পোড়া গোয়ালঘরের সামনে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলেন দিনমজুর বিবিদাস চন্দ্র রায়। চোখের সামনে পড়ে আছে আগুনে ঝলসে যাওয়া চারটি গরুর নিথর দেহ। এই চারটি গরুই ছিল তাঁর সংসারের সবচেয়ে বড় সম্বল, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। এক রাতের আগুনে সেই স্বপ্ন এখন ছাই।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের আলেকিসামত গ্রামের বাসিন্দা বিবিদাস চন্দ্র রায় (৩৫) দিনমজুরি করে সংসার চালান। কয়েক বছর আগে একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কষ্ট করে দুটি গরু কিনেছিলেন। পরে সেই গরু থেকে জন্ম নেয় আরও দুটি বাছুর। চারটি গরু বড় হলে সেগুলো বিক্রি করে কিছু জমি বন্ধক নিয়ে চাষাবাদ করবেন—এমনই ছিল তাঁর পরিকল্পনা। কিন্তু শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাতের আগুনে মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় সেই স্বপ্ন।
স্থানীয়দের ধারণা, রাত ১০টার দিকে মশা তাড়ানোর জন্য গোয়ালঘরে জ্বালানো একটি কয়েল থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনে গোয়ালঘরে থাকা চারটি গরুই পুড়ে মারা যায়। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে বসতঘরেও। ঘরের আসবাব, কাপড়চোপড়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ প্রায় সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। প্রাণে বাঁচলেও পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই রক্ষা করতে পারেনি পরিবারটি।
শনিবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয়রা আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া গরুগুলো মাটি চাপা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশে বসে আগুনে পুড়ে যাওয়া কাপড়চোপড় বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছিলেন বিবিদাসের স্ত্রী।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ভগবান, হামাগো কষ্টের ফসল তুই এমন করি কাড়ি নিলু। তুই কি চাইস না গরিব মানুষ একটুখানি ভালো করে খাইয়া বাঁচুক? তিন বেলা দুই মুঠ ভাত খাইয়া বাঁচতে চাওয়াটাই কি অপরাধ?’
স্থানীয় বাসিন্দা দীপক বলেন, ‘আমরা বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে টেলিভিশন দেখছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে দৌড়ে এসে দেখি আগুন। সবাই মিলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করি এবং ফায়ার সার্ভিসে খবর দিই। কিন্তু বাড়ির পথে বাঁশঝাড় থাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে কিছুটা দেরি হয়। ততক্ষণে চারটি গরুই মারা যায়। পরে আগুন বসতঘরেও ছড়িয়ে পড়ে।’
কোলকোন্দ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বিবিদাস অনেক কষ্ট করে এই সম্পদটুকু গড়ে তুলেছিলেন। এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেছে। এখন পরিবারটি একেবারেই নিঃস্ব।’
গঙ্গাচড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চলতি দায়িত্বে থাকা স্টেশনমাস্টার আব্দুল বারী বলেন, ‘খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। তবে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা থাকায় পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। আগুনে চারটি গরু ও বসতঘরের মালামাল পুড়ে প্রায় চার লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রকৌশলী আতাউর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে দুই বস্তা শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা প্রদানের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।








