ইরান যুদ্ধ থেকে সহজে বের হতে পারছেন না যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুই দেশের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হওয়ায় যুদ্ধ বন্ধের সব চেষ্টা আবার বাধায় পড়েছে। ট্রাম্পের সামনে এখন সংঘাত নিরসনের ভালো কোনো বিকল্প নেই। ভেস্তে গেছে দুই পক্ষের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিও।

গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলার জবাবে সম্প্রতি ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবর্ষণ করে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। এ ঘটনার পর ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিটি এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে গতকাল বুধবার ইরানে আবারও হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা চুক্তি হয়েছিল। চুক্তি সইয়ের তিন সপ্তাহ পার না হতেই শুরু হলো এ নতুন সংঘাত ও উত্তেজনা। ফলে ট্রাম্পের জন্য ইরান যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বের হওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ল। পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির সম্ভাবনাও এখন বড় চ্যালেঞ্জে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা চুক্তি হয়েছিল। চুক্তি সইয়ের তিন সপ্তাহ পার হতে না হতেই আবার পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হলো।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের সামনে এখন খুব বেশি বিকল্প খোলা নেই। যেসব পথ খোলা আছে, তার প্রায় সবই ঝুঁকিপূর্ণ।

পাল্টাপাল্টি হামলা ছাড়া বড় কোনো সংঘাত হলে আবারও পুরোদমে যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। যদিও গতকাল ট্রাম্প দাবি করেছেন, এ উত্তেজনা শিগগিরই শেষ হবে। তবে নতুন হামলার কারণে এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে গেছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখন সামান্য পিছু হটলেও ইরান সেই সুযোগ কাজে লাগাবে। তারা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে যখন-তখন নিজেদের আধিপত্য প্রদর্শন করার সুযোগ পাবে।

ট্রাম্প হয়তো ভাবছেন, বোমা মেরে ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে আনা যাবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করাই ছিল তাঁর এ যুদ্ধের মূল লক্ষ্য। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প যেভাবে চাইছেন, ইরান সেভাবে বড় কোনো ছাড় দেবে না।

ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় প্রশাসনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প এখন নিজেকে একটি বাক্সে (ফাঁদের) বন্দী করে ফেলেছেন। সামরিক বা কূটনৈতিক কোনো পথেই এখন ইরানের কাছ থেকে ট্রাম্পের বেশি কিছু অর্জন করার সম্ভাবনা নেই।’

এ বিষয়ে জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

লরা ব্লুমেনফেল্ড, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতার ইতিহাস ট্রাম্পকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ট্রাম্প ভালো করেই জানেন, এখন তাঁর মূল মনোযোগ অর্থনীতিতে দেওয়া দরকার।

চাপের মুখে ট্রাম্প

নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের অন্তর্বর্তী নির্বাচন। এর আগেই যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য চাপের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। এ যুদ্ধে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও অনেক কমে গেছে।

গত ২৩ জুনের রয়টার্স/ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে ৩৪ শতাংশে নেমেছে, যা তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সর্বনিম্ন। ফলে কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার আশা ফিকে হয়ে আসছে।

চলতি সপ্তাহে তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটল। সম্মেলনে ট্রাম্প অংশ নিয়েছেন।

গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে এই পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির আশা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এ যুদ্ধ শুরু করেছিল।

সমঝোতা স্মারকে চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিন সময় নেওয়া হয়েছিল। তবে বেশির ভাগ বিশ্লেষকের মতে, এ সময়ের মধ্যে কোনো পূর্ণাঙ্গ সমাধান আসবে। কারণ, সমঝোতা স্মারকে জটিল বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আলোচনায় এ পর্যন্ত তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি। এমনকি পরের ধাপের আলোচনা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের অন্তর্বর্তী নির্বাচন। এর আগেই যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য চাপের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। যুদ্ধে ইরানে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও অনেক কমেছে।

যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেশটির ওপর অব্যাহত চাপ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির জন্য ইরানকে দেওয়া বিশেষ ছাড় বাতিল করেছে ওয়াশিংটন। অথচ অন্তর্বর্তী চুক্তিতে এটিই ছিল ইরানের সবচেয়ে বড় অর্জন।

এরপরও ইরানের শাসকেরা নতুন হামলা সহ্য করতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। কিছু বিশ্লেষক বলছেন, চলতি সপ্তাহের পাল্টাপাল্টি হামলার উদ্দেশ্য হতে পারে, ভবিষ্যৎ আলোচনার টেবিলে দুই পক্ষের নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করা।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ বলেন, আগামী দিনেও এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।

বর্তমানে ওয়াশিংটনের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের এই কর্মকর্তা বলেন, পরিস্থিতি হয়তো আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে না। তবে বর্তমান অবস্থা হবে একধরনের নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা। অর্থাৎ স্থায়ী কোনো সমাধান ছাড়াই বারবার সহিংসতা ঘটবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি বিদেশে যুদ্ধ এড়িয়ে চলবেন এবং দেশের অর্থনীতিতে মনোযোগ দেবেন।

ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল জয় বলেও প্রচার করছেন। অন্যদিকে ইরানও ঠিক একই দাবি করছে।

তবে বেশির ভাগ বিশ্লেষক একমত, ট্রাম্প একসময় ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ চেয়েছিলেন। কিন্তু এ যুদ্ধ নিয়ে বারবার নিজের অবস্থান বদলানোয় এখন তিনি নিজেই বাধার মুখে পড়েছেন।

অ্যারন ডেভিড মিলার, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন মধ্যস্থতাকারীট্রাম্প এখন নিজেকে একটি বাক্সে (ফাঁদের) বন্দী করে ফেলেছেন। সামরিক বা কূটনৈতিক কোনো পথেই এখন ইরানের কাছ থেকে ট্রাম্পের বেশি কিছু অর্জন করার সম্ভাবনা নেই।

হরমুজ প্রণালি

দুই দেশের সাম্প্রতিক এ সংঘাতের মূল কারণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। এই জলপথ নিয়ে অন্তর্বর্তী চুক্তির ব্যাখ্যা দুই পক্ষ দুইভাবে দিচ্ছে। যুদ্ধের সময় ইরান দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

ইরান মনে করে, এ নৌপথ পরিচালনার দায়িত্বে ভবিষ্যতে তাদের বড় ভূমিকা থাকবে। এমনকি তারা সেখান দিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে ফি আদায়ের পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে ট্রাম্প ও তাঁর আরব মিত্ররা চান, এ পথ সবার জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ থাকুক।

দুই দেশের সাম্প্রতিক এই সংঘাতের মূল কারণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। এই জলপথ নিয়ে অন্তর্বর্তী চুক্তির ব্যাখ্যা দুই পক্ষ দুইভাবে দিচ্ছে। যুদ্ধের সময় ইরান দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক জন অলটারম্যান বলেন, ‘ইরানিরা বুঝতে পেরেছেন, ট্রাম্প একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়াতে চান না। আর তাঁর আরব মিত্রদেশগুলোও এখন স্বাভাবিক পরিস্থিতি চাইছে।’

অলটারম্যান আরও বলেন, ‘ট্রাম্প হয়তো কয়েক দিন যুদ্ধ করবেন। কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত করতে আরব দেশগুলোই একপর্যায়ে ট্রাম্পকে চাপ দেবে। আর এ বিষয়ই ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় বাজি।’

ইরানে আজ রাতেও হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, বন্দর আব্বাস–চাবাহারে বিস্ফোরণ

যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের অন্তর্বর্তী নির্বাচনও ট্রাম্পের জন্য বড় চিন্তার কারণ। যুদ্ধের কারণে যদি জ্বালানি তেলের দাম অনেক বেড়ে যায়, তবে ভোটাররা রিপাবলিকান পার্টির বিপক্ষে চলে যেতে পারেন।

জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লরা ব্লুমেনফেল্ড বলেন, ‘সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতার ইতিহাস ট্রাম্পকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ট্রাম্প ভালো করেই জানেন, এখন তাঁর মূল মনোযোগ অর্থনীতিতে দেওয়া দরকার।’

ট্রাম্প নিজেই একবার বলেছিলেন, এ যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তাঁর অবস্থাও হুভারের মতো হতে পারে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেট ডিপ্রেশন বা মহামন্দার সময় ক্ষমতায় ছিলেন।

ইরানে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, সমঝোতা ভঙ্গের অভিযোগ তেহরানের