বিশ্বকাপের ইতিহাস লেখা হয় ট্রফি হাতে তোলা অধিনায়কদের নাম। লেখা হয় গোল্ডেন বুটজয়ী স্ট্রাইকারদের গল্পে, কিংবদন্তি গোলরক্ষকদের অবিশ্বাস্য সেভে কিংবা রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়া মহাতারকাদের কীর্তিতে। কিন্তু বিশ্বকাপকে যে জিনিসটি সত্যিকারের জীবন্ত করে রাখে, সেটি অঘটন। ফুটবলের অভিধানে অঘটন মানে শুধু দুর্বল দলের জয় নয়। অঘটন মানে সেই মুহূর্ত, যখন ইতিহাস থমকে দাঁড়ায়, পরিসংখ্যান ব্যর্থ হয় আর কোটি মানুষের ধারণা এক নির্দিষ্ট ম্যাচে ভেঙে চুরমার হয়। বিশ্বকাপ যত বড় হয়েছে, ততই এমন গল্প জমা হয়েছে তার পাতায়। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই তালিকায় যোগ করেছে নতুন অধ্যায়- প্যারাগুয়ের কাছে হেরে জার্মানির বিদায়। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে কেউ টুর্নামেন্টের এই পর্যায়ে বিদায় নিতে দেখেনি। গ্রুপপর্বে ওঠানামা থাকলেও নকআউটে জার্মানি যেন অন্য এক দল- এটাই ছিল দীর্ঘদিনের চল। কিন্তু বিশ্বাসও যে কখনো কখনো সবচেয়ে ভঙ্গুর জিনিস, তারও প্রমাণ মেলে ফুটবলে। বোস্টনের রাত শুরু হয়েছিল জার্মানির প্রত্যাশা নিয়ে। আর শেষ হয় প্যারাগুয়ের উল্লাসে। টাইব্রেকারের শেষ শট জালে জড়াতেই দক্ষিণ আমেরিকার দলটি শুধু শেষ ষোলোয় ওঠেনি; বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় নকআউট অঘটনগুলোর একটিতেও নিজেদের নাম লিখিয়েছে। যে দল টুর্নামেন্টের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছিল, তারাই জার্মানিকে বাড়ির পথ দেখিয়ে দিল। ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই-অতীতের অপমান ভবিষ্যতের অলৌকিকতাকে আটকাতে পারে না। তবে জার্মানির জন্য এটি নতুন অভিজ্ঞতা নয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাদের সাফল্য যত উজ্জ্বল, তেমনি কয়েকটি পরাজয়ও। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ; চ্যাম্পিয়ন জার্মানির সামনে কোয়ার্টার ফাইনালে বুলগেরিয়া। ম্যাচের আগে খুব কম মানুষই ভাবতে পেরেছিলেন, পূর্ব ইউরোপের সেই দলটি ফুটবলের পরাশক্তিকে হারিয়ে দেবে। কিন্তু ফুটবল ভবিষ্যদ্বাণী পছন্দ করে না। পিছিয়ে পড়েও ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় বুলগেরিয়া। সেই ম্যাচের পর বিশ্ব ফুটবল বুঝেছিল, বিশ্বকাপে নামের ওজন সব সময় খেলার ফলাফলে প্রতিফলিত হয় না। আট বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপ নতুন বিস্ময় উপহার দেয়। ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান বিশ্বকাপে ইতালি ছিল অন্যতম ফেভারিট। প্রতিপক্ষ স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়া। অভিজ্ঞতা, তারকা, ঐতিহ্য- সবকিছুতেই এগিয়ে ছিল ইতালি। কিন্তু গোল্ডেন গোলের যুগে আহন জুং-হোয়ানের এক শটে বদলে যায় সব হিসাব। দক্ষিণ কোরিয়া শুধু শেষ আটে ওঠেনি; শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে পৌঁছে এশিয়ার ফুটবল ইতিহাসও বদলে দেয়।