বিশ্বকাপের সবুজ মাঠে এখন এক অদ্ভুত দৃশ্য নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। জর্ডান পিকফোর্ড কিংবা লুকা জিদানের মতো বিশ্বসেরা গোলরক্ষকেরা বাতাসে শরীর ভাসিয়ে দিচ্ছেন, বলের গায়ে আঙুলের ডগাও ছোঁয়াচ্ছেন, কিন্তু লাভ হচ্ছে না কিছুই। চোখের পলকে বল তাদের গ্লাভস ফাঁকি দিয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে জালে।
গ্যালারিতে যখন উল্লাস, গোলপোস্টের নিচে তখন শুধুই অসহায়ত্বের গল্প। ক্রোয়েশিয়ার মার্টিন বাতুরিনার ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া শটে পিকফোর্ডের মরিয়া চেষ্টা কিংবা লিওনেল মেসির অবিশ্বাস্য শটে আলজেরিয়ার লুকা জিদানের পরাস্ত হওয়া, সবই যেন একই সুতোয় গাঁথা। এমনকি ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের দূরপাল্লার শটে ইরাকের আহমেদ বাসিল হাত ছোঁয়াতে পেরেও গোল আটকাতে পারেননি।
বক্সের বাইরে থেকে আসা এই দূরপাল্লার শটগুলোই এবারের বিশ্বকাপের পুরো সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ কেন এমনটা হচ্ছে? ফুটবলাররা কি আগের চেয়ে অনেক বেশি দূর থেকে শট নিচ্ছেন? নাকি গোলরক্ষকদের ফর্ম খারাপ? নাকি আসল রহস্য লুকিয়ে আছে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের কৌশলে কিংবা খোদ বলের ভেতরেই?
পরিসংখ্যানের খেরোখাতা উল্টালে চমকে যেতে হয়। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে পুরো টুর্নামেন্টে বক্সের বাইরে থেকে গোল হয়েছিল মাত্র ১২টি। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে সেই সংখ্যা ছিল ২৫। অথচ এবারের ৪৮ দলের এই মহাযজ্ঞে রাউন্ড অব ৩২ শেষ হতেই দূরপাল্লার গোলের সংখ্যা পৌঁছে গেছে ৩৫-এ!
৯৬ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটাই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ গোলের আসর, যেখানে গ্রুপ পর্বে প্রতি ম্যাচে গড়ে গোল হয়েছে ২.৯৫টি, যা ১৯৭০ সালের পর সর্বোচ্চ।
তাহলে কি ফুটবলাররা এখন দূর থেকে শট নেওয়ার উৎসবে মেতেছেন? হিসাব কিন্তু তা বলছে না। রাউন্ড অব ৩২ পর্যন্ত মোট শটের ৩৭.৩ শতাংশ এসেছে বক্সের বাইরে থেকে, যা কাতারের (৩৬.৭%) কাছাকাছি এবং রাশিয়ার (৪২.৪%) চেয়েও কম। এমনকি বর্তমান ক্লাব ফুটবলের প্রিমিয়ার লিগ (৩২.৬%) বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের (৩৩.১%) সঙ্গে তুলনা করলেও এই হার একদম স্বাভাবিক। আসল জাদুটোকা লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। শট নেওয়ার সংখ্যায় নয়, বরং নেওয়া শটগুলো গোলে পরিণত হওয়ার হারে। এবারের বিশ্বকাপে প্রায় প্রতি দুই ম্যাচে একটি করে দূরপাল্লার গোল হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রতি সাতটি গোলের একটি আসছে বক্সের বাইরে থেকে, যা কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ!
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, গোলের এই বন্যা কিন্তু বক্সের ভেতর থেকে আসছে না। বরং প্রতি ম্যাচে বক্সের ভেতর থেকে গোলের সংখ্যা এবং প্রতিটি শটের সামগ্রিক মান বা Expected Goals (xG) আগের চেয়ে কমে গেছে। কাতার বিশ্বকাপের ০.১১৭ xG এবার নেমে এসেছে ০.১০৪-এ। এর মানে খুব পরিষ্কার, ফুটবলাররা আগের চেয়ে অনেক কঠিন ও প্রতিকূল অবস্থান থেকে শট নিয়েও নিখুঁতভাবে বল জালে পাঠাচ্ছেন।
এই দূরপাল্লার শটের রহস্য বুঝতে হলে শুধু আক্রমণভাগের দিকে তাকালে চলবে না, নজর দিতে হবে ডিফেন্ডারদের কৌশলের ওপর। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগই অনেক সময় নির্ধারণ করে দেয় শটটি কোথা থেকে নেওয়া হবে। যেমন তুরস্কের কথাই ধরা যাক। কাতার বা রাশিয়ার পর কোনো দল বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে ৪৫টির বেশি শট নিতে পারেনি, সেখানে তুরস্ক নিয়েছিল রেকর্ড ৬২টি শট! যার মধ্যে ৩২টিই ছিল বক্সের বাইরে থেকে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, তারা একটি গোলও পায়নি এবং দ্রুতই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়।
তুরস্কের এই অতি-আক্রমণাত্মক রূপের পেছনে ছিল শুরুর ধাক্কা। দুই ম্যাচেই তারা শুরুতেই গোল হজম করে বসে। ফলে প্রতিপক্ষ দলগুলো দ্রুত নিচে নেমে নিজেদের রক্ষণভাগকে এক অভেদ্য দুর্গে পরিণত করার সুযোগ পায়, ফুটবলের ভাষায় যাকে বলে 'লো ব্লক' বা 'মিড ব্লক' রক্ষণ। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তুরস্কের এই অসহায়ত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছিল। ম্যাচের মাত্র দুই মিনিটে প্যারাগুয়ে এগিয়ে যাওয়ার পর বাকি ৮৮ মিনিট তারা নিজেদের বক্সের সামনে এমন দেয়াল তুলেছিল যে, তুরস্ক বক্সে ঢোকার কোনো পথই খুঁজে পায়নি। বাধ্য হয়ে তাদের একের পর এক দূরপাল্লার শট নিতে হয়েছে।
প্যারাগুয়ে পুরো টুর্নামেন্টে বলের দখল ধরে রাখায় বিশ্বাসী ছিল না, নিজেদের বক্সে প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে বেশি বল ছোঁয়ার সুযোগও তারাই দিয়েছে। কিন্তু তাদের রক্ষণ এতটাই নিখুঁত, সঙ্কুচিত ও সংগঠিত ছিল যে তারা প্রতিপক্ষকে খুব কম মানের সুযোগ বা xG (মাত্র ০.০৭) দিয়েছে। তাদের বিপক্ষে নেওয়া শটের ৪২ শতাংশই ছিল বক্সের বাইরে থেকে।
আবার অন্য প্রান্তে আছে স্পেনের মতো দল, যারা নিচে নেমে রক্ষণ করে না, বরং মাঠের ওপরের দিকে উঠে 'হাই প্রেসিং' খেলে প্রতিপক্ষের খেলার ছন্দই নষ্ট করে দেয়। এই বিশ্বকাপে স্পেনই সবচেয়ে বেশি, ৪৩ বার প্রতিপক্ষের অর্ধে বল কেড়ে নিয়েছে। তারা প্রতি ম্যাচে নিজেদের বক্সে প্রতিপক্ষকে গড়ে মাত্র সাতবার বল স্পর্শ করতে দিয়েছে। ফলাফল? স্পেনের বিপক্ষে খেলা দলগুলো তাদের মোট শটের ৫৮ শতাংশই নিতে বাধ্য হয়েছে বক্সের বাইরে থেকে।
৪৮ দলের এই বড় বিশ্বকাপে ছোট দলগুলো টিকে থাকার জন্য নিচে নেমে 'লো ব্লক' তৈরি করছে, আর বড় দলগুলো খেলছে শ্বাসরুদ্ধকর 'হাই প্রেসিং'। কৌশল যা-ই হোক, দুই ক্ষেত্রেই আক্রমণভাগের সামনে দূরপাল্লার শট নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকছে না।
কিন্তু দূর থেকে নেওয়া এই শটগুলোর ১৯ শতাংশই কেন সরাসরি গোলে পরিণত হচ্ছে, যেখানে কাতারে এই হার ছিল মাত্র ৮ শতাংশ?
এর পেছনে ফুটবলীয় দক্ষতার পাশাপাশি কাজ করছে বিশুদ্ধ বিজ্ঞান ও জ্যামিতি। প্রথমত, ১৮ থেকে ২৫ গজ দূর থেকে যখন কোনো শক্তিশালী শট নেওয়া হয়, তখন গোলের কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় তার স্বাভাবিক বাঁক অনেকটাই সমতল হয়ে যায়। বলটি তখন গোলরক্ষকের কোমর থেকে চোখের মাঝামাঝি উচ্চতায় এসে পৌঁছায়। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে, এই উচ্চতায় ধেয়ে আসা বলের গতিপথ ও গভীরতা নির্ণয় করা একজন গোলরক্ষকের জন্য সবচেয়ে কঠিন। কারণ, যখন একটি বল চলমান পটভূমির বিপরীতে সোজা মুখের দিকে ধেয়ে আসে, তখন সেটি কেবল আকারে বড় হতে থাকে। গোলরক্ষকের চোখের স্বাভাবিক অনুমানকে ফাঁকি দিয়ে বলটি এক মুহূর্ত আগেই সামনে চলে আসে, ফলে বল গ্লাভসবন্দি না হয়ে হাত লেগেও জালে ঢুকে যায়।
দ্বিতীয়ত, এই দূরত্বটি 'নাকলবল' শটের জন্য একদম স্বর্গরাজ্য। সাধারণত বলটি বাতাসে ১৫ গজ যাওয়ার পর তার অনিয়মিত দুলুনি বা সুইং শুরু হয়। গোলরক্ষক যখন ডাইভ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই বলটি তার দিক পরিবর্তন করে বসে। আর যদি পেনাল্টি বক্সে খেলোয়াড়দের ভিড় থাকে, তবে তো কথাই নেই! সেই মানবদেয়ালের কারণে গোলরক্ষক স্ট্রাইকারের পায়ের মুভমেন্ট বা শট নেওয়ার প্রথম ঝলকটি দেখতেই পান না। সেই প্রথম সূত্রটি হারিয়ে গেলে বলের গতিপথ অনুমান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সবশেষে ফুটবল দুনিয়ার চিরন্তন বিতর্ক বিশ্বকাপের বল। এবারের আসরের জন্য তৈরি অ্যাডিডাসের 'ট্রিয়ন্ডা' বল নিয়ে সম্প্রতি দুটি উইন্ড টানেলভিত্তিক গবেষণা হয়েছে। পদার্থবিদ জন গফের নেতৃত্বে করা প্রথম গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রিয়ন্ডা বলের সেলাইয়ের খাঁজ সাম্প্রতিক সময়ের অন্য বলের চেয়ে বেশি গভীর ও রুক্ষ। এর ফলে বলের উড্ডয়ন অনেক বেশি স্থিতিশীল হয় এবং ২০১০ সালের জাবুলানি বলের মতো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাতাসে ভেসে থাকার প্রবণতা কমে যায়।
তবে গবেষক সুংচান হং ও তাকেশি আসাইয়ের দ্বিতীয় গবেষণাটি গোলরক্ষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা দেখিয়েছেন, কোনো স্পিন ছাড়া যখন এই বলে 'নাকলবল' শট নেওয়া হয়, তখন বুট ছাড়ার মুহূর্তে বলের অসমান প্যানেলগুলো যেদিকে মুখ করে থাকে, তার ওপর ভিত্তি করে বাতাসে বলের আচরণ সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। এই অনির্দেশ্য গতিপথের পেছনে বলের কোনো ত্রুটি নেই, বরং এটি এর গঠনগত বৈশিষ্ট্য। যদিও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসের দাবি, ৩০০টিরও বেশি পরীক্ষাগারে পরীক্ষার পর তৈরি এই বল সম্পূর্ণ নিখুঁতভাবে কাজ করছে।
বিশ্বকাপ এখন প্রবেশ করছে নকআউটের মহাগুরুত্বপূর্ণ পর্বে, যেখানে একটি ভুলের মাশুল টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়। সামনের ম্যাচগুলোতে দলগুলোর লড়াই আরও তীব্র হবে, রক্ষণভাগের দেয়াল হবে আরও নিশ্ছিদ্র, আর সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টা বাড়বে শতগুণ। আর এর সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়বে দূরপাল্লার শটের তীব্রতা। মাঠের লড়াইয়ে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে গোলরক্ষকেরা কি পারবেন বিজ্ঞানের এই জটিল জ্যামিতিকে হারিয়ে দিতে, নাকি চোখের সমান উচ্চতায় ধেয়ে আসা বলের গল্পে আরও একবার ট্র্যাজিক হিরো হয়েই মাঠ ছাড়তে হবে তাদের, তা সময়ই বলে দেবে।








