ফাইনালের আগে আরেকটি ফাইনাল। ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে পরিপূর্ণ দুই দল, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দুই শক্তি, ফ্রান্স ও স্পেন। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই যাদের সম্ভাব্য ফাইনালিস্ট ধরা হচ্ছিল, ভাগ্যের পরিহাসে তাদের দেখা হয়ে যাচ্ছে শেষ চারের লড়াইয়েই। ডালাসে এই মহারণে জয়ী দল পা রাখবে নিউ জার্সির ফাইনালে, আর পরাজিত দলের স্বপ্ন থেমে যাবে ফাইনালের আগেই।
এ পর্যন্ত ছয় ম্যাচের সবকটিই জিতেছে ফ্রান্স। মাত্র দুটি গোল হজম করা দিদিয়ে দেশমের দল এগিয়ে চলেছে দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিলিয়ান এমবাপে। ৬ ম্যাচে আট ৮ করে তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে, সঙ্গে রয়েছে ওসমান দেম্বেলের ৫ গোল এবং মাইকেল অলিজের ৬ অ্যাসিস্ট। আক্রমণে এই ত্রয়ী প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্কের নাম। আর জিততে পারলেই ফ্রান্স টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার কীর্তি গড়বে, যা এর আগে ইউরোপের হয়ে করতে পেরেছিল শুধু পশ্চিম জার্মানি।
তবে স্পেনও এসেছে সমান শক্তি নিয়ে। পুরো টুর্নামেন্টে তারা গোল হজম করেছে মাত্র একটি। লা রোহারা আসল শক্তি বলের দখল, দ্রুত বল পুনরুদ্ধার এবং মিডফিল্ডের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। রদ্রি, পেদ্রি, দানি ওলমো, লামিনে ইয়ামাল ও মিকেল ওইয়ারসাবালের সমন্বয়ে গড়া এই দল প্রতিপক্ষকে শ্বাস নেওয়ার সুযোগই দেয় না। বল হারানোর গড় ১১.৬ সেকেন্ডের মধ্যেই তারা আবার দখল ফিরে পায়, যা বাকি সেমিফাইনালিস্টদের মধ্যে সেরা। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এই ম্যাচকে ইতোমধ্যেই বলেছেন, ‘ফাইনালের আগের ফাইনাল’।
তাই এই লড়াইকে শুধু ফ্রান্সের আক্রমণ বনাম স্পেনের রক্ষণ বললে ভুল হবে। পরিসংখ্যান বলছে, দুই দলই আক্রমণ ও রক্ষণ, দুই বিভাগেই টুর্নামেন্টের সেরাদের মধ্যে। একজনের অস্ত্র বিস্ফোরক গতি আর সরাসরি আক্রমণ, অন্যজনের শক্তি ধৈর্য, পাসিং আর কৌশলী নিয়ন্ত্রণ। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এটিকে এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচ বলে মনে করছেন, এমন এক লড়াই যেখানে গোলের সম্ভাবনাও কম নয়।
ইতিহাসও যোগ করছে বাড়তি উত্তাপ। বিশ্বকাপে এটাই হবে দুই দলের মাত্র দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। ২০০৬ সালে শেষ ষোলোতে ফ্রান্স ৩-১ গোলে জিতেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে স্পেনেরই দাপট বেশি। শেষ ১০ দেখায় সাতটি জয় তাদের, আর সর্বশেষ দুই লড়াই, ইউরো ২০২৪ ও নেশনস লিগ ২০২৫-এর সেমিফাইনালেও জয়ী হয়েছে লা রোহারা। তাই প্রতিশোধের আগুন যেমন ফ্রান্সের, তেমনি আধিপত্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ স্পেনের।
দল নির্বাচনের দিক থেকেও নজর থাকবে কয়েকটি বিষয়ে। ফ্রান্সে অহেলয়াঁ চুয়ামেনি, উইলিয়াম সালিবা ও দায়ো উপামেকানোর ফিটনেস নিয়ে কিছুটা শঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে স্পেনের শিবিরে বড় কোনো চোটের খবর নেই। পরিসংখ্যানের ভাষায় অপ্টা সুপারকম্পিউটার সামান্য এগিয়ে রাখছে ফ্রান্সকে, তবে ব্যবধান এতটাই কম যে এই ম্যাচে এক মুহূর্তের ভুল কিংবা এক ঝলক প্রতিভাই নির্ধারণ করে দিতে পারে ফাইনালের টিকিট।
এক পাশে এমবাপের বিস্ফোরণ, অন্য পাশে ইয়ামালের জাদু। এক পাশে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন, অন্য পাশে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নদের বিশ্ব জয়ের অভিযাত্রা। ডালাসে তাই শুধু একটি সেমিফাইনাল নয়, ফুটবল বিশ্বের দুই মহাশক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ অপেক্ষা করছে।








