একসময় যে পোশাককে ঘিরে ছিল বিতর্ক, নিষেধাজ্ঞা এবং সামাজিক সমালোচনা, আজ সেটিই বিশ্বজুড়ে সমুদ্রসৈকত, সুইমিং পুল এবং ফ্যাশন জগতের অন্যতম পরিচিত পোশাক। বলছি বিকিনির কথা।
ফ্যাশনের ইতিহাসে এমন খুব কম পোশাকই আছে, যা একদিকে যেমন স্বাধীনতা, আত্মবিশ্বাস ও আধুনিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে তেমনি বহু দশক ধরে বিতর্কেরও কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সময়ের সঙ্গে বিকিনির নকশা বদলেছে, বদলেছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও। তবে এই পোশাককে ঘিরে এমন অনেক চমকপ্রদ তথ্য রয়েছে, যা এখনো অনেকেরই অজানা। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিকিনি সম্পর্কে ১০টি অবাক করা তথ্য।
বিকিনির নাম এসেছে একটি ছোট দ্বীপ থেকে
অনেকেই মনে করেন, ‘বিকিনি’ শব্দটি হয়তো কোনো ফ্যাশন শব্দ। বাস্তবে এর উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৪৬ সালে ফরাসি ডিজাইনার লুই রেয়ার নতুন ধরনের দুই টুকরো সাঁতারের পোশাক বাজারে আনেন। তিনি এর নাম রাখেন বিকিনি, যা নেওয়া হয় প্রশান্ত মহাসাগরের বিকিনি অ্যাটল নামের একটি ছোট দ্বীপ থেকে। সেই সময় ওই দ্বীপে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চলছিল। রেয়ারের ধারণা ছিল, নতুন এই পোশাকও ঠিক ততটাই আলোড়ন তুলবে, আর সত্যিই তা-ই হয়েছিল।
আরও পড়ুন
বিকিনি বনাম সুইমস্যুট: পার্থক্য, ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা
প্রথম প্রদর্শনের জন্য পেশাদার মডেল রাজি হননি
আজকের দিনে বিকিনি পরা ফ্যাশন মডেলদের কাছে খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু ১৯৪৬ সালে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। সে সময় অনেক পেশাদার মডেল এই পোশাক পরে জনসমক্ষে আসতে অস্বীকৃতি জানান। শেষ পর্যন্ত ফরাসি নৃত্যশিল্পী মিশেলিন বার্নারদিনি বিকিনি পরে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এটি প্রদর্শন করেন। এই ঘটনাই বিকিনির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে আছে।
একসময় অনেক দেশে বিকিনি নিষিদ্ধ ছিল
আজকের জনপ্রিয় এই পোশাক একসময় বহু দেশে আইনগত বা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না।ইতালি, স্পেন, বেলজিয়ামসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে দীর্ঘদিন বিকিনি পরার ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ ছিল। অনেক সমুদ্রসৈকতে এটি নিষিদ্ধও করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করলে এসব নিষেধাজ্ঞাও ধীরে ধীরে উঠে যায়।
সিনেমাই বদলে দিয়েছিল বিকিনির জনপ্রিয়তা
হলিউডের বড় পর্দা বিকিনিকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ১৯৬২ সালে জেমস বন্ড সিরিজের ডক্টর নো ছবিতে অভিনেত্রী উরসুলা আন্দ্রেস সাদা বিকিনি পরে সমুদ্র থেকে উঠে আসার দৃশ্যটি সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম আইকনিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। এরপর থেকেই বিকিনি বিশ্বব্যাপী ফ্যাশনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন
সমুদ্রের নীল জলে নুসরাতের মোহময় বিকিনি লুক
বিকিনি শুধু একটি নয়, রয়েছে অসংখ্য ধরন
অনেকে ভাবেন বিকিনির একটি মাত্র নকশা রয়েছে। বাস্তবে বর্তমানে বাজারে পাওয়া যায়- ত্রিভুজ বিকিনি, ব্যান্ডো বিকিনি, স্ট্রিং বিকিনি, হাল্টার বিকিনি, উচ্চ কোমরযুক্ত বিকিনি, স্পোর্টস বিকিনি, ট্যাঙ্কিনি ও মনোকিনি। ব্যবহার, আরাম ও ফ্যাশনের চাহিদা অনুযায়ী এসব নকশা তৈরি হয়েছে।
প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে বিকিনি খুব একটা ব্যবহৃত হয় না
অনেকেই মনে করেন, যেহেতু এটি সাঁতারের পোশাক, তাই প্রতিযোগিতায়ও বিকিনি ব্যবহৃত হয়। বাস্তবে আন্তর্জাতিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় অধিকাংশ নারী সাঁতারু শরীরের সঙ্গে লেগে থাকা এক টুকরো সুইমস্যুট ব্যবহার করেন। কারণ এতে পানির প্রতিরোধ কম হয় এবং দ্রুত সাঁতার কাটা সহজ হয়।
বিকিনি এখন শুধু ফ্যাশনের নয়, ক্রীড়াজগতেরও অংশ
বিচ ভলিবল, বিচ হ্যান্ডবল কিংবা কিছু জলক্রীড়ায় দীর্ঘদিন ধরে বিকিনি-ধাঁচের পোশাক ব্যবহৃত হয়েছে।যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা খেলোয়াড়দের পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরও স্বাধীনতা দিয়েছে। এখন খেলোয়াড়েরা বিকিনি, শর্টস বা পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া পোশাক-নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী বেছে নিতে পারেন।
পরিবেশবান্ধব বিকিনিও তৈরি হচ্ছে
ফ্যাশন শিল্পে টেকসই উৎপাদনের গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিকিনির জগতেও এসেছে পরিবর্তন।বর্তমানে অনেক ব্র্যান্ড সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক বর্জ্য, পুনর্ব্যবহৃত নাইলন এবং পরিবেশবান্ধব তন্তু দিয়ে বিকিনি তৈরি করছে। এতে যেমন পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে, তেমনি ফ্যাশনও হচ্ছে আরও দায়িত্বশীল।
আরও পড়ুন
ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় আধুনিক অভিজাত্য, ম্রুণালের এলিগ্যান্ট লুক
বিকিনি আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়
অনেকের কাছে বিকিনি কেবল একটি পোশাক নয়; এটি নিজের শরীরকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার একটি প্রতীক। বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রচারণায় সব ধরনের শারীরিক গঠন, ত্বকের রং ও বয়সের নারীদের বিকিনি পরিহিত অবস্থায় উপস্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে শরীর নিয়ে অযথা লজ্জা বা সামাজিক চাপ কমানোর বার্তা দেওয়া হয়।
বিশ্বজুড়ে বিকিনি দিবসও পালন করা হয়
প্রতি বছর ৫ জুলাই আন্তর্জাতিকভাবে বিকিনি দিবস পালন করা হয়। ১৯৪৬ সালের এই দিনেই আধুনিক বিকিনি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে প্রদর্শিত হয়েছিল। সেই স্মরণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্যাশন ইভেন্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারণা এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিশেষ আয়োজন দেখা যায়। এই দিনটি বিকিনির ইতিহাস ও ফ্যাশন বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
আরও পড়ুন
জেনিফার লোপেজের তারুণ্য ধরে রাখার ৫ জাদুমন্ত্র
বিকিনিকে ঘিরে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা
- বিকিনি শুধুই তরুণীদের জন্য, এ ধারণা সঠিক নয়।
- সব বিকিনিই খুব বেশি খোলামেলা, এটিও ভুল। বর্তমানে ফুল-কভারেজ ও উচ্চ কোমরযুক্ত অনেক নকশা রয়েছে।
- বিকিনি শুধু ফ্যাশনের জন্য। আসলে এটি সাঁতার, রোদ পোহানো, জলক্রীড়া ও অবকাশযাপনের বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।
- সব সংস্কৃতিতে বিকিনি একইভাবে গ্রহণযোগ্য। বাস্তবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী এর গ্রহণযোগ্যতা ভিন্ন হতে পারে।
একটি ছোট্ট সাঁতারের পোশাক হয়েও বিকিনি গত আট দশকে ফ্যাশন, সংস্কৃতি, সিনেমা এবং সামাজিক আলোচনায় বিশাল প্রভাব ফেলেছে। বিতর্ক থেকে জনপ্রিয়তা, নিষেধাজ্ঞা থেকে বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্যতা-বিকিনির যাত্রা সত্যিই ব্যতিক্রমী।
জেএস/








