‘আমাদের সভ্যতার অবনতি শুরু হইয়াছিল আঠারো শতকে যখন, গোঁড়ামির কবলে পড়িয়া, আমরা আলোকপাত আর বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের যুগটা এক লাফে এড়াইয়াছিলাম। বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে ইহার পতন ঘটিল।’
-একবাল আহমদ (‘একশ ঘন্টার যুদ্ধ’, দৈনিক ডন, করাচি, ১৭ মার্চ ১৯৯১)
অসাম্য, অমর্যাদা, আর অবিচারের বিরুদ্ধে শত বছরের শোরগোল করিবার পরও আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা আর এশিয়ার অনেক দেশের ন্যায় বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তান প্রভৃতি দেশ আজ পর্যন্ত নিজ নিজ দেশে সকল শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা আর সকল নাগরিকের অক্ষর-পরিচয় নিশ্চিত করিতে পারে নাই। শোনা গিয়াছে, এ বছর আঠারো কোটি লোকের বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এগারো লাখের মতন। আপনারা ইহাতেই অনুমান করিবেন এদেশে এখন শতকরা দশজনের কম ছাত্র-ছাত্রী প্রাথমিক ও বুনিয়াদী অর্থাৎ উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে, এই সত্য সকলেই জানেন, অথচ ভাবখানা যেন তাহাতে কি আসে যায়! যে কয়জন বা উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে তাহাদের সকলের গতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে নহে। যাহারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বা সমপর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করিতে পারে, তাঁহারা ভাগ্যবান বলিয়া গণ্য হয়। অক্ষর-পরিচয়কে শিক্ষার মাপকাঠি ধরিয়াও আমাদের মুখ লুকাইবার জায়গা নাই।
আজ হইতে নব্বই বছর আগে, ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, কলিকাতা বেতারকেন্দ্র হইতে প্রচারিত ‘শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণ’ নামক ভাষণে জীবনের উপান্তে উপনীত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোটাদাগে এই কথাটাই বলিয়াছিলেন। তিনি দুঃখপ্রকাশ করিয়াছিলেন, ‘আধুনিক কালে বর্বর দেশের সীমানার বাইরে ভারতবর্ষই একমাত্র দেশ, যেখানে শতকরা আট-দশ জনের মাত্র অক্ষর-পরিচয় আছে।’ অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, আমাদের এইসব দুর্ভাগা দেশে জনশিক্ষার সংকট এখনও কাটে নাই। পরাধীনতার অবসান সত্ত্বেও একটা চিরস্থায়ী সংকট কায়েম রহিয়াছে। স্বীকার করিয়া বলি, কথাটা আত্মবিরোধী শোনাইতেছে, কিন্তু দুই পয়সারও অসত্য নহে।
১৯৩২ সালের ডিসেম্বর আর ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রামতনু লাহিড়ী অধ্যাপক’ পদে সদ্যবৃত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গোটা দুই বক্তৃতা দিয়াছিলেন, পর্যায়ক্রমে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ’ আর ‘শিক্ষার বিকিরণ’ নামে। প্রথম বক্তৃতায় তিনি বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কেন সার্থক হয় নাই, তাহার উৎসনির্দেশ করিয়াছিলেন। আর দ্বিতীয় বক্তৃতায় সর্বসাধারণের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ব্যাপক করার পথ অনুসন্ধান করিয়া একটি প্রস্তাব পেশ করিয়াছিলেন। জনশিক্ষার পথ প্রশস্ত করিবার জন্য তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটা সহজ ব্যবস্থা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়াছিলেন। এই প্রস্তাব লইয়া আলোচনার সুযোগ আমরা পরের কোন কিস্তির জন্য জমা রাখিতেছি। আজিকার এই লেখায় স্থির করিয়াছি বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ লইয়া ঠাকুর যাহা বাতলাইয়াছিলেন তাহার কিছুমাত্র স্মরণ করিব।
তিনি বলিয়াছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় সচরাচর দুই রূপের হইয়া থাকে। একটা রূপকে যদি বলি স্বাভাবিক বিশ্ববিদ্যালয়, অন্যটার নাম রাখিতে হয় অস্বাভাবিক। একটা স্বভাবজাত, অন্যটি অভাবজাত। এই কথাগুলি আমাদের হাপরে তৈরি হইলেও ভাবগুলি রবীন্দ্রনাথের।
এক জায়গায় তিনি লিখিয়াছেন : ‘বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশেষ সাধনার ক্ষেত্র। সাধারণভাবে বলা চলে, সে সাধনা বিদ্যার সাধনা। কিন্তু তা বললে কথাটা সুনির্দিষ্ট হয় না; কেননা বিদ্যা শব্দের অর্থ ব্যাপক এবং তার সাধনা বহুবিচিত্র।’-এই স্থায়ী কথাটার পর ঠাকুর যোগ করিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি হইয়াছিল ‘বিশেষ দেশ, বিশেষ জাতি যে বিদ্যার সম্বন্ধে বিশেষ প্রীতি গৌরব ও দায়িত্ব অনুভব করেছে, তাকেই রক্ষা ও প্রচারের জন্য।’ তিনি বিশদ করিলেন ‘যে ইচ্ছা সকল সৃষ্টির মূলে, সমস্ত দেশের সেই ইচ্ছাশক্তির থেকেই তার উদ্ভব। এই ইচ্ছার মূলে থাকে শক্তির ঐশ্বর্য। সেই ঐশ্বর্য দাক্ষিণ্য দ্বারা নিজেকে স্বতই প্রকাশ করতে চায়; তাকে নিবারণ করা যায় না।’ আমরা এই ইচ্ছার ফলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি, তাহাকে বলিতেছি স্বাভাবিক বা স্বভাবজাত বিশ্ববিদ্যালয়। ইহার বিপরীত মেরুতে আছে অভাবজাত বা অস্বাভাবিক বিশ্ববিদ্যালয়। আঠারো শতকে আমাদের দেশে যখন সভ্যতা অধোগতির পথে আগাইয়া চলিল, তাহার কিছু পরে এদেশের স্থানে স্থানে এয়ুরোপের রূপশালী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ছোট শাখা স্থাপন করা হইল। এইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপটা অভাবজাত, বা আস্বাভাবিক।
অস্বাভাবিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার গোড়ার গলদটা রবীন্দ্রনাথ ঠিক ধরিয়াছিলেন : ‘তার নামকরণ, তার রূপকরণ, এ দেশের সঙ্গে সঙ্গত নয়; এদেশের আবহাওয়ায় তার স্বভাবীকরণও ঘটেনি।’
তিনি অধিক গিয়াছিলেন : ‘বলা বাহুল্য, য়ুরোপীয় ভাষায় যাকে য়ুনিভার্সিটি বলে প্রধানত তার উদ্ভব য়ুরোপে। অর্থাৎ য়ুনিভার্সিটির যে চেহারার সঙ্গে আমাদের আধুনিক পরিচয় এবং যার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষিতসমাজের ব্যবহার সেটা সমূলে ও শাখা-প্রশাখায় বিলিতি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের যে রূপ ভারতবর্ষের ইতিহাসে গড়িয়া উঠিয়াছিল, তাহার সহিত এই বিলিতি য়ুনিভার্সিটির প্রভেদটা, রবীন্দ্রনাথের মতে, নিছক ‘কুলগত’ নয়, একান্তই ‘প্রকৃতিগত’ : ‘আমাদের দেশের অনেক ফলের গাছকে আমরা বিলিতি বিশেষণ দিয়ে থাকি, কিন্তু দিশি গাছের তাদের কুলগত প্রভেদ থাকলেও প্রকৃতিগত ভেদ নেই। আজ পর্যন্ত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে সে কথা সম্পূর্ণ বলা চলবে না।’
এই উপলক্ষে তিনি প্রথমে এয়ুরোপ মহাদেশে প্রতিষ্ঠিত আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিত ভারতবর্ষের পুরানাদিনের, উপনিষদ আর বৌদ্ধযুগের বিদ্যায়তনগুলির তুলনা কাটিলেন। ঐ বিদ্যায়তনগুলি ছিল যাহাকে আমরা বলিতেছি স্বাভাবিক তাহারই অনুরূপ, রবীন্দ্রনাথের কথায়, ঐগুলি ছিল ‘লোকশিক্ষার অবাধ জলসেকপ্রণালী,’ বা মূল প্রস্রবণ যাহা হইতে সমাজের সকল স্তরে শিক্ষার ধারা নিরন্তর প্রবাহিত হইত। ঠাকুর লিখিয়াছিলেন : ‘নালন্দা বিক্রমশিলা তক্ষশিলার বিদ্যায়তন কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার নিশ্চিত কালনির্ণয় এখনো হয়নি, কিন্তু ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, য়ুরোপীয় য়ুনিভার্সিটির পূর্বেই তাদের আবির্ভাব। তাদের উদ্ভব ভারতীয় চিত্তের আন্তরিক প্রেরণায়, স্বভাবের অনিবার্য আবেগে। তার পূর্ববর্তীকালে বিদ্যার সাধনা ও শিক্ষা বিচিত্র আকারে ও বিবিধ প্রণালীতে দেশে নানা স্থানে ব্যাপ্ত হয়েছিল, এ কথা সুনিশ্চিত। সমাজের সেই সর্বত্রপরিকীর্ণ সাধনাই পুঞ্জীভূত কেন্দ্রীভূত রূপে এক সময়ে স্থানে স্থানে দেখা দিল।’
রবীন্দ্রনাথের বিচারে, ‘সেই যুগের মধ্যে তপস্যা ছিল; তার কারণ, ভান্ডারপূরণ তার লক্ষ্য ছিল না; তার উদ্দেশ্য ছিল সর্বজনীন চিত্তের উদ্দীপন, উদ্বোধন, চারিত্রসৃষ্টি। পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বের যে আদর্শ জ্ঞানে-কর্মে হৃদয়ভাবে ভারতের মনে উদ্ভাসিত হয়েছিল, এই উদ্যোগ তাকেই সঞ্চারিত করতে চেয়েছিল চিরদিনের জন্য সর্বসাধারণের জীবনের মধ্যে, তার আর্থিক ও পারমার্থিক সদগতির দিকে, কেবলমাত্র তার বুদ্ধিতে নয়।’
শুদ্ধমাত্র বিদ্যার সঞ্চয়ে নয়, বিদ্যার গৌরবে প্রতিষ্ঠিত ছিল এই বিদ্যালয়গুলি। তাহাদের যশ সেদিন সারা দুনিয়ার আনাচে-কানাচে পৌঁছিয়াছিল। এখানে যাঁহারা বিদ্যাদান করিতেন, তাঁহারা দশ ও দেশের শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন, আর জ্ঞানপিপাসায় কাতর বিদেশি ছাত্রেরা সমুদ্র পর্বত পার হইয়া, প্রাণপণ কঠিন দুঃখস্বীকার করিয়া, তাঁহাদের কাছে আসিতেন, রচনা করিতেন একেকটি বিদ্যার ঐক্যবদ্ধ ক্ষেত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়াছিলেন : ‘নানা প্রকৃতির মন এখানে এক জায়গায় সমবেত হত; তারা একজাতীয় নয়, একদেশীয় নয়। এক লক্ষ্য দৃঢ় রেখে এক জীবিকাব্যবস্থায় তারা পরস্পরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ঐক্য লাভ করেছিল।’
তিনি আরও যোগ করিতে কসুর করেন নাই : ‘ভগবান বুদ্ধ একদিন যে ধর্ম প্রচার করেছিলেন সে ধর্ম তার নানা তত্ত্ব, নানা অনুশাসন, তার সাধনার নানা প্রণালী নিয়ে সাধারণচিত্তের আন্তর্ভৌম স্তরে প্রবেশ ক’রে ব্যাপ্ত হয়েছিল। তখন দেশ প্রবলভাবে কামনা করেছিল এই বহুশাখায়িত পরিব্যাপ্ত ধারাকে কোনো কোনো সুনির্দিষ্ট কেন্দ্রস্থলে উৎসরূপে উৎসারিত ক’রে দিতে সর্বসাধারণের স্নানের জন্য, পানের জন্য, কল্যাণের জন্য।’
অনস্বীকার্য, জনসাধারণের ইচ্ছাই শেষ কথা। রবীন্দ্রনাথের বিচারে সর্বসাধারণের ইচ্ছাই ছিল ভারতের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রাণ : ‘এই ইচ্ছা যে কিরকম সত্য ছিল, কিরকম উদার, কিরকম বেগবান ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় এই অনুষ্ঠানের মধ্যেই, এর অকৃপণ ঐশ্বর্যে। বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ বিস্ময়োচ্ছ্বসিত ভাষায় এই বিদ্যানিকেতনের বর্ণনা করেছেন। তাঁর লেখনীচিত্রে দেখতে পাই এর অলংকরণরেখায়িত শুক্তিরক্ত স্তম্ভশ্রেণী, এর অভ্রভেদী হর্ম্যশিখর, ধূপসুগন্ধি মন্দির, ছায়ানিবিড় আম্রবন, নীলপদ্মে-প্রফুল্ল গভীর সরোবর। তিনটি বড়ো বড়ো বাড়িতে এখানকার গ্রন্থাগার ছিল; তাদের নাম রত্নসাগর, রত্নোদধি, রত্নরঞ্জক। রত্নোদধি নয়তলা; সেইখানে প্রজ্ঞাপারমিতাসূত্র এবং অন্যান্য শাস্ত্রগ্রন্থ রক্ষিত ছিল। বহু রাজা পরে পরে এই সংঘের বিস্তারসাধন করেছেন। চারি দিকে উন্নত চৈত্য উঠেছে, সেই চৈত্যগুলির মধ্যে মধ্যে শিক্ষাভবন, তর্কসভাগৃহ, প্রত্যেক সরোবরের চারি দিকে বেদী ও মন্দির; স্থানে স্থানে শিক্ষক ও প্রচারকদের জন্যে চারতলা বাসস্থান।’ ইহাকেই বলি স্বভাবজাত বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ।
রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করিয়াছিলেন এয়ুরোপের ইতিহাসের ঘটনাও একই। সেখানেও আদি বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ ছিল সর্বজনীনতার ভিত্তির উপর দাঁড় করানো অর্থাৎ স্বাভাবিক। সেখানেও খ্রিস্টধর্মের আবাহনকালে যাহা ছিল ‘ভক্তির পরীক্ষা’ বা ‘পূজার বিষয়’, তাহা কালক্রমে ‘বিদ্যার বিষয়’ হইয়া উঠিয়াছিল। রবীন্দ্রনাথ যদিচ করিবার ফুরসত পান নাই, তবু সত্যের খাতিরে স্বীকার করিতে হইবে, এয়ুরোপে বিশ্ববিদ্যালয় দেখা দিবার ঢের আগে পৃথিবীর যে সকল এলাকায় ইসলামি সভ্যতার ছায়া পড়িয়াছিল, সেইসব এলাকায় যে ধরনের উচ্চ-আঙ্গিক বিদ্যা বিস্তার করা হইত, তাহার চিত্ররূপও অভিন্ন ছিল। সেখানেও জনসাধারণের ইচ্ছাই ছিল শেষ বিচারক। সুতরাং সেগুলিকেও অস্বাভাবিক বিদ্যায়তন বলা যাইবে না, বলিতে হইবে স্বাভাবিক।
সে যুগের সকল দেশের বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রধান বিদ্যার বিষয় ছিল তর্কশাস্ত্র। এইস্থলে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য বিশেষ মনোযোগ দাবি করে : ‘য়ুরোপের মধ্যযুগে সেই তর্কের যুক্তিজাল যে কিরকম সূক্ষ্ম ও জটিল হয়ে উঠেছিল, তা সকলেরই জানা আছে। শাস্ত্রজ্ঞানের বিশুদ্ধতার জন্য এই ন্যায়শাস্ত্র। সমাজরক্ষার জন্য আর দুটি বিদ্যার বিশেষ প্রয়োজন, আইন এবং চিকিৎসা। তখনকার য়ুরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় এই কয়টি বিদ্যাকেই প্রধানত গ্রহণ করেছিল। নালন্দাতে বিশেষভাবে শিক্ষার বিষয় ছিল হেতুবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, শব্দবিদ্যা। তার সঙ্গে ছিল তন্ত্র।’
আধুনিক কালের উষালগ্নে এয়ুরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইটি ব্যয় বা পরিবর্তন বিশেষ দ্রষ্টব্য। পয়লা পরিবর্তন ধর্মশাস্ত্রের জায়গায় অর্থশাস্ত্রের অধিষ্ঠান। রবীন্দ্রনাথ লিখিলেন, ‘ধর্মশাস্ত্রের প্রতি সেখানকার মনুষ্যত্বের ঐকান্তিক যে নির্ভর ছিল, সেটা ক্রমে ক্রমে শিথিল হয়ে এল। একদিন সেখানে মানুষের জ্ঞানের ক্ষেত্রের প্রায় সমস্তটা ধর্মশাস্ত্রের সম্পূর্ণঅন্তর্গত না হোক, অন্তত শাসনগত ছিল। লড়াই করতে করতে অবশেষে সেই অধিকারের কর্তৃত্বভার তার হাত থেকে স্খলিত হয়েছে। বিজ্ঞানের সঙ্গে যখানে শাস্ত্রবাক্যের বিরোধ, সেখানে শাস্ত্র আজ পরাভূত, বিজ্ঞান আজ আপন স্বতন্ত্র বেদীতে একেশ্বররূপে প্রতিষ্ঠিত। ভূগোল, ইতিহাস প্রভৃতি মানুষের অন্যান্য শিক্ষণীয় বিষয় বৈজ্ঞানিক যুক্তিপদ্ধতির অনুগত হয়ে ধর্মশাস্ত্রের বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়েছে।’ সম্ভবত এই ঘটনার নামই একবাল আহমদ প্রমুখ বুদ্ধিমান রাখিতেছেন এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকপাতের যুগ।
দ্বিতীয় এবং আরো বড় যে পরিবর্তনটি ঘটিয়াছিল তাহা শিক্ষাদানের ভাষার ক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথের চোখ সেখানেই পড়িয়াছিল। তিনি জানেন : ‘একদিন লাটিন ভাষাই ছিল সমস্ত য়ুরোপের শিক্ষার ভাষা, বিদ্যার আধার। তার সুবিধা ছিল এই, সকল দেশের ছাত্রই এক পরিবর্তনহীন সাধারণভাষার যোগে শিক্ষালাভ করতে পারত। কিন্তু তার প্রধান ক্ষতি ছিল এই যে, [বিদ্যার] আলোক পাণ্ডিত্যের ভিত্তিসীমা এড়িয়ে বাইরে অতি অল্পই পৌঁছত। যখন থেকে য়ুরোপের প্রত্যেক জাতিই আপন আপন ভাষাকে শিক্ষার বাহনরূপে স্বীকার করলে, তখন শিক্ষা ব্যাপ্ত হল সর্বসাধারণের মধ্যে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় সমস্ত দেশের চিত্তের সঙ্গে অন্তরঙ্গরূপে যুক্ত হল।’
রবীন্দ্রনাথ আরো লিখিয়াছিলেন, ‘শুনতে কথাটা স্বতোবিরুদ্ধ, কিন্তু সেই ভাষাস্বাতন্ত্র্যের সময় থেকেই সমস্ত য়ুরোপে বিদ্যার যথার্থ সমবায়সাধন হয়েছে। এই স্বাতন্ত্র্য য়ুরোপের চিৎপ্রকর্ষকে খণ্ডিত না ক’রে আশ্চর্যরূপে সম্মিলিত করেছে। য়ুরোপে এই স্বদেশী ভাষায় বিদ্যার মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে তার জ্ঞানের ঐশ্বর্য বেড়ে উঠল, ব্যাপ্ত হল সমস্ত প্রজার মধ্যে, যুক্ত হল প্রতিবেশী ও দূরবাসীদের জ্ঞানসাধনার সঙ্গে, স্বতন্ত্র ক্ষেত্রের সমস্ত শস্য সংগৃহীত হল য়ুরোপের সাধারণ ভাণ্ডারে। এখন সেখানে য়ুনিভার্সিটি যেমন-উদারভাবে সকল দেশের তেমনি একান্তভাবে আপন দেশের। এইটিই হচ্ছে মানুষের প্রকৃতির অনুগত।’
এই ভাষাবিপ্লবকেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বভাবজাত বা স্বাভাবিক রূপ বলিয়া ধরিয়া লইয়াছি। একবাল আহমদের ভাষায় ইহাই ‘বৈজ্ঞানিক বিপ্লব’ যাহার টিকিটিও আমরা ধরিতে পারি নাই।
পরাধীন ভারতে স্থাপিত বিলিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্বাভাবিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভেদটা প্রকৃত প্রস্তাবে বিভেদেই পরিণত হইয়াছিল। ঠাকুরের অনুযোগ : ‘আমাদের দেশে য়ুনিভার্সিটির পত্তন হল বাহিরের দানের থেকে। সে দানে দাক্ষিণ্য অধিক নেই। তার রাজানুচিত কৃপণতা থেকে আজ পর্যন্ত দুঃখ পাচ্ছি। ইংরেজের দেশে রাজদ্বারে যে অতিথিশালা খোলা আছে লন্ডন য়ুনিভার্সিটিতে, এ দেশের দরিদ্রপাড়ায় তারই একটা ছোটো শাখা স্থাপন হল। ভারতীয় বিদ্যা বলে কোনো-একটা পদার্থ কোথাও যে আছে এই বিদ্যালয়ে গোড়াতেই তাকে অস্বীকার করা হয়েছে। এর স্বভাবটা পৃথিবীর সকল য়ুনিভার্সিটির একেবারে বিপরীত। এর দানের বিভাগ অবরুদ্ধ, কেবল গ্রহণের বিভাগ আপন ক্ষুধার্ত কবল উদঘাটিত করে আছে। তাতে গ্রহণের কাজও ঠিকমতো ঘটে না। কেননা, যেখানে দেওয়া-নেওয়ার চলাচল নেই সেখানে পাওয়াটাই থাকে অসম্পূর্ণ।’
পরাধীন ভারতবর্ষে স্থাপিত এয়ুরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির দেশের ভাষায় শিক্ষার বন্দোবস্ত করে নাই বলিয়াম তাহাদের সহিত দেশের মনের সম্মিলন ঘটিতে পারে নাই। এই প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের অন্তর্দৃষ্টি অপরাজিতা : ‘তা ছাড়া য়ুরোপীয় বিদ্যাও এখানে বদ্ধজলের মতো, তার চলৎ রূপ আমরা দেখতে পাই নে। যে-সকল প্রবীণ মত আসন্ন পরিবর্তনের মুখে, আমাদের সম্মুখে তারা স্থির থাকে ধ্রুবসিদ্ধান্তরূপে। সনাতনমুগ্ধ আমাদের মন তাদের ফুলচন্দন দিয়ে পূজা করে থাকে। য়ুরোপীয় বিদ্যাকে আমরা স্থাবরভাবে পাই এবং তার থেকে বাক্য চয়ন করে আবৃত্তি করাকেই আধুনিক রীতির বৈদগ্ধ্য বলে জানি, এই কারণে তার সম্বন্ধে নূতন চিন্তার সাহস আমাদের থাকে না। দেশের জনসাধারণের সমস্ত দুরূহ প্রশ্ন, গুরুতর প্রয়োজন, কঠোর বেদনা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন।’
ভারতে বিলিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ নিতান্ত অভাবজাত। কিন্তু অপরাধীন জাপানে তাহা স্বাভাবিকের পথ ধরিতে পারিয়াছিল। রবীন্দ্রনাথ লিখিতেছিলেন : ‘জাপান যখন স্পষ্ট বুঝলে যে, আধুনিক য়ুরোপ আজ যে বিদ্যার প্রভাবে বিশ্ববিজয়ী, তাকে আয়ত্ত করতে না পারলে সকল দিকেই পরাভাব সুনিশ্চিত, তখন জাপান প্রাণপণ আকাঙ্ক্ষার বেগে আপন সদ্যপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই য়ুরোপীয় বিদ্যার পীঠস্থান রচনা করলে।’
অধিক কি! জাপান নতুন বিদ্যাকে সত্য করিয়া তুলিবার ইচ্ছা প্রমাণ করিল স্বদেশীয় ভাষার মধ্যস্থতায় এয়ুরোপের বিদ্যা আত্মস্থ করার সাহসে। ঠাকুরের কথায় : ‘সর্বজনের ভাষার ভিতর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে সর্বজনের ক’রে তুললে; শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মধ্যে চিত্তপ্রসারের পথ অবাধ হয়ে উঠল। তাই আজ সেখানে বুদ্ধির জ্যোতি অবারিতভাবে দীপ্যমান।’
আর বাংলাদেশে? এই প্রশ্নের উত্তরে আবারও রবীন্দ্রনাথের সাক্ষ্য হাজির করি, যিনি সাক্ষ্য দিতেছেন : ‘আমাদের দেশে মাতৃভাষায় একদা যখন শিক্ষার আসন প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রস্তাব ওঠে, তখন অধিকাংশ ইংরেজি-জানা বিদ্বান আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন। সমস্ত দেশের সামান্য যে-কয়জন লোক ইংরেজি ভাষাটাকে কোনোমতে ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে, তাদের ভাগে উক্ত ভাষার অধিকারে পাছে লেশমাত্র কমতি ঘটে এই ছিল তাদের ভয়।’
এই বলিয়াই চিৎকার করিয়া উঠিলেন তিনি : ‘হায় রে, দরিদ্রের আকাঙ্ক্ষাও দরিদ্র!’
৯ জুলাই ২০২৬
সলিমুল্লাহ খান : অধ্যাপক, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
(লেখকের বানান ও ভাষারীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)








