বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে দুনিয়াজুড়ে মাতামাতির শেষ নেই। খেলা দেখার সময় মানুষ কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট। এমনকি যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সবই যেন পেছনে পড়ে যায়। হাজার হাজার মাইল দূরের দেশ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন কিংবা জার্মানিকে নিয়ে আমাদের উত্তেজনার শেষ নেই, শুধু তাদের খেলাকে ভালোবেসে। নিজের দেশ খেলতে না পারলেও এই একটি সময়ে আমরা হয়ে উঠি গ্লোবাল সিটিজেন। নিজেদের বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরের একজন দর্শক বলে মনে করি।
অথচ এবার বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকেই দেখছি, একটি শ্রেণি খেলার সঙ্গে ধর্মকে জড়িয়ে বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিশেষ করে অমুসলিম খেলোয়াড় বা দলের প্রতি সমর্থনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্মীয় প্ল্যাটফর্ম থেকে সতর্কতামূলক সামাজিক ও ধর্মীয় প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বুঝতে পারছি না, এত বছর পর কেন বিশ্বকাপ ফুটবলের সঙ্গে ইসলাম ধর্মকে জড়িয়ে ফতোয়া দেওয়া শুরু করল বিভিন্ন ইসলামি ব্লগ ও অনলাইন পোর্টাল।
ফুটবল খেলাকে সরাসরি হারাম না বললেও বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উন্মাদনা এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন অনৈসলামিক বিষয় নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বা দেশে ফুটবল খেলা নতুন কিছু নয়; এটি যুগ যুগ ধরে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খেলা। অথচ একে বিজাতীয় সংস্কৃতি বলে সমালোচনা করা হচ্ছে, বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, এমনকি মিছিলও করা হচ্ছে।
১১ জুন ২০২৬ ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ শুরু হয়েছে। এই বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে প্রতি চার বছর পরপর জাতি, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে সবাই মেতে ওঠেন। এই মেতে ওঠা ও আনন্দ করাটাতেই যেন তাদের আপত্তি। তারা মনে করছেন, মানুষ খেলা দেখে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করছেন। মানুষের ঈমান, সময়, অর্থ ও চরিত্র নষ্ট হচ্ছে।
আমরা খেলতে পারছি না, কারণ আমাদের পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ প্রশিক্ষক ও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। উপরন্তু খেলাধুলা নিয়েও চলে রাজনীতি, বিদ্বেষ ও অপপ্রচার। অর্থাৎ আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে খেলাধুলাই ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। মাঠ না থাকায় শিশুরা সারাদিন অনলাইনে সময় কাটাচ্ছে। এর মধ্যেও বিশ্বকাপ দেখা নিয়ে একশ্রেণির মানুষ ফতোয়া দিচ্ছেন, মিছিল করে বিশ্বকাপের বিরোধিতা করছেন।
তাদের কেন মনে হচ্ছে, মানুষ ফরজ ইবাদতে অবহেলা করে খেলা দেখছেন? আমরা দেখেছি, যারা সত্যিকারভাবে ধর্ম পালন করেন, তারা পারতপক্ষে তাঁদের ধর্মীয় আবশ্যিক বিধি ও সময়ের খেলাপ করেন না। আবার যারা প্রকৃতপক্ষে ধর্মে বিশ্বাসী নন, তারা খেলা না দেখলেও ওই সময়ে ধর্মচর্চা করেন না। অন্যদিকে অনেকে আছেন, যারা ধর্মের কথা বলে অধর্মের কাজ করেন।
অন্য কোনো অমুসলিম দেশের খেলোয়াড়দের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা তৈরি হওয়া কিংবা নিজের ঘরের ছাদে বিদেশি পতাকা উড়ানোকে ইসলামে নিষিদ্ধ বলে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ খেলার অঙ্গনে মুসলিম-অমুসলিম আলাদা করে বিচার করা হয় না। কারা ভালো খেলছে, কারা জয়ী হতে পারে—এসবই সেখানে বিবেচ্য বিষয়।
এতগুলো বছর ধরে বিশ্বকাপ চলছে। বাংলাদেশের কোনো সমর্থক কি নিজের ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করেছেন? করেননি। কারণ খেলা পছন্দ করার সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নেই। এ ছাড়া ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ১৪টি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশও অংশ নিয়েছে।
বরং এটি একটি ইতিবাচক দিক যে, খেলাধুলার অর্জনের দিক দিয়ে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে থাকলেও ফুটবল ও ক্রিকেট নিয়ে এ দেশের মানুষের আগ্রহ ও উন্মাদনা অনেক বেশি। মানুষ আনন্দ করতে চায়, সুস্থ প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে চায়। খেলা চলাকালে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রীড়া নৈপুণ্য উপভোগ করে। কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় নিজেদের অপ্রাপ্তি ও হতাশা।
আধুনিক বিশ্বে খেলাধুলা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। বিশ্বকাপে ৪৮টি দেশ অংশ নিলেও বাংলাদেশ ভাগ হয়ে যায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায়। চারদিকে ছেয়ে যায় বড় বড় পতাকা, ফেস্টুন, জার্সি, টুপি ও দেয়াললিখনে। বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্ট এলেই বাংলাদেশের দৃশ্যপট এভাবেই বদলে যায়। চায়ের টেবিলে, অফিসে, আড্ডায় তর্ক-বিতর্ক জমে ওঠে। শিশু থেকে প্রবীণ—সবার মুখে মুখে ফিরে পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, রোনালদো ও নেইমারের নাম। ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ, ছাত্র-জনতা—সবাই সমানভাবে বিশ্বকাপের আনন্দ উপভোগ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে এক হয়ে আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই যেন ‘বিশ্বকাপ জ্বর’। এই নিষ্পাপ আনন্দ উদ্যাপনের সুযোগ কি সবসময় পাওয়া যায়?
খেলাপাগল মানুষ নিজের পছন্দের দলকে সমর্থন করতে গিয়ে কত কিছুই না করেন। সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত বাংলাদেশেও আবাহনী ও মোহামেডানকে ঘিরে এমনই উত্তেজনা ছিল। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে যথাযথ সমর্থনের অভাব, খেলোয়াড়দের উৎসাহ না দেওয়া, ক্রিকেটের উত্থানসহ আরও কিছু কারণে একসময় আমাদের ফুটবল মুখ থুবড়ে পড়ে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। সাফল্যের সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে আজ হয়তো বিশ্বকাপের ময়দানে আমাদের জাতীয় সংগীতও বেজে উঠত।
তবে এটাও সত্য, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। মানুষ আহত হন, হাতাহাতি, ভাঙচুর, এমনকি রক্তপাতও ঘটে, যা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলতে থাকে তর্ক-বিতর্ক। হাজার হাজার মাইল দূরের দেশের সমর্থক হয়ে আমরা নিজেরাই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ি। এই অসহিষ্ণুতা মোটেও কাম্য নয়। মাঝেমধ্যে উত্তেজিত দর্শকেরা ভুলে যান, খেলা আনন্দের জন্য; বৈরিতা বা মারামারির জন্য নয়।
সমর্থকদের মধ্যে এই যে মাঝেমধ্যে গোলযোগ বেঁধে যায়, সেই সমস্যাটি কিন্তু ফুটবলের নয়; এটি সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও আমাদের মানসিকতার সমস্যা। একেকজন একেকটি দলকে সমর্থন করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় তখনই, যখন অন্য কোনো দল বা সেই দলের সমর্থকদের অপমান করা হয়। খেলায় জয়-পরাজয় থাকবেই। সেটিকে মেনে নেওয়াই সভ্যতার পরিচয়।
ফুটবল উন্মাদনার আরেকটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। নানা ধরনের ক্রীড়া সামগ্রী ব্যাপক বিক্রি হয়। ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা, ফুটপাতের দোকানি, প্রিন্টিং প্রেস থেকে শুরু করে অনলাইন উদ্যোক্তারাও ব্যবসার সুযোগ পান। প্রিয় দলকে সমর্থন করে তাদের পতাকা ওড়ানো, জার্সি পরা, রাত জেগে খেলা দেখা—সবই এক ধরনের আনন্দ। একই পরিবারে বা একই অফিসে ভিন্ন ভিন্ন দলের সমর্থক হয়ে একসঙ্গে খেলা দেখার মধ্য দিয়ে সম্প্রীতির পরিবেশও তৈরি হয়।
বিশ্বকাপবিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিমদের সংকটের সময় এভাবে খেলা দেখাটা উম্মাহর প্রতি চরম গাফিলতি। অথচ বাংলাদেশের মানুষ ফিলিস্তিন-গাজায় মুসলিম নিধন, সিরিয়ার হত্যাযজ্ঞ, ইরাক কিংবা বসনিয়া-হার্জেগোভিনিয়ার ঘটনাগুলো নিয়ে সবসময়ই সোচ্চার। ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে অনেকে ইসরায়েল-সমর্থিত পণ্যও বর্জন করেছেন।
ফুটবল একটি নির্দোষ ও আনন্দের খেলা। এই খেলা মানুষকে শারীরিকভাবে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখে। ইসলামের সঙ্গে এই খেলার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। ইসলামের বিধান মেনে চলা, নামাজ ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করা এবং হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা—এসব সম্পূর্ণ একজন ব্যক্তির নিজস্ব দায়িত্ব। ফুটবল খেলা দেখা বা না দেখার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
আমরা খেলতে পারছি না, কারণ আমাদের পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ প্রশিক্ষক ও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। উপরন্তু খেলাধুলা নিয়েও চলে রাজনীতি, বিদ্বেষ ও অপপ্রচার। অর্থাৎ আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে খেলাধুলাই ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। মাঠ না থাকায় শিশুরা সারাদিন অনলাইনে সময় কাটাচ্ছে। এর মধ্যেও বিশ্বকাপ দেখা নিয়ে একশ্রেণির মানুষ ফতোয়া দিচ্ছেন, মিছিল করে বিশ্বকাপের বিরোধিতা করছেন। অথচ বিশ্বকাপ চার বছর পরপর আসে এবং অল্প কিছুদিনের জন্যই চলে। এই অল্প সময়টুকু যদি মানুষ আনন্দ উদ্যাপনের সুযোগ পায়, তাহলে তাতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়।
২৯ জুন, ২০২৬
লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।
এইচআর/এএসএম








