ব্রিটেনে প্রায় চার দশক ধরে বসবাসকারী আলি হায়দার বলেন, এখন এমন দিনও আসে যখন তিনি নিজের বাদামি গায়ের রং লুকিয়ে রাখতে চান। তিনি যে শহরে থাকেন, সেই সাউদাম্পটন শহরে সহিংস বিক্ষোভ হয়েছিল। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল এক ব্রিটিশ-বংশোদ্ভূত শিখ ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। ওই ব্যক্তি এক শ্বেতাঙ্গের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী হামলার মিথ্যা অভিযোগ এনেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে নিজেই হত্যাচেষ্টার দায়ে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হন।
গতকাল মঙ্গলবার বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য ওঠে এসেছে। এতে বলা হয়, গত ১ জুন ওই ব্যক্তির সাজা ঘোষণার পাশাপাশি মৃত্যুর মুখে থাকা সেই শ্বেতাঙ্গ ভুক্তভোগীকে পুলিশের হাতকড়া পরানোর একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওটি তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
বেলফাস্টে সুদানি অভিবাসীর হামলায় এক শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি একাধিকবার ছুরিকাঘাতের শিকার হয়ে একটি চোখ হারানোর ঘটনার এক সপ্তাহ পর মুখোশধারী দুর্বৃত্তের দল অভিবাসীদের খুঁজে বের করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালায়। এ ধরনের ঘটনা অতীতে খুব একটা না ঘটলেও এখন ডানপন্থি কর্মী ও রাজনীতিবিদরা এটা করছেন। অপরাধের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তারা জাতীয় পরিচয় ও অভিবাসন নিয়ে সমাজে বিরাজমান চাপা উত্তেজনাকে উসকে দিচ্ছেন। ফলে, অনেক জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য একসময়ের নিরাপদ ও স্থিতিশীল আবাসস্থল ব্রিটেন এখন বৈরী ও প্রতিকূল হয়ে উঠেছে। ৪৪ বছরের হায়দার মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে অ-শ্বেতাঙ্গ বা ভিন্ন বর্ণের যে কারও জন্যই ঝুঁকি রয়েছে। আমরা ঐতিহ্য ও পরিচয়কে যতই ভালোবাসি না কেন, মাঝেমধ্যে মনে হয়-ইশ, যদি আমরা তা লুকিয়ে রাখতে পারতাম!’
সম্প্রতি অভিবাসন নিয়ে মনোভাব কঠোর হয়েছে : মাইগ্রেশন অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে ইউরোপের অধিকাংশ দেশের তুলনায় ব্রিটিশরা অভিবাসনের বিষয়ে অধিকতর ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করত। তবে একাধিক জনমত জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে-২০২২ সালের পর থেকে এ মনোভাব কঠোর হয়েছে। জরিপগুলোতে সাধারণত দেখা গেছে-বয়স্ক বা ডানপন্থি মতাদর্শের মানুষের তুলনায় তরুণ ও বামপন্থি ভোটাররা অভিবাসনের প্রতি বেশি ইতিবাচক।
রয়টার্স নীতি-নির্ধারণী বিশেষজ্ঞ ও ১০টি ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে কথা বলেছে। ইউনিয়নগুলোর সদস্যরা বর্ণবাদী আচরণের ঘটনা বৃদ্ধির কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে কোনো কোনো রোগীর নার্সের জাতিসত্তার কারণে চিকিৎসা সেবা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো, কর্মক্ষেত্রে বর্ণবাদী মন্তব্যের আধিক্য এবং অভিবাসী কর্মীদের বর্ণবাদের শিকার হওয়ার অভিযোগ। রয়্যাল কলেজ অব নার্সিং জানিয়েছে, ২০২২ সাল থেকে বর্ণবৈষম্যের শিকার হওয়া কর্মীর সংখ্যা ৫৫ শতাংশ বেড়েছে।
ইউনিয়ন নেতা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার ও অন্যান্য রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর প্রকাশ্য বর্ণবাদের জন্য এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে এ ধরনের আচরণকে একপ্রকার প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। সাউদাম্পটনের ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর পপুলিস্ট বা জনতুষ্টিবাদী রাজনৈতিক নেতা নাইজেল ফারাজ মন্তব্য করেন-ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলো শ্বেতাঙ্গদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এ অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ফারাজ বিভেদ উসকে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি মর্মান্তিক ঘটনাকে পুঁজি করার চেষ্টা করছেন। ভাড়ায় গাড়ি চালন আলি হায়দার। তিনি জানান, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে বর্ণবাদের শিকার হওয়ার ঘটনা কমে এসেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) গণভোটের সময় অভিবাসন ইস্যুটি প্রাধান্য পায়। তখন তা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।








