পাঠকের প্রশ্ন’ বিভাগে আইনগত সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন পাঠান পাঠকেরা। নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর দেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা

প্রশ্ন

আমি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। প্রশ্নটা আমার বোনকে নিয়ে। আমার মেজ বোনের বিয়ে হয় ২০১৭ সালে। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই সে তার শ্বশুরবাড়িতে শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যাচার সইতে থাকে।

শুরুতে অনেক দিন পর্যন্ত আমাদের কিছু জানায়নি। তারপর সহ্য করতে না পেরে একদিন আম্মাকে সব ঘটনা জানায়। এরপর আমার আব্বা যান বোনকে আনতে। বোনের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আব্বাকে অনেক গালমন্দ ও অপমানজনক কথা বলে। সেসব সহ্য করে আব্বা আমার বোনকে বাড়ি নিয়ে আসেন।

পরে জানতে পারি, আমার বোনের স্বামী নেশাগ্রস্ত। বোন বাড়িতে চার মাস ছিল। পরে তার শ্বশুর ও মামাশ্বশুর এসে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। শুরুর দিকে কিছুদিন স্বাভাবিক থাকলেও আগের চেয়ে বেশি জ্বালাতন করতে থাকে।

এবার আমার বড় দুলাভাইয়ের কাছে ফোনে কান্নাকাটি করে, আমাকেও ফোন করে। ১৯ মে আমি বোনের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দুলাভাইয়ের কাছে সমস্যাটা জানতে চাই।
তিনি অনেক মিথ্যা কথা বললে আমি ধরে ফেলি। এরপর আমার সঙ্গে তাঁর কথা–কাটাকাটি হয়, তিনি আমাকে মারতে তেড়ে আসেন। একপর্যায়ে বোনকে নিয়ে আমি বাড়ি চলে আসি।

তার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমার বোনের স্বামী নানা জনকে ফোন দিয়ে বাজে কথা বলছেন। আমার আব্বাকে গালাগাল করেছেন। আমাকে ফোনে হুমকি দিচ্ছেন। এ রকম পরিস্থিতিতে আইনের আশ্রয় নিতে চাইলে কী করতে হবে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ঢাকা

পরামর্শ

হ্যাঁ, আপনাদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার উপায় আছে। সুযোগ আছে পারিবারিক সহিংসতা আইনে বিচার পাওয়ার। এ ছাড়া আরও নানা আইনে বিষয়টির সুরক্ষা পেতে পারেন।

পারিবারিক সহিংসতা বলতে পারিবারিক সম্পর্ক আছে, এমন কোনো ব্যক্তি কর্তৃক পরিবারের অপর কোনো নারী বা শিশু সদস্যের ওপর শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন অথবা আর্থিক ক্ষতিকে বোঝায়।

জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (১৯৭৯) ও শিশু অধিকার সনদে (১৯৮৯) স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে এবং বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত নারী ও শিশুর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা থেকে নারী ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন (২০১০) প্রণীত হয়েছে।

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইনে (২০১০) প্রথমবারের মতো পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) বিধিমালা প্রণীত হয়েছে।

একজন শিশু বা নারী, যিনি পারিবারিক সম্পর্ক থাকার কারণে পরিবারের অপর কোনো সদস্যের মাধ্যমে সহিংসতার শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন বা ঝুঁকির মধ্যে আছেন, তিনি দেশের আইন অনুযায়ী প্রতিকার চাইতে পারবেন।

আপনার বোনের স্বামী আপনার বোনের ওপর শারীরিক, মানসিক নির্যাতন করছেন। তাঁর এ ধরনের আচরণ পারিবারিক সহিংসতার অন্তর্ভুক্ত। আইনের অধীনে আপনার বোন নিম্নলিখিত প্রতিকারগুলো চাইতে পারবেন—
ক. এই আইন অনুসারে প্রতিকার পাওয়ার অধিকার
খ. চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ
গ. প্রয়োগকারী কর্মকর্তার কাছ থেকে সেবা পাওয়ার সুযোগ
ঘ. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন (২০০০) অনুসারে বিনা খরচে আইনগত পরামর্শ ও সহায়তা প্রাপ্তি।

আপনার বোনের পক্ষে কোনো প্রয়োগকারী কর্মকর্তা, সেবা প্রদানকারী বা অন্য কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন প্রতিকার পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবেদন প্রাপ্তির ৭ দিনের মধ্যে আদালত আবেদন শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করবেন।

আরও যেসব প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইনের অধীনে একজন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নিম্নবর্ণিত প্রতিকার পেতে পারেন—
অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা আদেশ: এ বিষয়ে আইনের ১৩ ধারায় বলা হয়েছে। আদালত সন্তুষ্ট হলে প্রতিপক্ষ বা তার প্ররোচনায় পারিবারিক সহিংসতা ঘটলে বা ঘটার আশঙ্কা থাকলে অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা আদেশ দিতে পারবেন।

সুরক্ষা আদেশ: সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও প্রতিপক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে আদালত যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে পারিবারিক সহিংসতা ঘটেছে বা ঘটার আশঙ্কা আছে; তাহলে সুরক্ষা আদেশ দিতে পারবেন। সেই সঙ্গে প্রতিপক্ষকে পারিবারিক সহিংসতামূলক কোনো কাজ, পারিবারিক সহিংসতামূলক কাজে সহায়তা করা বা প্ররোচনা বা সুরক্ষা আদেশে উল্লেখিত অন্য যেকোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকার আদেশ দিতে পারবেন।

বসবাস আদেশ: এই আইনের ১৫ ধারায় বসবাসের আদেশ নিয়েও বলা আছে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বসবাস আদেশ দিতে পারবেন। যেমন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যেখানে বসবাস করেন, সেখানে প্রতিপক্ষকে বসবাস বা যাতায়াত করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বাসার কোনো অংশ বেদখল বা তার ভোগদখলে কোনো রকম বাধা সৃষ্টি থেকে বিরত রাখা ইত্যাদি।

আদালত যদি মনে করেন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তার সন্তানের জন্য নিরাপদ নয়, তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে আদালত প্রয়োগকারী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলের ব্যবস্থা করবেন, এ ছাড়া প্রতিপক্ষকে জামানতসহ বা জামানত ছাড়া মুচলেকা সম্পাদনের আদেশ দিতে পারবেন।

ক্ষতিপূরণ আদেশ: আইনের ১৬ ধারায় ক্ষতিপূরণের আদেশের কথা বলা হয়েছে। আদালত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি এবং তার সন্তানের ভরণপোষণের জন্য তিনি যে ধরনের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত, সে রকম জীবনযাত্রার জন্য পর্যাপ্ত ও যুক্তিযুক্ত অর্থ প্রদানের জন্য প্রতিপক্ষকে আদেশ দিতে পারবেন। এ ছাড়া আদালত উপযুক্ত মনে করলে এককালীন বা মাসিক ভরণপোষণ পরিশোধের আদেশ দিতে পারবেন।

নিরাপদ হেফাজত আদেশ: আদালত উক্ত আইনের অধীনে আবেদন বিবেচনার যেকোনো পর্যায়ে আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সন্তানকে তার কাছে অথবা তার পক্ষে অন্য কোনো আবেদনকারীর জিম্মায় অস্থায়ীভাবে সাময়িক নিরাপদ হেফাজতে রাখার আদেশ দিতে পারবেন।

তাই আপনার বোন চাইলে যেকোনো থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা বা সরাসরি আদালতের কাছে সুরক্ষার জন্য আবেদন করতে পারবেন।

এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য। এই আইনের ৩০ ধারায় শাস্তির বিধান সম্পর্কে বলা আছে। তবে আদালত চাইলে প্রতিপক্ষকে ধারা ৩০–এর অধীন শাস্তি না দিয়ে ৩১ ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের সমাজকল্যাণমূলক কাজে সেবা প্রদানের জন্য আদেশ দিতে পারবেন। এবং বিষয়টি তত্ত্বাবধানের জন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকে দায়িত্ব প্রদান করতে পারবেন।

এই আইনের বিশেষ দিক হচ্ছে, আইনে শাস্তির পাশাপাশি সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আছে। ফলে পুনরায় দুই পক্ষের মধ্যে আপস নিষ্পত্তি করা সহজ হয়। এ ছাড়া দণ্ডবিধির ধারা ৩২৩–এ স্বেচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করার শাস্তির কথা বলা হয়েছে; কেউ যদি স্বেচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করে, তার শাস্তি হবে ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।

আপনারা চাইলে এসব আইনের অধীনে প্রতিকার চাইতে পারবেন।

এক বছর সংসার করেই বিচ্ছেদ চাইছেন স্বামী, আইনি প্রক্রিয়া জানুন

প্রশ্ন পাঠানোর ঠিকানা

পাঠকের প্রশ্ন পাঠানো যাবে ই–মেইলে, ডাকে এবং প্র অধুনার ফেসবুক পেজের ইনবক্সে। ই–মেইল ঠিকানা[email protected] (সাবজেক্ট হিসেবে লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’)

ডাক ঠিকানা : প্র অধুনা, প্রথম আলো, প্রগতি ইনস্যুরেন্স ভবন, ২০–২১ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫। (খামের ওপর লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’)

ফেসবুক পেজ: fb.com/Adhuna.PA

আমার ৬৬ বছরের বাবা ১৮ বছরের এক তরুণীর প্রেমে পড়েছেন