প্রতিটি মানুষেরই মূলত দুটি সত্তা থাকে—আত্মা ও দেহ। একটি অন্যটিকে ছাড়া কিছুতেই টিকতে পারে না। আত্মা ছাড়া দেহ হলো অচল। দেহের জন্য আমরা খাই। কিন্তু আত্মার খোরাক কী? মানসিক প্রশান্তি। দেহকে দেখা যায়, আত্মাকে কেউ দেখতে পারে না। কিন্তু প্রতিক্ষণে তার অনুভব অনিবার্য। তেমনি প্রকৃতিতেও এ দুটি সত্তা বিরাজমান। একটি হলো বস্তুগত, অন্যটি অবস্তুগত। প্রকৃতির বস্তুগত বিষয়গুলো হলো—পাহাড়, পর্বত, সাগর-মহাসাগর, চন্দ্র-সূর্য, বৃক্ষ-লতা, জীব-অণুজীব ইত্যাদি। এ হলো প্রকৃতির দেহ। অবস্তুগত বিষয়গুলো হলো—আত্মার মতো যা দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের মধ্যে যে পারস্পরিক নিবিড় সম্পর্ক, সেটিই আসলে প্রকৃতির আত্মা, যা চিরকাল প্রকৃতিকে আপন বৈভবে সমৃদ্ধ করেছে, টিকিয়ে রেখেছে পৃথিবীর বুকে বসবাসকারী প্রতিটি জীবন। প্রকৃতির এই বস্তুগত ও অবস্তুগত দুটি সত্তারই সমানতালে চলতে হয়, তা না হলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে পড়ে।
মানুষ বর্তমানে অতিরিক্ত ভোগবাদী হয়ে পড়ায় আমরা প্রতিনিয়ত অপরিবেশসুলভ বহু রকমের আচরণ করে চলেছি। আমরা আমাদের অস্তিত্বের সারথি প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করে নিজেদের বাহাদুরি জাহির করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। কিন্তু একবারও ভাবছি না যে প্রকৃতি সব সময় তার আপন নিয়মে চলে। সেখানে নিজেদের বাহাদুরি দেখানোর কিছু নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে কেউ কখনো প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে পারেনি, বরং দরকার প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান ও মমতাময় সম্পর্ক স্থাপন। তার আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। প্রকৃতিবিনাশী চাষাবাদ থেকে সরে এসে প্রাকৃতিক চাষাবাদ হতে পারে তার প্রথম সোপান।
প্রাকৃতিক চাষাবাদ হলো প্রকৃতিকে রক্ষার এক কার্যকর প্রয়াস, যা হতে হয় পরিবেশবান্ধব ও সব রকমের রাসায়নিক দ্রব্যবর্জিত। এমনকি জমিতে লাঙল দিয়ে চাষ না দিয়ে শুধু বীজ বুনে তা খড় দিয়ে ঢেকে রাখা যায়। এ রকম এক অভিনব প্রাচীন পদ্ধতিও প্রাকৃতিক কৃষি। এতে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা পায়। প্রকৃতি প্রদত্ত বিধান মেনে চলাই প্রাকৃতিক কৃষির মূল সূত্র। একবার ভাবুন তো, পৃথিবীজুড়ে যেসব প্রাকৃতিক অরণ্য রয়েছে, সেখানকার গাছগুলো কী বিশাল! সে গাছগুলোকে বড় করার জন্য কেউ তো যত্ন নেয়নি। এটাই প্রকৃতির শক্তি। কিছু না করলেও প্রকৃতি তার আপন শক্তিতে অত্যন্ত সুসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সবকিছুকে গড়ে নেয়, বাড়িয়ে নেয়। আর তার সুফল ভোগ করে সব জীব।
একটা গাছ মানেই তার ওপর নির্ভরশীল অনেক জীবের আশ্রয়, নিরাপত্তা ও আহার। সেসব গাছের ঝরা পাতা পচে মাটিকে দিচ্ছে অবিরাম উর্বরতা। সে উর্বরতা ও পুষ্টি উপাদান স্থানান্তরে অংশ নিচ্ছে মাটির নিচে বয়ে চলা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ছত্রাকসূত্ররা। গাছের নিচে পুরু হয়ে ঢেকে থাকা পাতা ও আবর্জনার চাদর রক্ষা করছে মাটির রস। বৃক্ষে জন্মানো ফলমূল খেয়ে জীবনধারণ করছে কোটি কোটি বন্য প্রাণী। একটা তিমির রোজ বিপুল পরিমাণ খাবারের দরকার হলেও কখনো সে তা আমাদের মতো কাল খাব বলে জমিয়ে রাখে না। বনের খাবার খেয়ে জীবন ধারণ করা বন্য প্রাণীরা শেষে বনেই মরে পড়ে থাকে। দেহ পচে আবার বনের মাটিতেই মিশে যায়। এভাবেই ওরা প্রকৃতির ঋণ শোধ করে। আর আমরা? একবার এ নিয়ে কিছু ভেবেছেন?
এসব কথা আমরা না ভাবলেও ত্রিশের দশকে জাপানের দার্শনিক মোকিচি ওকাদা ভেবেছিলেন। তাঁর ভাবনার উৎস ছিল সে দেশের আদিবাসীদের অনুসৃত চাষাবাদ ধারা, যা এখনো আমাদের দেশে অনেক আদিবাসী অনুসরণ করে চলেছে। যুগের পর যুগ ধরে তারা সার-কীটনাশকবিহীন শাশ্বত কৃষিধারাকে বহমান রেখেছে। ১৯৩০-এর দশকে মোকিচি ওকাদা প্রথম জাপানে প্রাকৃতিক কৃষি ধারণার প্রবর্তন করেন। তিনি ছিলেন সারবিহীন কৃষির প্রবক্তা। যিনি প্রস্তাব করেছিলেন নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনের জন্য জমিতে কোনো কৃত্রিম সার দেওয়ার দরকার নেই। জমিতে জন্মানো ফসলের আবর্তনই মাটিকে ফিরিয়ে দিতে পারে উর্বরতা শক্তি ও রক্ষিত হতে পারে পুষ্টিচক্র। এর পরের দশকে জাপানের আর একজন কৃষিবিদ ও দার্শনিক মাসানোবু ফুকুওকা তাঁর চাকরি বাদ দিয়ে গ্রামে এসে প্রাকৃতিক চাষাবাদ চর্চা শুরু করেন। তাঁর জীবনের প্রায় ৬০ বছর তিনি সে পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা তিনি তাঁর বিখ্যাত বই ‘দ্য ওয়ান স্ট্র রেভল্যুশন’-এ লিখে রেখে গেছেন। তিনি প্রাকৃতিক কৃষির জন্য চারটি মূলনীতির ওপর জোর দিয়েছিলেন—কর্ষণবিহীন চাষ, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকবিহীন এবং আগাছাকে আপদ না ভেবে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা শক্তি ফিরিয়ে আনা। তিনি প্রতিবছরই এরূপ প্রাকৃতিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করে ধান, গম, যব, রাই ও শীতকালীন ফসল ফলিয়ে জাপানের অন্য যেকোনো কৃষকের চেয়ে কখনো কম ফলন পাননি। অনেক বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীও তাঁর সেসব পদ্ধতি দেখেছেন। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক কৃষির প্রসার ঘটেছে নানা আঙ্গিকে, নানা মতে। যেমন কোরিয়ায় এ চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে কোরিয়ান ন্যাচারাল ফার্মিং (কেএনএফ) নামে। সে দেশে চো হান-কিউ উদ্ভাবিত এ পদ্ধতিতে মাটির বাস্তুতন্ত্রকে সমৃদ্ধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়, যার জন্য স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র থেকে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিকারক বিভিন্ন অণুজীব সংগ্রহ ও তা ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে ভারতের জিরো বাজেট ন্যাচারাল ফার্মিং বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০০-দশকের মধ্যে এর প্রসার ঘটে। ভারতীয় কৃষিবিদ সুভাষ পালেকার এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেন, যা পরবর্তী সময়ে সুভাষ পালেকার কৃষি নামে পরিচিতি লাভ করেন। এ পদ্ধতিতে তিনি সব প্রকার রাসায়নিক উপকরণ বাদ দিয়ে জীবামৃত ব্যবহারকে প্রাকৃতিক কৃষির এক আবশ্যকীয় উপকরণ হিসেবে সুপারিশ করেন। জীবামৃত তৈরি করা হয় গোবর, গোমূত্র, গুড়, ডালের ভুসি ইত্যাদির মিশ্রণ দিয়ে। এটি ব্যবহারে তিনি লক্ষ করেন যে এতে মাটির অণুজীব উদ্দীপিত হয়। ভারতের লাখ লাখ কৃষক এখন প্রাকৃতিক কৃষিধারায় এটি ব্যবহার করছেন।
এ দেশেও অন্তত ১০টা কারণে প্রাকৃতিক কৃষির প্রসার ঘটা দরকার। এটি মাটির প্রাকৃতিক শক্তিকে নষ্ট না করে সুস্থ রাখে, এতে মাটির দীর্ঘস্থায়ী উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায়, রাসায়নিক দূষণমুক্ত পরিবেশ ও খাদ্য নিশ্চিত হয়, চাষের খরচ কমে, পরিবেশ রক্ষা করে, উৎপাদিত ফসলের গুণগত মান ও স্বাদ বাড়ায়, ফসলকে প্রাকৃতিকভাবেই বিভিন্ন রোগ ও পোকার প্রতি প্রতিরোধী করে তোলে, চাষের জন্য চাষিদের অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না, প্রাকৃতিক নিয়মেই স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের জন্য একটি টেকসই খাদ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠে যার, দীর্ঘমেয়াদি সুফল হিসেবে মানুষ পায় সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন।
কিন্তু আমরা এখন যে ধারায় চাষবাস করছি ও জীবনযাপন করছি, আমার আশঙ্কা আমরা কেউ সুস্থ থাকব না। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রাসায়নিকে আমাদের খাদ্যদূষণ ঘটছে, পরিবেশও দূষিত হচ্ছে। চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলা যায়, দেশের একজনও আমরা নিরাপদ খাদ্য খেতে পারছি না। অনেকের হয়তো অনেক টাকা আছে, কিন্তু তাঁরাও সে টাকা দিয়ে নিরাপদ খাদ্য কিনতে পারছেন না। নিরাপদ খাদ্য পাওয়া ও প্রকৃতিকে রক্ষার মূল জায়গাটা হলো আমাদের ফসলের মাঠগুলো এবং কৃষকেরা। শুধু ভোক্তার সচেতনতায় কাজ হবে না, কৃষককে বেশি করে সচেতন করতে হবে। না হলে মরণব্যাধি ক্যানসারসহ নানা রকম রোগ বাড়তে থাকবে, আমরা ভবিষ্যতে দুর্বল ও অকর্মণ্য জাতিতে পরিণত হই, তা নিশ্চয়ই আমরা কেউ চাই না।
বর্তমানে সারা বিশ্বেই নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য শুরু হয়েছে প্রাকৃতিক চাষাবাদ পদ্ধতির চর্চা। উন্নত দেশগুলো কোনো দেশ থেকে এখন আর অনিরাপদ কোনো খাদ্যপণ্য কিনতে চাইছে না। তাই যেসব দেশ উন্নত বিশ্বে কৃষিপণ্য রপ্তানি করে তারা তাদের বেঁধে দেওয়া নিয়মনীতি কঠোরভাবে উৎপাদন করে সেগুলো বিদেশে পাঠাচ্ছে। কিন্তু অর্থের মোহে পড়ে একবারও আমরা ভাবছি না যে সেসব খাদ্য খেয়ে উন্নত দেশের মানুষেরা হয়তো ভালো ও সুস্থ থাকবে, কিন্তু আমাদের দেশের কৃষক যাঁরা সেসব পণ্য উৎপাদন করছেন, তাঁদের কী হবে, আমাদেরও নিরাপদ খাদ্য খাওয়ার অধিকার কেন থাকবে না? এ দেশে সম্প্রতি উত্তম কৃষিচর্চা বা গুড অ্যাগ্রিকালচার প্র্যাকটিসের মাধ্যমে বলা যায় অনেকটা আধা-প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে নিরাপদ ফসল উৎপাদন শুরু হয়েছে। আপাতত ১৫টি ফসল এ পদ্ধতিতে চাষ করা হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে প্রায় ৩ লাখ হেক্টর জমিতে এ পদ্ধতি অনুসরণ করে ফসল উৎপাদনের।
সময় এসেছে এসব নিয়ে গভীরভাবে ভেবে এ দেশের কৃষিকে প্রাকৃতিক কৃষিতে রূপান্তরের, শতভাগ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের। খণ্ডিত বা আংশিক উন্নয়ন কখনো টেকসই হয় না, দরকার সামগ্রিক প্রসার ও গ্রহণ। বাঁচাতে হবে এ দেশের মানুষ, পরিবেশ ও প্রকৃতিকে। আইন করে হলেও তা করতে হবে।
মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক








