ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি ও ‘হাত-পা ভেঙে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন স্থানীয় বিএনপির নামে কিছু ব্যক্তি। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফিয়া আমীন পাপ্পা। ৩৬ সেকেন্ডের ওই ভিডিও বার্তাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রকাশ্য সতর্কবার্তা দেওয়ার ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করছেন স্থানীয়রা।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ইউএনও আফিয়া আমীন পাপ্পা তাঁর কার্যালয়ে ধারণ করা একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ভিডিও বার্তায় কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘প্রিয় গৌরীপুরবাসী, আপনাদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, সম্প্রতি একটি বিষয় লক্ষ করা গেছে—বিভিন্ন অফিস-আদালতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি, অপব্যবহার ও বলপ্রয়োগের মতো ঘটনা ঘটছে, যা দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১৮৮ ও ১৮৭ ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। সুতরাং উক্ত পরিস্থিতি যদি পুনরায় দেখা যায়, তাহলে উক্ত ধারা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ভিডিওটি পোস্ট করার পরপরই স্থানীয় ফেসবুক গ্রুপ ও আইডিগুলোতে দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। এই সতর্কবার্তার পেছনে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায় সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর স্থানীয় কিছু ব্যক্তির চড়াও হওয়ার ঘটনা। এ বিষয়ে ইউএনও আফিয়া আমীন পাপ্পা সাংবাদিকদের বলেন, ‘সম্প্রতি কয়েকটি সরকারি দপ্তরে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন তথ্য জানতে যান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁদের তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরামর্শ দিলে তাঁরা ক্ষুব্ধ হন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে কেউ কেউ কর্মকর্তাদের হাত-পা ভেঙে ফেলার হুমকিও দিয়ে চলে যান।’
ইউএনও আরও জানান, ঘটনার সময় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দ্রুত চলে যাওয়ায় কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে পারেননি। তবে সরকারি কর্মীদের নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই বার্তা দেওয়া হয়েছে। ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানামুখী প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়দের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, হুমকিদাতাদের পরিচয় প্রকাশ না করে কেন কেবল একটি সাধারণ সতর্কবার্তা দেওয়া হলো? প্রশাসনের এই রাখঢাক নীতির পেছনে কোনো রাজনৈতিক চাপ রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক সূত্র দাবি করেছে, ক্ষমতার পটপরিবর্তন বা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি দপ্তরগুলোতে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, কিছু সরকারি দপ্তরের সেবা ও কর্মকাণ্ড নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতেই ইউএনওকে এই প্রকাশ্য বার্তা দিতে হয়েছে। এদিকে ঘটনার পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া ব্যক্তিরা একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হাবিবুল ইসলাম খান শহীদ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘ইউএনও মহোদয় বিষয়টি আমাদের অবহিত করেছিলেন। আমরা জানতে পেরেছি যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে তাঁদের কয়েকজনকে চিহ্নিত করেছি এবং কঠোরভাবে সতর্ক করেছি। বিএনপি কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের কাজে বাধা দেওয়ার মতো আচরণকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেবে না।’








