এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে নতুন কিছু কথা বলার আছে। জার্মানি, ক্রোয়েশিয়া, পর্তুগাল, ব্রাজিলের মতো বাঘা বাঘা দল কোয়ার্টার ফাইনালেই উঠতে পারল না। আর্জেন্টিনাকেও একই পর্বে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল মিসর। ইতালি সেই কবে থেকে কোয়ালিফাই করতে পারছে না! নেদারল্যান্ডসকেও তার আগের তেজোদীপ্ত পোশাকে দেখা যাচ্ছে না। এখন মনে হয় বোঝার সময় এসেছে, বিশ্ব ফুটবল পাল্টে যাচ্ছে। এখন চাইলেই যেকোনো দেশের জাতীয় দলকে অজেয় মনে করার কারণ নেই। বিশ্বকাপের মূল পর্বে অংশ নেওয়া প্রতিটি দলই এখন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ক্ষমতা রাখে। কোনো দলকে ‘আন্ডারডগ’ ভাবার দিন শেষ হয়ে গেছে।

নামীদামি দলগুলো পরাজিত হলেই পচা শামুকে পা কেটেছে বলে আর মনে করার উপায় নেই। এবারের বিশ্বকাপের খেলাগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, মূল পর্বে আসা প্রতিটি দলই নিয়েছে কঠোর প্রস্তুতি। যেকোনো দলকে হারিয়ে দেওয়ার মতো প্রশিক্ষণ তারা পাচ্ছে। কেপ ভার্দে দেশটার কথাই ধরুন। কী অসাধারণ খেলা উপহার দিল তারা। যতটা সময় তারা মাঠে ছিল, ততটা সময়ই পায়ের কারুকাজে তারা শিল্পের পরশ ছড়িয়েছে। মিসর তো দেখিয়েই দিল তাদের বীরত্ব। মরক্কোকে কোথায় রাখবেন? এভাবে প্রতিটি দল সম্পর্কে আলাদাভাবে বলা যাবে, কিন্তু সেটা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য হলো এ কথা বলা যে এবারের বিশ্বকাপে প্রতিটি দলই লড়াই করে টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছিল। নামীদামি দলের সঙ্গে খেলতে গিয়ে নিজেদের কেউ ছোট দল বলে মনে করেনি। দর্শকেরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেছে, মূল চমকগুলো আসছে তথাকথিত ছোট দলগুলোর দিক থেকে।

কী করে এ রকম একটি অবস্থার সৃষ্টি হলো? কেন বড় দলগুলো এখন আর হাওয়ায় গা ভাসিয়ে বিজয়ের স্বপ্ন দেখতে পারছে না? এর অনেক কারণের একটি হতে পারে, মাঠের খেলা প্রযুক্তির সাহায্যে দেখে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খুঁজে বের করে নিজস্ব পরিকল্পনা তৈরি করা। যাঁরা কোচ বা ম্যানেজার আছেন, তাঁরা তাঁদের সহযোগীদের নিয়ে প্রতিপক্ষের গোপন কৌশলকে আবিষ্কার করেন এবং কীভাবে তা নস্যাৎ করা যায়, সেটাই শিখিয়ে দেন খেলোয়াড়দের। বড় দলগুলো বুঝতেই পারে না, তাদের কৌশলগুলো ফাঁস হয়ে গেছে, একই ধরনে খেলতে থাকলে ঠিকভাবে গোলে শট করা যাবে না, পাসগুলো ঠিক জায়গায় গিয়ে পৌঁছাবে না, যে দলগুলোকে হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছিল, সে দলগুলোই বদলে দেবে হিসাবনিকাশ।

বিশ্বকাপ নিয়ে অনেক ধরনের রাজনীতি আছে। অপমান-অবমাননা আছে। মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের বোঝাপড়া আছে। বিশাল বাণিজ্যজগৎ আছে। কিন্তু মূলত স্টেডিয়ামে দুই দলের ২২ খেলোয়াড় জীবন বাজি রেখে যে খেলায় অবতীর্ণ হন, তারই রোমাঞ্চে ভাসে দর্শক। তাই মাঠের বাইরে যা-ই ঘটুক না কেন, তার প্রভাব হয়তো মাঠে পড়ে। কিন্তু খেলার মাঠেই উদ্ভাসিত হয় সাফল্য।

এই বিশ্বকাপে কোনো পচা শামুক নেই। সামনে আরও বদলে যাবে বিশ্বকাপের হিসাবনিকাশ।