বৈশ্বিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। গত বছর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে মাত্র দশমিক ৮৯ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি সাড়ে ১০, ভারতের ৫, কম্বোডিয়ার প্রায় ১৭, পাকিস্তানের ৬ ও ইন্দোনেশিয়ার ৫ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিসটিকস: কি ইনসাইটস অ্যান্ড ট্রেন্ডস ইন ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর বৈশ্বিক পণ্য ও সেবা বাণিজ্য ৭ শতাংশ বেড়ে ৩৪ দশমিক ৬৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। আগের বছর এ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪ শতাংশ। গত বছর বিশ্বে পণ্য বাণিজ্য ৬ শতাংশ এবং সেবা বাণিজ্য ৮ শতাংশ বেড়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে সেবা খাতের হিস্যা বেড়ে হয়েছে ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০০৫ সালের পর সর্বোচ্চ।
ডব্লিউটিওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ৫৭৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের বছরের ৫৫০ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ৪ শতাংশ বেশি।

ডব্লিউটিওর তথ্য বলছে, টানা দুই বছর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরেই রয়েছে। গত বছর রপ্তানি হয়েছে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এতে প্রবৃদ্ধি হয় মাত্র দশমিক ৮৯ শতাংশ। এই হার শুধু প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় নয়, বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির চেয়েও কম। ফলে বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাজার হিস্যা কমে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৭ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ ও পাল্টা শুল্কের প্রভাবে গত চার বছর ধরে বিশ্ববাজারে চীনের তৈরি পোশাকের বাজার হিস্যা কমছে। সেই বাজার দখলের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। বরং ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বাজার হিস্যা বাড়িয়েছে।
ডব্লিউটিওর তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে চীনের বাজার হিস্যা ছিল সাড়ে ৩১ শতাংশ। গত বছর তা কমে ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমেছে। এরপরও চীন গত বছর ১৫৭ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। যদিও ২০২৪ সালের তুলনায় দেশটির রপ্তানি প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। তবু চীনের রপ্তানি এখনো বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম গত দুই বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাজার হিস্যা বাড়াচ্ছে। গত বছর দেশটি ৩৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার বা সাড়ে ১০ শতাংশ বেশি। এতে দেশটির বৈশ্বিক বাজার হিস্যা বেড়ে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ হয়েছে।
ভারতের বাজার হিস্যাও টানা দুই বছর বেড়েছে। গত বছর দেশটি ১৭ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ। ফলে বাজার হিস্যা ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে রপ্তানি কমে যাওয়ায় তুরস্কের বাজার হিস্যা কমেছে। গত বছর দেশটি ১৬ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ কম। এতে বাজার হিস্যা ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমেছে।
ফজলুল হক, সাবেক সভাপতি, বিকেএমইএবৈশ্বিক তৈরি পোশাকের বাজারে অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে দ্রুত একটি জাতীয় কর্মকৌশল চূড়ান্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনামকে মডেল হিসেবে নিতে পারে বাংলাদেশ।বিশ্বের শীর্ষ ১০ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে গত বছর সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে কম্বোডিয়ার। দেশটির ১১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে তাদের বাজার হিস্যা ১ দশমিক ৮০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
এ বিষয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার তৈরি পোশাক রপ্তানি যথাক্রমে সাড়ে ১০ ও ১৭ শতাংশ বাড়লেও বাংলাদেশের বেড়েছে ১ শতাংশের কম। এটি খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়। কম্বোডিয়া ও ভারত সরকারি সহায়তায় আগ্রাসী বিপণন করছে। ভিয়েতনামও অনেক বেশি সংগঠিত। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পেশাদারি, দক্ষতা, পণ্য বৈচিত্র্য এবং দামি পণ্য উৎপাদনে দেশটি একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তুলেছে।
ফজলুল হক আরও বলেন, বাংলাদেশ কেন প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে যাচ্ছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি। তা না হলে দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। বৈশ্বিক তৈরি পোশাকের বাজারে অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে দ্রুত একটি জাতীয় কর্মকৌশল চূড়ান্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনামকে মডেল হিসেবে নিতে পারে বাংলাদেশ।







