২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলে শুরু হয়েছে তীব্র অস্থিরতা। দেশে ফেরার সময় ইনচন বিমানবন্দরে জাতীয় দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফকে ঘিরে বিক্ষোভ করেন শত শত সমর্থক। তাদের হাতে ছিল 'সাউথ কোরিয়ান ফুটবল মরে গেছে' লেখা ব্যানার, আর স্লোগান ছিল 'হং আউট'।
সমর্থকদের প্রধান ক্ষোভের লক্ষ্য ছিলেন প্রধান কোচ হং মিয়ুং-বো। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর তিনি দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে হং বলেন, 'এই ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার।'
একসময় দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে পরিচিত হং ২০০২ বিশ্বকাপে দলকে ঐতিহাসিক চতুর্থ স্থান এনে দেওয়া দলের অধিনায়ক ছিলেন। কোচ হিসেবেও শুরুটা ছিল সফল। তাঁর অধীনে ২০০৯ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়া কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে এবং ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে জেতে ব্রোঞ্জ পদক। তবে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ, আর ২০১৪ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার কাছে ৪-২ গোলের হারের স্মৃতি তখন থেকেই সমর্থকদের বিরূপ করে রেখেছিল।
২০২৪ সালে তাঁকে আবার জাতীয় দলের কোচ নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই বিতর্ক শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও প্রভাবের কারণে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (কেএফএ) শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
সাবেক জাতীয় ফুটবলার ও কেএফএর কোচ বাছাই কমিটির সদস্য পার্ক জু-হো দাবি করেন, 'পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়মই মানা হয়নি। প্রার্থীদের ন্যায্যভাবে মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া হয়নি।'
এই অভিযোগের প্রতি সমর্থন জানান দক্ষিণ কোরিয়ার কিংবদন্তি ফুটবলার ও সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড মিডফিল্ডার পার্ক জি-সুং। তিনি বলেন, 'মানুষ কেএফএর ওপর আস্থা হারিয়েছে। সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লাগবে। এই সাক্ষাৎকারের পরই সব বদলে যাবে বলে মনে করি না, কিন্তু নিজের অবস্থান জানানো প্রয়োজন ছিল।'
এর আগে ২০২৪ সালের শেষ দিকে সরকারি নিরীক্ষায়ও দেখা যায়, সাবেক কোচ ইউর্গেন ক্লিন্সমানকে বরখাস্ত করা এবং হং মিয়ুং-বোকে নিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। তদন্তে বলা হয়, বোর্ডের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের আগেই কার্যত হংকে বেছে নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী অনুমোদন ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা।
বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, 'যোগ্যতার বদলে পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতি যদি নেতৃত্ব নির্বাচনের ভিত্তি হয়, তাহলে ফলাফল কী হবে, তা স্পষ্ট। এটি সাংগঠনিক ও জনবল ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার ফল বলেই মনে হচ্ছে।'
ক্রীড়া বিশ্লেষক চোই ডং-হোও কেএফএর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, 'সমস্যার মূলেই রয়েছে কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অদক্ষতা।'
বিশ্বকাপে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলে এখন বড় ধরনের সংস্কারের দাবি জোরালো হয়েছে। সমর্থকদের বিশ্বাস, কেবল কোচ পরিবর্তন নয়, বরং পুরো ফুটবল প্রশাসনের কাঠামোতেই পরিবর্তন আনা জরুরী।
টিটিটি/এসকেডি/জেআইএম








