ফল নিয়ে গবেষণার ধারাবাহিকতায় নতুন সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। বিনা লেবুর অভাবনীয় সাফল্যের পর এবার তাদের নতুন উদ্ভাবন ‘বিনা সফেদা-১’। দেশে ফলের জাতের বৈচিত্র্য বাড়ানো ও কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক বিকল্প তৈরির লক্ষ্যেই এই জাত অবমুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

বিনা সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে বারি সফেদা-২ এর সায়নে গামা ইরাডিয়েশন প্রয়োগ করে ক্ষিরনীর চারার ওপর গ্রাফটিং করে সফল গ্রাফটগুলো থেকে MZD60P1 মিউট্যান্টটি নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। এই MZD60P, মিউট্যান্টটি কৌলিক সারি হিসেবে প্রজনন প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রোপণের মাধ্যমে ফলন পরীক্ষায় সন্তোষজনক হওয়ায় জাত হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ২০২৩ সালে বিনা সফেদা-১ নামে কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য নিবন্ধন করা হয়।

জাতটির উদ্ভাবন ও বিকাশে দায়িত্বরত বিনার উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শামছুল আলম বলেন, সফেদা বাংলাদেশে একটি স্বল্প পরিচিত কিন্তু খুবই সুস্বাদু ফল। অল্প যত্নেই এদেশে সফেদার চাষ সম্ভব। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট, প্রাকৃতিক সুগার, ভিটামিন সি ও এন্টিঅক্সিডেন্ট।

বিনার গবেষকদের নতুন সাফল্য ‘বিনা সফেদা-১’

তিনি আরও বলেন, বিনা সফেদা-১ আকারে দেশি জাতের তুলনায় বেশ বড়। একটি ফলের ওজন ২৫০ থেকে ৪৫০ গ্রাম। এতে ভিটামিন সি এর পরিমাণ প্রতি ১০০ গ্রামে ১৫ দশমিক ৫৮ মিলিগ্রাম। উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে এ জাতের ফলন ২৫ থেকে ৪০ কেজি প্রতি হেক্টরে পাওয়া যাবে।

সফেদা চাষের উপযুক্ত আবহাওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, সাধারণত উষ্ণ ও শুষ্ক জলবায়ু সফেদা চাষের জন্য সর্বোত্তম। তবে তুলনামূলকভাবে সফেদার পরিবেশিক উপযোগিতা ব্যাপক, বিধায় আর্দ্র ও ঠান্ডা আবহাওয়াতেও সফলভাবে চাষ করা সম্ভব, যেখানে তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মাঝে ওঠানামা করে। তবে ফুল আসার সময় আর্দ্র জলবায়ু সফেদার জন্য বেশি উপযোগী। বারোমাসি জাত হওয়ায় পুরো বছর জুড়েই আবাদের উপযোগী।

বিনার গবেষকদের নতুন সাফল্য ‘বিনা সফেদা-১’

মাটির গুণগত মান সম্পর্কে তিনি বলেন, এ ফলের জন্য পানি সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা, মধ্যম অম্ল-ক্ষারত্ব সম্পন্ন উর্বর দো-আঁশ মাটি উত্তম। তবে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় পাহাড়ি ও সমতল উভয় এলাকায় সব ধরনের মাটিতেই বাণিজ্যিকভাবে সফেদার চাষ করা সম্ভব।

সফেদার চারা তৈরির ব্যাপারে তিনি বলেন, এ ফলে অঙ্গজ বংশ বিস্তার বর্তমানে বহুল প্রচলিত। এই পদ্ধতিতে উৎপন্ন চারা গাছে ১৮ মাসের মধ্যে ফল ধরে।

বিনার গবেষকদের নতুন সাফল্য ‘বিনা সফেদা-১’

পোকা মাকড়ের আক্রমণ ও রোগ বালাইয়ের প্রতি সংবেদনশীলতার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিনা সফেদা-১ জাতটিতে রোগের আক্রমণ অন্যান্য জাতের তুলনায় অনেক কম। তবে আগামরা, স্যুটিমোল্ড রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে গাছে বছরে দুইবার কপার সমৃদ্ধ ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিনা সফেদা-১ গাছে প্রায়ই মাজরা পোকা, পাতা ছিদ্রকারী পোকা, জাবপোকার আক্রমণ দেখা যায়। সেক্ষেত্রে ডিম ও কীড়াযুক্ত পাতা সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।

বিনার উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. মোহাম্মদ নুরুন-নবী মজুমদার বলেন, ২০১১ সালে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের যাত্রা শুরু করার পর থেকে খুব অল্প সময়েই আমরা উল্লেখযোগ্য কিছু জাত উদ্ভাবন করতে পেরেছি। সম্প্রতি আমাদের উদ্ভাবিত বিনা লেবু-১ ও বিনা লেবু-২ কৃষক ও ভোক্তাদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আমরা দেশি বিদেশি উভয় জাত নিয়েই কাজ করছি এবং আমাদের বিশ্বাস বিনা লেবুর মতো বিনা সফেদাও সবার মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলবে।

এফএ/জেআইএম