নাঈমুল মাসুম
কিছু সংবাদ পড়া শেষ হয়, কিন্তু তার অভিঘাত শেষ হয় না। কয়েক মাস আগে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি মুহাম্মদ ইদ্রিসের জীবনসংগ্রামের কথা পড়ে আমারও ঠিক তেমন অনুভূতি হয়েছিল। সংবাদটি পড়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে একটি প্রশ্ন আমাকে তাড়া করেছে, একজন মানুষের অপরাধ কী হতে পারে? তার সততা? তার শ্রম? তার মেধা? নাকি কেবল তার গায়ের রং?
প্রশ্নটি নতুন নয়। ইতিহাসের পাতায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে লাখ লাখ মানুষ অপমান, নির্বাসন, কারাবাস, এমনকি মৃত্যুকেও বরণ করেছেন। পৃথিবী বদলেছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে, প্রযুক্তি বিস্ময় সৃষ্টি করেছে; কিন্তু মানুষের চামড়ার রং নিয়ে অহংকার কিংবা ঘৃণার রাজনীতি পুরোপুরি শেষ হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে তার রূপ পাল্টেছে। কোথাও রাষ্ট্রের আইনে, কোথাও অভিবাসন নীতিতে, কোথাও কর্মক্ষেত্রে, আবার কোথাও ফুটবল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে, সেই পুরোনো বিদ্বেষ নতুন মুখোশ পরে ফিরে আসে।
আরও পড়ুন
শুক্রবার দিন ১৩ তারিখ হলে কেন ফ্রান্সের মানুষ আতঙ্কে থাকেন
বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে কোনো খেলোয়াড় তার গায়ের রঙে নয় বরং দক্ষতা দিয়ে পরিচিতি পাচ্ছেন, প্রশংসায় ভাসছেন। এখানে বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়রা রয়েছেন, যাদের ত্বকের রং ভিন্ন, কিন্তু সেখানে বর্ণবাদের সুযোগ নেই। তবে এই আসর আবারো মনে করিয়ে দেয় ত্বকের রঙের জন্য কত মানুষকে অত্যাচার, অপমান সইতে হয়েছে।
বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম নেওয়া মুহাম্মদ ইদ্রিস ও সেই বৈষম্যের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান অধ্যয়নের পর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। স্বপ্ন ছিল জ্ঞান অর্জনের, নিজের জীবন গড়ার। কিন্তু অচিরেই তিনি বুঝতে পারলেন, বিদেশের মাটিতে সবার জন্য সুযোগের দরজা সমানভাবে খোলা থাকে না।
বিবাহবিচ্ছেদের পর যুক্তরাজ্যে তার বসবাসের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তাকে দেশছাড়া করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অথচ তিনি কোনো অপরাধ করেননি। সৎভাবে কাজ করেছেন, আইন মেনেছেন, সমাজের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে জীবনযাপন করেছেন। তারপরও তাকে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, কেন আমি?
এই প্রশ্নের উত্তর তিনি প্রশাসনের কাছ থেকে পাননি। উত্তর খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের অভিজ্ঞতায়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সেই অদৃশ্য দেয়ালের নাম বর্ণবাদ। একজন মানুষের পরিচয়কে তার চরিত্র, শিক্ষা বা কর্ম দিয়ে নয়; বরং ত্বকের রং দিয়ে বিচার করার যে মানসিকতা, সেটিই তাকে অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।
কিন্তু ইদ্রিস ভেঙে পড়েননি। তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। তার পাশে দাঁড়িয়েছিল ট্রেড ইউনিয়ন, মানবাধিকারকর্মী, সহকর্মী এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ। তিন বছরব্যাপী আন্দোলনের পর আদালত তার পক্ষে রায় দেন। সরকারও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এটি কেবল একজন অভিবাসীর আইনি বিজয় ছিল না; এটি ছিল ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের বিজয়।
আরও পড়ুন
ঢাকার লোকাল বাসে ব্যতিক্রমী এক ড্রাইভার-হেলপার জুটি
জয়ের পর অনেকেই নিজের জীবন নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মুহাম্মদ ইদ্রিস সেই পথ বেছে নেননি। তিনি বুঝেছিলেন, তার মতো আরও বহু মানুষ একই অবিচারের শিকার হচ্ছেন। তাই তিনি নির্বাসন বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন, অভিবাসীদের আইনি সহায়তা দিতে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন এবং প্রায় তিন দশক ধরে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। নিজের ক্ষতকে তিনি প্রতিশোধের অস্ত্রে নয়, মানবসেবার শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন। এখানেই তাঁর সংগ্রামের প্রকৃত মহত্ত্ব।
মুহাম্মদ ইদ্রিসের ঘটনাটি আমাদের আরেকটি সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বর্ণবাদ সব সময় কাঁটাতারের বেড়া বা বৈষম্যমূলক আইনের আকারে আসে না। অনেক সময় এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ভেতরে লুকিয়ে থাকে। একটি চাকরির সাক্ষাৎকারে, একটি বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময়, বিমানবন্দরের দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে কিংবা বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে,অসংখ্য ছোট ছোট আচরণের মধ্যেও বর্ণবাদ নীরবে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। তাই বর্ণবাদকে শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় মনে করলে ভুল হবে; এটি আজও নানা রূপে বেঁচে আছে।
এই বাস্তবতারই আরেকটি মুখ আমরা দেখি বিশ্ব ফুটবলের আলোচিত তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জীবনে। কোটি মানুষের ভালোবাসা, অসাধারণ প্রতিভা এবং বিশ্ব সেরা ক্লাবের জার্সি,এসবের কোনোটিই তাকে বর্ণবাদী বিদ্রুপ থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ইউরোপের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে তাকে উদ্দেশ্য, করে বানরের ডাক, বর্ণবাদী স্লোগান কিংবা অবমাননাকর মন্তব্য উচ্চারিত হয়েছে। প্রতিবারই তিনি প্রশ্ন তুলেছেন একবিংশ শতাব্দীতে এসে একজন খেলোয়াড়কে কেন এখনো তার গায়ের রঙের জন্য অপমানিত হতে হবে?
ভিনিসিয়ুসের প্রতিবাদ শুধু নিজের সম্মানের জন্য নয়; তিনি বারবার বলেছেন, নীরবতা বর্ণবাদকে আরও শক্তিশালী করে। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা অপরিহার্য। তার এই অবস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিবাদ কখনো কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়; অনেক সময় একজনের কণ্ঠস্বর হাজারো মানুষের সাহস হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন
আর্জেন্টিনার জার্সির পেছনে ‘১৮৯৩’ লেখার কারণ জানেন?
এই কথাই বহু আগে অন্য এক ভাষায় বলেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম ছিল মানুষের জন্মগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সাতাশ বছরের কারাজীবন তাকে ভেঙে দিতে পারেনি। কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি প্রতিশোধের আহ্বান জানাননি; বরং ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং পুনর্মিলনের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তার এই সিদ্ধান্ত ইতিহাসকে বিস্মিত করেছিল। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, ঘৃণার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে না।
ম্যান্ডেলার একটি বিখ্যাত উপলব্ধি আজও সমান প্রাসঙ্গিক, মানুষ ঘৃণা করতে শিখে, তাই তাকে ভালোবাসতেও শেখানো যায়। এই বিশ্বাসই তাকে বিশ্বের অন্যতম শ্রদ্ধেয় মানবাধিকার নেতায় পরিণত করেছে। তিনি বুঝেছিলেন, আইন বদলানো যতটা জরুরি, মানুষের মন বদলানো তার চেয়েও কঠিন।
মুহাম্মদ ইদ্রিস, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং নেলসন ম্যান্ডেলার জীবন তিনটি ভিন্ন মহাদেশের গল্প। একজন বাংলাদেশি অভিবাসী, একজন ব্রাজিলীয় ফুটবলার এবং একজন আফ্রিকান মুক্তিসংগ্রামী। কিন্তু তাদের জীবনের গভীরে একই সুর ধ্বনিত হয়েছে, মানুষের মর্যাদা কখনো তার ত্বকের রং দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। যে সমাজ এই সহজ সত্য ভুলে যায়, সে সমাজ উন্নত প্রযুক্তি অর্জন করলেও প্রকৃত অর্থে সভ্য হয়ে উঠতে পারে না।
বাংলাদেশের জন্যও এই আলোচনা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ আমরা এমন একটি জাতি, যার জন্মই বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। অথচ আমাদের সমাজেও কখনো কখনো গায়ের রং, ভাষা, পেশা, জাতিগত পরিচয় কিংবা আর্থ-সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বৈষম্য দেখা যায়। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, দলিত জনগোষ্ঠী কিংবা বিদেশে কর্মরত অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। আমরা যদি বিশ্বের কাছে সম্মান চাই, তবে আমাদের নিজেদের সমাজেও সমান মর্যাদার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
আরও পড়ুন
স্পেনের ভবিষ্যৎ রানি কে এই সুন্দরী? নিয়েছেন সেনা-নৌ-বিমান প্রশিক্ষণ
বর্ণবাদ আসলে মানুষের চোখে নয়, তার চেতনায় জন্ম নেয়। তাই কেবল আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। পরিবারে, বিদ্যালয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং গণমাধ্যমে এমন মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বৈচিত্র্যকে দুর্বলতা নয়, শক্তি হিসেবে দেখা হবে। একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই শেখে যে পৃথিবীর সব মানুষের রক্তের রং এক, তবে বড় হয়ে সে মানুষের ত্বকের রং দিয়ে বিচার করতে শিখবে না।
আজকের পৃথিবী অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাক্ষী। মানুষ মহাকাশে যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে, চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিদিন নতুন বিস্ময় সৃষ্টি করছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মধ্যেও যদি একজন মানুষ কেবল গায়ের রঙের কারণে অপমানিত হন, তবে সেই উন্নয়নের দাবি অপূর্ণ থেকে যায়। সভ্যতার প্রকৃত পরিমাপ প্রযুক্তির উৎকর্ষে নয়; মানুষের প্রতি মানুষের আচরণে।
মুহাম্মদ ইদ্রিসের গল্প তাই শুধু একজন বাংলাদেশির গল্প নয়, এটি সেই সব মানুষের গল্প, যারা অন্যায়ের মুখোমুখি হয়েও মাথা নত করেননি। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের চোখের জল কেবল একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত বেদনা নয়; এটি বিশ্ববিবেকের প্রতি একটি প্রশ্ন। আর নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ কারাবাস আমাদের শেখায়, স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক অধিকার নয়; মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠারও আরেক নাম।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ঘৃণার সাম্রাজ্য কখনো স্থায়ী হয়নি। দাসপ্রথা টিকেনি, এপার্টহাইডও টেকেনি। কিন্তু মানব মর্যাদার পক্ষে যারা দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের নাম আজও পৃথিবীর মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করে। কারণ সময় শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাবানদের নয়, ন্যায়ের পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়।
আমরা প্রায়ই বলি, পৃথিবী বদলাতে হবে। কিন্তু পৃথিবী কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়; পৃথিবী বদলায় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে। একজন শিক্ষক যখন তার সব শিক্ষার্থীকে সমান চোখে দেখেন, একজন নিয়োগকর্তা যখন যোগ্যতাকেই একমাত্র মানদণ্ড করেন, একজন দর্শক যখন গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে বর্ণবাদী স্লোগানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন-সেখান থেকেই পরিবর্তনের শুরু।
আরও পড়ুন
যেভাবে শিশুভক্তদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন মেসি-রোনালদো-নেইমার
হয়তো বর্ণবাদ একদিন পুরোপুরি বিলীন হবে না। তবু ইতিহাস আমাদের আশাবাদী হতে শেখায়। কারণ প্রতিটি যুগেই ঘৃণার চেয়ে ভালোবাসার মানুষ বেশি ছিল বলেই সভ্যতা টিকে আছে। মুহাম্মদ ইদ্রিস, নেলসন ম্যান্ডেলা এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জীবন আমাদের সেই বিশ্বাসই নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার জাতি, ভাষা কিংবা ত্বকের রং নয়, তার বিবেক। যে দিন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ এই সহজ সত্যটি হৃদয়ে ধারণ করবে, সে দিন আর কোনো শিশুকে নিজের রঙের জন্য লজ্জা পেতে হবে না, কোনো অভিবাসীকে নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে হবে না, কোনো খেলোয়াড়কে দর্শকের গ্যালারি থেকে ঘৃণার শব্দ শুনতে হবে না। সেদিন মানবসভ্যতা হয়তো নিখুঁত হবে না, কিন্তু আরও ন্যায়ভিত্তিক, আরও উদার এবং আরও মানবিক হবে।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধকি।
কেএসকে








