অরলান্দো গিলের শুরু অভাব দিয়ে। ছোট শহরের ছেলে। যার কাছে ফুটবল ছিল আনন্দের চেয়ে বেশি প্রয়োজন, স্বপ্নের চেয়ে বেশি দায়। ২০০০ সালের ১১ জুন প্যারাগুয়ের সান লরেঞ্জো শহরে জন্ম অরলান্দো ড্যানিয়েল গিল নোলদিনের। প্রায় দুই মিটার উচ্চতার এই গোলরক্ষককে দেখে মনে হতে পারে, সাফল্য তার জন্য আগেই লেখা ছিল। বাস্তব ছিল ভিন্ন। জন্মের পর থেকে জীবন তাকে সহজ রাস্তা দেয়নি।
সংসারে ছিল টানাপোড়েন। এমন দিনও গেছে, যখন ফুটবল আর পরিবারের প্রয়োজনের মধ্যে বেছে নিতে হয়েছে একটিকে। গিলের এক সাক্ষাৎকারে উঠে আসে কষ্টের স্মৃতি, ‘পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করতে আমাকে দেওয়া ক্লাবের পোশাক, ফুটবল বুট, এমনকি বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের জার্সিও বিক্রি করতে হয়েছিল।’ অনেকে স্বপ্নের জন্য পরিবার ছেড়ে যায়। গিল পরিবারের জন্য নিজের স্বপ্নের অংশ বিক্রি করেছিলেন। তবু ফুটবল ছাড়েননি।
শৈশবের প্রথম ফুটবল-পাঠ শুরু স্থানীয় ক্লাব তেরো দে জুনিওতে। এরপর পথ গিয়ে মিশেছে স্পোর্তিভো সান লরেঞ্জোর বয়সভিত্তিক কাঠামোয়। শৈশব থেকে তার মধ্যে ছিল স্থিরভাব। গোলকিপারের জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি বুঝতেন, একটি সেভ গোলের চেয়েও বড়। কৈশোরের সময় ছিল অপেক্ষার। বন্ধুরা এগিয়ে গেছে। কেউ কেউ ফুটবল ছেড়েছে। গিল থেকে গেছেন। বেঞ্চে বসেছেন। আবার ফিরে এসেছেন। গোলকিপারের জীবনে এমনিতে সুযোগ কম, ভুলের মূল্য বেশি।
২০১৯ সালে গিলের পেশাদার পর্যায়ে অভিষেক নিজ শহরের ক্লাব স্পোর্তিভো সান লরেঞ্জোর হয়ে। একই সময়ে তিনি ডাক পান প্যারাগুয়ের অনূর্ধ্ব-২০ দলে।
তারপর আসে ক্যারিয়ারের বড় বাঁক। ২০২৩ সালের শেষ দিকে তিনি যোগ দেন আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান লরেঞ্জো দে আলমাগ্রোয়। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, নতুন চাপ। এক মিটার ৯৮ সেন্টিমিটার উচ্চতার গিলের আসল শক্তি অপেক্ষা করার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়, চাপের মুখে শান্ত থাকা। ওয়ান টু ওয়ান, কর্নার, পেনালটিতে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন নির্ভরতার আরেক নাম।
২০২৫ সালে প্রথম প্যারাগুয়ে দলে ডাক পেয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে পেরুর বিপক্ষে অভিষেক। সেই ম্যাচে প্যারাগুয়ে জেতে ১-০ গোলে। বিশ্বকাপের শুরুতে আলো ছিল অন্যদের দিকে। গ্রুপপর্বে গিল একের পর এক বল ঠেকান। ম্যাচের পর ম্যাচ প্যারাগুয়েকে বাঁচিয়ে রাখেন। আলোচনায় উঠে আসেন।
জার্মানির বিপক্ষে ইতিহাস। ১২০ মিনিট ধরে আক্রমণের পর আক্রমণ। কিন্তু গিল বদলাননি। টাইব্রেকারে ঠেকিয়ে দিলেন পেনালটি। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর উল্লাসে ভেসেছে প্যারাগুয়ে। আর একজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন নীরবে।
প্যারাগুয়ের কিংবদন্তি গোলকিপার হোসে লুইস চিলাভের্ত একসময় বলেছিলেন, গিল খুব কম কথা বলেন। গিলের উত্তর ছিল অন্যরকম। তিনি কথা বলেননি। তিনি বল ঠেকিয়েছেন।
অরলান্দো গিল একদিন পরিবারের জন্য নিজের বুট বিক্রি করেছিলেন। আজ সেই হাতেই ধরে রেখেছেন একটি দেশের স্বপ্ন। সব নায়ক গোল করেন না। কিছু নায়ক শুধু গোল হতে দেন না।








