ফিফা বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের নজরে থাকে। মাঠে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এবারের বিশ্বকাপে রেফারিদের নিয়েও বিতর্ক হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচে ৫ আর্জেন্টাইন রেফারি দেওয়া নিয়েও হচ্ছে আলোচনা-সমালোচনা। মূলত ফিফা সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের (ম্যাচ অফিসিয়াল) চিহ্নিত করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং দায়িত্ব বণ্টনের জন্য বছরের পর বছর কাজ করে।
কোনো নির্দিষ্ট ম্যাচে কারা দায়িত্ব পালন করবেন, তা নির্ধারণের আগে ফিফা একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করে। এতে একজন কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা, পারফরম্যান্স, শারীরিক সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা এবং চাপ সামলানোর দক্ষতা বিবেচনা করা হয়।
আগের টুর্নামেন্টগুলোতে যারা ভালো পারফর্ম করেন, প্রতিযোগিতা যত এগোয়, তারা তত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পান।
প্রতিটি ফিফা বিশ্বকাপ ম্যাচে একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যাচ অফিসিয়াল দল থাকে। এতে থাকেন—
* প্রধান রেফারি
* দুইজন সহকারী রেফারি
* চতুর্থ কর্মকর্তা (ফোর্থ অফিসিয়াল)
* ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)
* সহকারী ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (Assistant VAR)
ফিফার রেফারি বাছাই প্রক্রিয়া
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার বহু বছর আগেই রেফারি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফিফার রেফারিং বিভাগ বিভিন্ন কনফেডারেশনের আন্তর্জাতিক রেফারিদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে। বিশ্ব ফুটবলের ছয়টি কনফেডারেশন, ইউরোপ, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং ওশেনিয়া বড় প্রতিযোগিতাগুলোতে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স দেখানো রেফারিদের সুপারিশ করে।
সাধারণত ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারির তালিকা থেকেই কর্মকর্তাদের নির্বাচন করা হয়। অর্থাৎ, তাদের আগে থেকেই উচ্চ পর্যায়ের ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে মহাদেশীয় প্রতিযোগিতা, বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব, আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ এবং ক্লাব টুর্নামেন্ট।
একাধিক মৌসুম ধরে রেফারিদের পর্যবেক্ষণ করে ফিফা যেসব বিষয় মূল্যায়ন করে—
* সিদ্ধান্তের যথার্থতা
* ফুটবলের আইন বোঝা ও সঠিক প্রয়োগ
* কঠিন ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা
* খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা
* মাঠে অবস্থান ও চলাচল
* চাপের মধ্যেও ধারাবাহিকতা
* ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি প্রযুক্তির ব্যবহার
শারীরিক পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও পারফরম্যান্স মূল্যায়ন
বিশ্বকাপে দায়িত্ব পাওয়ার আগে রেফারিদের কঠোর শারীরিক ও কারিগরি মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ফিফা বিশেষ প্রস্তুতি ক্যাম্পের আয়োজন করে, যেখানে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের ফিটনেস পরীক্ষা নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলের উচ্চগতির ম্যাচ পরিচালনার সক্ষমতা যাচাই করা হয়।
রেফারিদের যেসব বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়...
* স্প্রিন্টের গতি
* উচ্চগতির দৌড়ানোর সক্ষমতা
* একাধিক প্রচেষ্টার মধ্যে পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা
* দীর্ঘ সময়ের ম্যাচে সহনশীলতা
ফিটনেস পরীক্ষার পাশাপাশি রেফারিরা শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সেশনেও অংশ নেন। সেখানে ম্যাচের বিভিন্ন পরিস্থিতি, শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত, হ্যান্ডবলের ব্যাখ্যা, পেনাল্টির ঘটনা এবং ভিএআর–সংক্রান্ত প্রোটোকল নিয়ে পড়াশোনা করা হয়। এ ছাড়া ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের আগের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করেন তারা। এতে ফিফার প্রশিক্ষকেরা ভুলগুলো চিহ্নিত করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা আরও উন্নত করতে সহায়তা করেন।
নির্দিষ্ট বিশ্বকাপ ম্যাচে ফিফা কীভাবে রেফারি নিয়োগ দেয়
চূড়ান্ত রেফারিদের তালিকা নির্ধারণের পরও ফিফা এলোমেলোভাবে তাদের ম্যাচে দায়িত্ব দেয় না। একটি বিশেষ ফিফা রেফারিং কমিটি প্রতিটি ম্যাচ মূল্যায়নের পর সংশ্লিষ্ট রেফারি দল নিয়োগ করে।
রেফারি নিয়োগের ক্ষেত্রে ফিফা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নেয়। সবার আগে দেখা হয় জাতীয়তা ও নিরপেক্ষতা। স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে—এমন কোনো দেশের রেফারিকে সংশ্লিষ্ট ম্যাচে দায়িত্ব দেওয়া হয় না। নিজের দেশের দল বা নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, এমন ম্যাচ থেকেও তাদের দূরে রাখা হয়, যাতে প্রতিটি ম্যাচ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়।
এ ছাড়া রেফারির অভিজ্ঞতাও বড় ভূমিকা রাখে। নকআউট পর্ব, সেমিফাইনাল ও ফাইনালের মতো উচ্চচাপের ম্যাচে সাধারণত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রেফারিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বড় টুর্নামেন্টে তাদের আগের পারফরম্যান্স এবং চাপ সামলানোর সক্ষমতা মূল্যায়ন করেই এসব গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পাশাপাশি দুই দলের খেলার ধরনও বিবেচনায় রাখা হয়। শারীরিক লড়াই বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে এমন রেফারিকে বেছে নেওয়া হয়, যিনি কঠোর ট্যাকল ও শৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে পারেন। আর কারিগরি ও কৌশলনির্ভর ম্যাচের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারদর্শী এবং খেলার গতি ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম রেফারিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পান রেফারিরা
যেসব কর্মকর্তা ধারাবাহিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেন, খেলোয়াড়দের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং চাপের মধ্যেও সফলভাবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের নকআউট পর্বের ম্যাচ পরিচালনার জন্য বিবেচনা করা হয়। প্রতিটি নিয়োগের আগে ফিফা ম্যাচ রিপোর্ট, ভিডিও বিশ্লেষণ এবং কারিগরি দলের মতামত পর্যালোচনা করে।
যেসব রেফারির ধারাবাহিকতায় ঘাটতি থাকে বা গুরুতর ভুল করেন, তারা কম ম্যাচের দায়িত্ব পান অথবা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের বিবেচনা থেকে বাদ পড়তে পারেন। বিশ্বকাপের ফাইনালের রেফারি হতে হলে একজন কর্মকর্তাকে অসাধারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, উচ্চমানের ফিটনেস, মানসিক স্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য দেখাতে হয়।
প্রধান রেফারির পাশাপাশি, পুরো টুর্নামেন্টে ভালো পারফরম্যান্স দেখানো সহকারী রেফারি এবং ভিএআর কর্মকর্তাদেরও ফিফা ফাইনালের জন্য নির্বাচন করে।
এসকেডি/এমএমআর








