বোমার বিকট শব্দ তখনও থামেনি, কিন্তু সেই ধ্বংসের বুকেও থমকে যায়নি প্রাণের উল্লাস।গাজার ধূলিস্যাত হয়ে যাওয়া ধূসর ধ্বংসস্তূপে যখন উড়ছিল মিশরের লাল-সাদা-কালো পতাকা, ঠিক তখন হাজার মাইল দূরে ডালাসে ইতিহাস লিখছিল মরুভূমির ফেরাউনরা। আর ম্যাচ শেষের শেষ বাঁশিটি বাজতেই সেই মহাকাব্যিক ইতিহাস উৎসর্গ করা হলো ফিলিস্তিনের রক্তস্নাত, বীর মানুষদের।

এটি আসলে কেবলই একটা ফুটবল ম্যাচ ছিল না। এটি ছিল কান্নার ভিড়ে একটুখানি হাসির, সীমাহীন আবেগের, বুকভরা সংহতির আর বেঁচে থাকার তীব্র আশার গল্প।

বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হারিয়ে এক রূপকথার জন্ম দিয়েছে মিশর। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় শেষে ম্যাচটি ১-১ সমতায় থাকলেও টাইব্রেকারে বুক চিতিয়ে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে নেয় তারা। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে নকআউট পর্বে এটাই মিশরের প্রথম ঐতিহাসিক জয়।

ম্যাচের ঠিক ১৩তম মিনিটে ইমাম আশুরের চমৎকার এক হেডে আনন্দে মেতে উঠেছিল মিশর। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে দুর্ভাগ্যজনকভাবে মোহামেদ হানির এক আত্মঘাতী গোলে সমতায় ফেরে অস্ট্রেলিয়া। এরপর ১২০ মিনিটের টানটান উত্তেজনার অবসান ঘটে সেই ভাগ্যনির্ধারণী টাইব্রেকারে। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার হ্যারি সাউতার ও লুকাস হেরিংটন স্পট-কিক থেকে গোল করতে ব্যর্থ হতেই মিশরের সামনে খুলে যায় ইতিহাসের স্বর্ণদ্বার। তবে মাঠের সেই জয়ের চেয়েও বড় এবং হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তটি আসে ম্যাচ শেষের উদযাপনে।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মিশরের কোচ বলেন, ‘আল্লাহ যেন ফিলিস্তিনিদের বিজয় দান করেন। আল্লাহ তাদের শহীদদের প্রতি রহম করুন। আমি এই ঐতিহাসিক জয় মিশরের আপামর জনগণ এবং ফিলিস্তিনের সেই সম্মানিত, লড়াকু মানুষদের উৎসর্গ করছি।’

কথাগুলো বলেই তিনি দুই হাতে মিশর ও ফিলিস্তিনের দুটি পতাকা পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে মাঠজুড়ে হাঁটতে থাকেন। আর তাঁর পেছনে পুরো দল একসঙ্গে স্রষ্টার উদ্দেশ্যে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। মাঠের সবুজ ঘাসে আঁকা সেই ছবিটি হয়তো এই বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও মানবিক এক দৃশ্য হয়ে থাকবে।আর ঠিক তখনই হাজার কিলোমিটার দূরে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার আকাশে-বাতাসে শুরু হয় অন্যরকম এক আবেগের সুনামি।

বোমায় গুঁড়িয়ে যাওয়া ভবনের কঙ্কালের পাশে, ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শহরের মাঝখানে, প্লাস্টিকের অস্থায়ী তাঁবুর সামনে একটি বড় পর্দায় চোখ রেখেছিল হাজারো মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মিশরের গোলের সঙ্গে সঙ্গে অবরুদ্ধ গাজার শিশু থেকে বৃদ্ধ, প্রতিটি মানুষ মরণজয়ী আনন্দে চিৎকার করে উঠছেন। অনেক শিশুর মলিন গালে তখন আঁকা মিশরের পতাকা। কয়েকটা মুহূর্তের জন্য হলেও যেন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, নির্মম ধ্বংস আর মৃত্যুর চিরন্তন ভয়কে হারিয়ে দিয়েছিল ফুটবলের জাদুকরী শক্তি।

গাজার বাসিন্দা তামের নাহেদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘জীবনে এই প্রথম এতটা উত্তেজনা আর আকুলতা নিয়ে বিশ্বকাপ দেখছি। আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিল হাজার হাজার মানুষকে তাদের কষ্টের তাঁবু আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর থেকে বেরিয়ে এসে একসঙ্গে ম্যাচ দেখতে দেখা। সবার মুখে কতদিন পর এক চিলতে হাসি দেখলাম। মনে হচ্ছিল, আমরা সবাই অন্তত কিছু সময়ের জন্য নিজেদের হারিয়ে যাওয়া জীবনটাকে আবার ফিরে পেয়েছি।’

ফুটবল তো আসলে কখনও কখনও শুধু ৯০ মিনিটের কোনো যান্ত্রিক খেলা নয়। কখনও কখনও এটি হয়ে ওঠে মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, দুঃসময়ের বুক চিরে আসা এক ফালি আলো, অথবা যুদ্ধের নিকষ অন্ধকারে এক টুকরো খাঁটি হাসি।

মিশরের এই জয় তাই মাঠের কোনো পরিসংখ্যান কিংবা ট্রফির লড়াই নয়। এটি এমন এক জাদুকরী রাতের গল্প, যেদিন একটি দেশের বিজয়ে নিজের সব কষ্ট ভুলে আনন্দে মেতে উঠেছিল আরেকটি রক্তাক্ত, যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতি। আর সেই কারণেই, ডালাসের সেই রাতটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ হয়ে থাকবে না, সেটি অমর হয়ে থাকবে মানবতার এক পরম আবেগময় অধ্যায় হিসেবে।