সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের চার দফা দাবি থেকে সরে ২০২৪ সালের ৮ জুলাই এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। তারা দাবি করে, সব গ্রেডে বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে এনে সংসদে আইন পাশ করতে হবে। এক দফার এ দাবিতে কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীরা ওইদিনও ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির ঘোষণা করে।

এর একদিন আগে বিকালে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় নামেন আন্দোলনকারীরা। রাজধানীর শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব, নীলক্ষেত, বাংলামোটর, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের মোড়ে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীরা রাজধানীর আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বিক্ষোভ করেন। মোড়ে মোড়ে অবরোধের কারণে যানজটে এক রকম স্থবির হয়ে পড়ে পুরো ঢাকা। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস হওয়ায় নগর ভোগান্তি মাত্রা ছাড়ায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনে বসে থাকতে দেখা গেছে অফিস ছুটির পর ঘরমুখো নগরবাসীকে। বাধ্য হয়ে অনেকে হেঁটে গন্তব্যে রওয়ানা দেন।

এদিকে কোটাবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে ৪ ঘণ্টা ধরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বরিশাল-পটুয়াখালী সড়ক অবরোধ করেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। ময়মনসিংহে শিক্ষার্থীরা রেলপথ অবরোধ করেন। সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

এদিকে একদিন আগে অর্থাৎ ৭ জুলাই সন্ধ্যায় রাজধানীতে সরকারের তরফ থেকে আলোচনার জন্য কোটা আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র হাসনাত আবদুল্লাহ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের নাহিদ ইসলাম ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সারজিস আলমকে শাহবাগ থানায় ডেকে নেওয়া হয়। প্রায় ৩০ মিনিট আলোচনা শেষে তারা সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার কিছু সময় পরে অবরোধস্থলে ফিরে এসে হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, প্রধানমন্ত্রীর একদল প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করতে তাদের ডেকে নেওয়া হয়। আলোচনার বিষয়ে আর কিছু বিস্তারিত জানাননি তিনি। তবে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নাহিদ ইসলাম বলেন, কোনো আলাপ বা গোলটেবিল হবে না। আমরা অনেক আলাপ করেছি, আলাপের দিন শেষ হয়ে গেছে। বিনিময়ে আমরা পেয়েছি প্রহসন। এবার আর প্রহসন মেনে নেওয়া হবে না। আমাদের বলা হচ্ছে, এটা সাবজুডিশিয়ারি ম্যাটার। নির্বাহী বিভাগের কাছে জানতে চাই, কেন পরিপত্র বাতিল হলো, কেন তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণিতে কোটা বাতিল হয়নি। সরকারের কাছে নতুন পরিপত্র জারির সুযোগ রয়েছে। সব গ্রেডে কোটার সংস্কার করতে হবে।

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম রাত ৮টার দিকে অনির্দিষ্টকাল ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে ছাত্র ধর্মঘট অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। সরকারকে উদ্দেশ করে নাহিদ বলেন, ‘আমাদের দাবি মেনে নেন। না হয় ১০০ শতাংশ কোটা দিয়ে দেন। ঘোষণা করে দেন এটা কোটাধারীদের দেশ।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আজ কাওরান বাজার পর্যন্ত গিয়েছি, কালকে ফার্মগেট পেরিয়ে যাবে আমাদের ব্লকেড। সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে জড়ো হয়ে শাহবাগে ব্লকেড কর্মসূচি পালন করব। সারা দেশের সব স্থানে শিক্ষার্থীরা ব্লকেড করবেন।’

নাহিদ বলেন, ‘আমরা সংবিধান স্বীকৃত বিষয়ে কথা বলছি। সংবিধানে সমতার কথা বলা আছে।’ কোটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, ‘আমাদের আদালত দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা সংবিধান স্বীকৃত বিষয়ে আন্দোলন করছি।’

আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লেখিত অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে এনে সংসদে আইন পাশ করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা নাতিপুতি-পোষ্য কোটাকে অযৌক্তিক কোটা মনে করছি। দাবি মেনে নিলে আজকেই আমরা পড়ার টেবিলে ফিরে যাব।

অন্যদিকে কোটা আন্দোলনের সপ্তম দিনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সরকারি চাকরিতে কোটার বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি করা উচিত। তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে এভাবে আন্দোলন করা, এটা তো সাবজুডিস। কারণ আমরা সরকারে থেকে এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে পারি না। কারণ হাইকোর্ট রায় দিলে সেটা হাইকোর্ট থেকেই আবার আসতে হবে।’

ফলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর সীমানা ছাড়িয়ে পুরো দেশে। পথে পথে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। বলা যায় পুরো পরিস্থিতি ছিল শিক্ষার্থীদের দখলে।