট্রুডো। এরপর বিভিন্ন আয়োজনে দুজনের উপস্থিতি সম্পর্কের আলোচনা আরও বাড়িয়ে দেয়।

কেটি পেরি


তখন কেটির জীবনে চলছিল বড় পরিবর্তন। দীর্ঘদিনের সঙ্গী হলিউড অভিনেতা অরল্যান্ডো ব্লুমের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদের খবর প্রকাশ্যে এসেছে। ২০১৬ সালে তাঁদের প্রেমের শুরু। মাঝে সাময়িক বিচ্ছেদের পর আবার এক হন তাঁরা। ২০১৯ সালে হয় বাগ্‌দান। পরের বছর জন্ম নেয় তাঁদের মেয়ে ডেইজি ডাভ ব্লুম।
২০২৫ সালের ৩ জুলাই দুজনের প্রতিনিধিরা বিচ্ছেদ নিশ্চিত করেন। একই সঙ্গে জানান, মেয়েকে যৌথভাবে বড় করে তোলার দিকেই মনোযোগ দিচ্ছেন কেটি ও অরল্যান্ডো।
ট্রুডোর সঙ্গে পরিচয়ের পর জীবনে পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন কেটি। চলতি বছরের ৮ জুন নিউইয়র্কের ট্রিবেকা চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের কনসার্ট চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ারে ট্রুডোকে নিয়ে লালগালিচায় হাঁটেন তিনি। সেখানকার এক আলাপচারিতায় কেটি বলেন, জীবনের নানা ক্ষেত্রে নিজেকে এখন আরও স্থির মনে হচ্ছে তাঁর। ট্রুডোর সঙ্গে ভালোবাসা তাঁকে পূর্ণতার অনুভূতি দিয়েছে।
সেপ্টেম্বরে পিপলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও উঠে আসে সেই সম্পর্কের প্রসঙ্গ। কেটি জানান, ট্রুডো তাঁর গান জানেন, কাজের প্রতি সমর্থন দেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য মানসিক ক্ষত সারিয়ে ওঠার মতো।
শুধু কনসার্ট বা চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার নয়, অন্য আয়োজনেও কেটির পাশে দেখা গেছে ট্রুডোকে। ১২ জুন ক্যালিফোর্নিয়ার ইংলউডে বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র-প্যারাগুয়ে ম্যাচের আগের অনুষ্ঠানে গান করেন কেটি। সেদিন ট্রুডোও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

আঘাত পেরিয়ে নতুন গান
কেটির সাম্প্রতিক গানেও উঠে এসেছে সম্পর্কের টানাপোড়েন, মানসিক আঘাত ও সেই অবস্থা পেরিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘ব্যান্ডএইডস’ গানে সম্পর্কের ক্ষত ও কষ্টের কথা উঠে আসে। তবে গানটির প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, এমন ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
চলতি বছরের ২৫ জুন প্রকাশিত হয় নতুন গান ‘ওয়াচ ইট বার্ন’। এতে দীর্ঘদিন চেপে রাখা ক্ষোভ ও কষ্ট প্রকাশের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে মুক্তি পাওয়া মিউজিক ভিডিওটি আগের ‘ব্যান্ডএইডস’-এর গল্প এগিয়ে নেয়।
ইউনিভার্সাল মিউজিক কানাডার ভাষ্য অনুযায়ী, গান দুটি মিলে আবেগের একটি যাত্রা তুলে ধরে—প্রথমটিতে আঘাত, পরেরটিতে সেই আঘাত থেকে মুক্তি। ‘ওয়াচ ইট বার্ন’-এর সহগীতিকার ও সহপ্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন জাস্টিন ট্রান্টারসহ কয়েকজন। ভিডিওটি পরিচালনা করেছেন ক্রিশ্চিয়ান ব্রেসলাওয়ার।

কেটি পেরি আর জাস্টিন ট্রুডোর প্রেম এখন ‘আনুষ্ঠানিক’। কোলাজ

পাঁচ মহাদেশে ৯১ কনসার্ট
ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময়েও কনসার্ট চালিয়ে গেছেন কেটি। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল মেক্সিকো সিটিতে শুরু হয় তাঁর ‘লাইফটাইমস ট্যুর’। পাঁচ মহাদেশের ২৩টি দেশে ৯১টি কনসার্টের এই সফর শেষ হয় ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর, আবুধাবিতে।
অরল্যান্ডোর সঙ্গে বিচ্ছেদের খবর প্রকাশের সময় কেটি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়।

পিপলকে সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে জানান, বন্ধুরা সবাই বাড়ির কাছাকাছি ছিলেন, আর তিনি ছিলেন অনেক দূরে। মন খারাপ হতো, কান্নাও পেত। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই মঞ্চে উঠেছেন, গান শুনিয়েছেন দর্শকদের।
সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘কেটি পেরি: দ্য লাইফটাইমস ট্যুর-লাইভ ফ্রম প্যারিস’। পল ডাগডেল পরিচালিত কনসার্ট চলচ্চিত্রটি গত ২ সেপ্টেম্বর মুক্তি পেয়েছে। এতে রয়েছে ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্যারিসের আকোর অ্যারেনায় ধারণ করা তাঁর পরিবেশনা।
যে গানে বদলে যায় ভাগ্য
১৯৮৪ সালের ২৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারায় জন্ম কেটি পেরির। তাঁর জন্মনাম ক্যাথেরিন এলিজাবেথ হাডসন। ছোটবেলায় গির্জায় গান গাইতেন। সংগীতজীবনের শুরুতে গসপেল গান করলেও পরে পপসংগীতে মনোযোগ দেন।
২০০৮ সালে ‘আই কিসড আ গার্ল’ তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। এরপর ‘হট এন কোল্ড’, ‘ফায়ারওয়ার্ক’, ‘রোর’, ‘ডার্ক হর্স’ ও ‘ক্যালিফোর্নিয়া গার্লস’-এর মতো গান তাঁকে পপসংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা করে তোলে।
২০১০ সালে প্রকাশিত টিনএজ ড্রিম তাঁর সংগীতজীবনের বিশেষ মাইলফলক। অ্যালবামটির পাঁচটি গান যুক্তরাষ্ট্রের বিলবোর্ড হট ১০০ তালিকার শীর্ষে ওঠে। প্রথম নারী শিল্পী হিসেবে এক অ্যালবাম থেকে পাঁচটি গান নিয়ে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন কেটি।
ইউনিভার্সাল মিউজিক কানাডার জুন ২০২৬-এর তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কেটির গান ১২ হাজার ৫০০ কোটির বেশিবার স্ট্রিম হয়েছে। বিশ্বজুড়ে তাঁর অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে সাত কোটির বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ছয়টি গান ও টিনএজ ড্রিম অ্যালবাম ডায়মন্ড সনদ পেয়েছে।

মেয়ে ডেইজিকে ঘিরে জীবন
দীর্ঘ সংগীতজীবনে সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচনাও সামলাতে হয়েছে কেটিকে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘১৪৩’ অ্যালবামটি কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে। এরপর বিচ্ছেদ, কনসার্ট সফর ও নতুন সম্পর্ক—সব মিলিয়ে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে তাঁর জীবন।
এ জীবনের বড় অংশজুড়ে রয়েছে ছয় বছর বয়সী মেয়ে ডেইজি। কনসার্ট সফরেও মেয়েকে সঙ্গে রেখেছেন কেটি। তাঁর আশা, মায়ের কাজ ও পরিশ্রম কাছ থেকে দেখে বড় হবে ডেইজি।
জন্মদিন উপলক্ষে রোববার প্রকাশিত পিপলের বিশেষ ফটোফিচারেও উঠে এসেছে মা-মেয়ের সম্পর্ক। সেখানে সেপ্টেম্বরের সাক্ষাৎকার থেকে কেটির একটি বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ডেইজি দেখছে, তার মা নিজের কাজের মধ্যে রয়েছেন; মাকে শক্ত থাকতে দেখছে—এটি মেয়ের জন্য ভালো।