ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে জয়ী বিএনপির আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করে দিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। নির্বাচিত সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না তিনি। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার এ রায় ঘোষণা করেন। এখন ওই আসনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া জামায়াতের প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে, নাকি সেখানে নতুন করে নির্বাচন হবে-আদালতের সংক্ষিপ্ত রায়ে তা স্পষ্ট হয়নি। রায় ঘোষণার পর আসলাম চৌধুরীর নির্বাচনি এলাকা সীতাকুণ্ডে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিকালে তার অনুসারীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। আস্ত গাছ কেটে মহাসড়কের ওপর ফেলে রাখেন। এতে প্রায় দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। ভোগান্তিতে পড়েন শত শত যাত্রী। আপিল বিভাগ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা করায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, আদালতের আদেশের কপি দেখে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। ভোটের

আগে ৩ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তা আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করলে ঋণখেলাপির অভিযোগে ইসিতে আপিল করেন জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী এবং যমুনা ব্যাংক। পরে আপিল খারিজ হলে সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে অভিযোগকারী দুই পক্ষ। ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট রিট আবেদন খারিজ করে দেন। ফলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে। পরে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন জামায়াত প্রার্থী। আপিল আবেদন মঞ্জুর করে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ৫ সদস্যের আপিল বেঞ্চ আদেশ দিয়ে বলেন, আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করা হলেও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী অংশ নিতে পারবেন। তবে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই আসনের ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না। মঙ্গলবার চূড়ান্ত শুনানি শেষে আপিল বিভাগ যে রায় দিয়েছেন, তাতে আসলাম চৌধুরীর সংসদে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেল।

আসলাম চৌধুরীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন, মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী ও রোকন উদ্দিন মো. ফারুক। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন ও যায়েদ বিন আমজাদ। এছাড়া ব্যাংক এশিয়ার পক্ষে আইনজীবী কামাল উল আলম এবং যমুনা ব্যাংকের পক্ষে এএসএম শাহরিয়ার কবির শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। নতুন করে নির্বাচন হলে আসলাম চৌধুরী অংশ নিতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অযোগ্যতা কাটিয়ে উঠলে তার নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই। একজন ব্যক্তির একটা নির্দিষ্ট সময়ের অযোগ্যতা তো আর সারা জীবন থাকবে না। মূল ইস্যু ছিল, মনোনয়নপত্র জমাদানের দিন তার স্ট্যাটাস কী (ঋণখেলাপি) ছিল। এটা হচ্ছে মেইন ইস্যু। পরবর্তী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি যদি সে অযোগ্যতা কাটিয়ে উঠে যোগ্য হন, তাহলে তার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা থাকার কথা না।

শিশির মনির বলেন, আপিল মঞ্জুর করার মানে হলো আসলাম চৌধুরী অযোগ্য হয়ে গেছেন এবং তার প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। আসলাম চৌধুরী ওইদিন ঋণখেলাপি ছিলেন বিধায় শুরু থেকেই তিনি অযোগ্য ছিলেন। এ রায়কে একটি ‘মাইলফলক’ ও ‘জাজ্বল্যমান উদাহরণ’ হিসাবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, প্রচলিত নিয়মে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তি অযোগ্য হলে পরের জন নির্বাচিত ঘোষিত হন। তবে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে এবং নির্বাচন কমিশন তা নিষ্পত্তি করবে। তিনি বলেন, ইলেকশন ট্রাইব্যুনাল সাধারণত গেজেট প্রকাশের ৪৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়; কিন্তু এ মামলায় আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তে গেজেট প্রকাশই স্থগিত ছিল। ফলে পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভালো সমাধান। এ আইনজীবী বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের আলোকে ফল প্রকাশিত হবে বলেই এতদিন ফল প্রকাশ স্থগিত ছিল, এখন নির্বাচন কমিশন কীভাবে গেজেট করবে, তা পূর্ণাঙ্গ রায় না আসা পর্যন্ত অজানা।

আদালতের রায় হাতে পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত-ইসি : বিশেষ প্রতিনিধি জানান, আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণার পর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আদালত যেভাবে নির্দেশ দেবেন, সেভাবেই ব্যবস্থা নেব। আদালত যদি নতুন করে নির্বাচন করতে বলেন, সেভাবেই হবে। অথবা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণার সিদ্ধান্ত দিতে বলেন, সেটাই হবে। রায় হাতে পেলে বলা যাবে কী নির্দেশনা আছে।

প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ : সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, রায় ঘোষণার পর তার নির্বাচনি এলাকা সীতাকুণ্ডে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিকালে সীতাকুণ্ডের ছোট দারোগাহাট এলাকায় তার অনুসারীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছে।

এ সময় মহাসড়কের পাশের গাছ কেটে সেগুলোর গুঁড়ি সড়কের ওপর ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করে। আবার পুরো গাছ কেটে রাখা হয়েছে সহাসড়কের ওপর। এ সময় মহাসড়কের বাড়বকুণ্ড বাজারে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন শত শত যাত্রী। দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। উভয়দিকে অন্তত ১০ কিলোমিটার এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। বারো আউলিয়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমএ হক যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ অবরোধকারীদের সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করেছে।