একটানা দুই দিনের অতি ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম জেলায় গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। ভারী বর্ষণে দেয়াল ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম নগর, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি ও কক্সবাজারে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ। তলিয়ে গেছে বহু এলাকার অভ্যন্তরীণ গ্রামীণ সড়ক।

অতি ভারী বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারেনি তিনটি ফ্লাইট। রেললাইনের ওপর পানি জমে থাকায় প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের ষোলোশহরে আটকে পড়ে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন।

দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকার। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে জেলার উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় ১৯৩টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। প্লাবিত হয়েছে সদর উপজেলা, টেকনাফ, রামু , মহেশখালী, চকরিয়া ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। এসব এলাকার শতাধিক গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে।

কক্সবাজারে নতুন করে পাহাড়ধস

গতকাল সোমবার কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ৮ জন, জেলা সদরে ১ জন, পেকুয়ায় ১ জনসহ মোট ১০ জনের মৃত্যুর পর আজ মঙ্গলবার আবারও পাহাড় ও দেয়াল ধসে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আজ বিকাল তিনটার দিকে দেয়াল চাপা পড়ে জেলার উখিয়ায় মো. মানিক (২৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে সকালে মহেশখালীতে বৃষ্টির জমে থাকা পানিতে পড়ে রুমাইসা খানম নামের ২১ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বেলা দুইটার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর সৈকতের বিপরীতে বড়ছড়া পাহাড়ের হাজিঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে লিমা আক্তার নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী জসিম উদ্দিনও আহত হয়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানান কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী।

জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, গত দুই দিনের বর্ষণে উখিয়ার আশ্রয়শিবিরগুলোর বিভিন্ন পাহাড়ে ১৯৩টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। আশ্রয়শিবিরের পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

সড়কে গাছ ভেঙে পড়েছে। আজ সকালে নগরের উত্তর কাট্টলীর ঈশান মহাজন সড়কে

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, পাহাড়ে গড়া উখিয়ার ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ নম্বর ক্যাম্প (আশ্রয়শিবির) ভূমিধস ও দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে এসব আশ্রয়শিবিরে অতি ঝুঁকিতে থাকা অন্তত ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে পাহাড়ের ঝুঁকি থেকে ৪৮৯ পরিবার সরিয়ে আনা হয়েছে।

পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার পৌরসভার বিভিন্ন এলাকাতেও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। জেলা শহরের, হোটেল-মোটেল জোন, কলাতলী, সুগন্ধা, বাজারঘাটা, কালুর দোকান, তারাবানিয়াছড়া, আলীরজাহাল, বাস টার্মিনাল ও বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া গতকাল সকালে কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী-কৈয়ারবিল সড়কের একটি জরাজীর্ণ সেতু ধসে পড়েছে। এতে দুই এলাকার মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল এবং বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বাড়ায় রামু ও চকরিয়ার অন্তত ১৪টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েক শ ঘরবাড়ি। এ ছাড়া কক্সবাজার পৌরসভা, টেকনাফ, উখিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, ঈদগাঁও ও কুতুবদিয়ার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে প্লাবিত হয়েছে। টেকনাফে উপজেলার হ্নীলা, হোয়াইক্যং, সদর, সাবরাং ও বাহারছড়া ইউনিয়নের অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ায় পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী রয়েছে।

দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকার। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে জেলার উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় ১৯৩টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। প্লাবিত হয়েছে সদর উপজেলা, টেকনাফ, রামু , মহেশখালী, চকরিয়া ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। এসব এলাকার শতাধিক গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে।

বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরের কারণে টেকনাফের সঙ্গে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই কারণে দ্বীপের দুই এইচএসসি পরীক্ষার্থী গতকাল টেকনাফ এসে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। তাঁদের আবার পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ ছাড়া পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য কোস্টগার্ডের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, আগামী কয়েক দিন আরও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। তাই পাহাড়ধসে আর কোনো প্রাণহানি যেন না ঘটে, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

চকরিয়া ও পেকুয়ার ৪০ গ্রাম প্লাবিত

টানা বৃষ্টির ফলে পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার অন্তত ৪০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

আজ দুপুর থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সরেজমিন দেখা যায়, চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মাহমুদনগর, সিকদারপাড়া, শান্তিবাজার, বিবিরখিল, গোবিন্দপুর; হারবাং ইউনিয়নের দক্ষিণ পহরচাঁদা, রাখাইনপাড়া, নোয়াপাড়া, বাইঘ্যারপাড়া, গোদারপাড়া, কালা সিকদারপাড়া; কৈয়ারবিল ইউনিয়নের খিলছাদক, খোঁজাখালী, ছোঁয়ালিয়াপাড়া; খুটাখালী ইউনিয়নের গর্জনতলী, সেগুনবাগিচা, নয়াপাড়া; সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের মানিকপুর উত্তরপাড়া, জমিদারপাড়া, দক্ষিণ সুরাজপুর, হিন্দুপাড়া; ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ছাইরাখালী; কাকারা ইউনিয়নের শাকের মোহাম্মদ চর, হাজিয়ান, লোটনী, নোয়াপাড়া, পূর্ব পাড়া; লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের উত্তর লক্ষ্যারচর, বার আউলিয়া নগর, রোস্তম আলী চৌধুরীপাড়া পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার কিছু অংশে মাতামুহুরী নদীর বাঁধ উপচে পানি ঢুকেছে। আবার কিছু এলাকায় পাহাড়ি ঢলের পানি বের হতে না পেরে ডুবে গেছে। বরইতলী ইউনিয়নের বানিয়ারছড়া থেকে পহরচাঁদা সড়কের অন্তত দুই কিলোমিটার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

ভারী বর্ষণে ডুবে গেছে অক্সিজেন - হাটহাজারীর কুয়াইশ সড়ক। কোমর পানিতে চলছে গাড়ি। আজ বিকেলে সড়কের অনন্যা আবাসিক এলাকায়

কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাউসার জান্নাত কুমকুম প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল দুপুর থেকে এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। এ ছাড়া অন্তত পাঁচটি গ্রাম ডুবে গেছে। গ্রামীণ সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে।

সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আজিমুল হক প্রথম আলোকে বলেন, থানচি ও আলীকদমের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চারটি গ্রাম তলিয়ে গেছে। এসব গ্রামের অন্তত আট হাজার মানুষ গতকাল বিকেল থেকে পানিতে ভাসছেন। এসব এলাকার বীজতলা, সবজিখেত, পেঁপেবাগান নষ্ট হয়ে গেছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, চকরিয়া উপজেলার অন্তত ৩০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাহায্যে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। রাতে বৃষ্টি হলে আরও নতুন এলাকা প্লাবিত হবে।

এদিকে পেকুয়া উপজেলার ১০টি গ্রাম পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে। সরেজমিন দেখা যায়, টৈটং ইউনিয়নের হাজীবাজার, সোনাইছড়ি; শিলখালী ইউনিয়নের মাঝেরঘোনা, হেদায়াতাবাদ, কাছারীমোড়া, পেঠান মাতবরপাড়া; পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মোরারপাড়া, সৈকতপাড়া, পূর্ব মেহেরনামা; বারবাকিয়া ইউনিয়নের পাহাড়িয়াখালী গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এসব এলাকার বসতঘরে পানি ঢুকে পড়েছে।

পেকুয়ার ইউএনও রফিকুল ইসলাম বলেন, মাতামুহুরীর বাঁধ এখনো ঠিক আছে। লোকালয় থেকে পানি বের করতে কিছু স্থানে বাঁধ কেটে দেওয়া হচ্ছে। মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। গতকাল সোমবার বেলা তিনটা থেকে আজ মঙ্গলবার বেলা তিনটা পর্যন্ত এ বৃষ্টি হয়। ১৯৮৩ সালের পর গত ৪৩ বছরে এটিই এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড। এমন অতি ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের পাশাপাশি নগরের নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কিছু এলাকায় পানি জমে থাকলেও অনেক জায়গায় দ্রুত নেমেছে। গত ২৮ এপ্রিলের পর আবার জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে টানা ভারী বৃষ্টি হলেও নগরের জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় এবার তেমন পানি জমেনি। পানি জমলেও দ্রুত নেমেছে।

চট্টগ্রামে রেকর্ড বৃষ্টি, পাহাড়ধসে দুজনের মৃত্যু

চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। গতকাল বেলা তিনটা থেকে আজ বেলা তিনটা পর্যন্ত এ বৃষ্টি হয়। ১৯৮৩ সালের পর গত ৪৩ বছরে এটিই এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড। এমন অতি ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের পাশাপাশি নগরের নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কিছু এলাকায় পানি জমে থাকলেও অনেক জায়গায় দ্রুত পানি নেমেছে। গত ২৮ এপ্রিলের পর আবার জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে টানা ভারী বৃষ্টি হলেও নগরের জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় এবার তেমন পানি জমেনি। পানি জমলেও দ্রুত নেমেছে।

চট্টগ্রাম নগরের রহমাননগর এলাকায় দেয়ালধসে সফিকুল ইসলাম (৩২) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। আজ বেলা দুইটার দিকে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার রহমাননগরের বি ব্লক ৪ নম্বর সড়ক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে আহত নিহত সফিকুলের তাঁর দেড় বছর বয়সী মেয়ে সাইফা ও শাশুড়ি মর্জিনা বেগম (৫৫)। তাঁরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানান পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শফিউল আজম।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় মাটির ঘরের ওপর পাহাড়ের মাটি ও গাছ চাপা পড়ে রেনু আক্তার (৫৬) নামের একজন নিহত হয়েছেন। আজ বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে উপজেলা সদরের ইছাখালী গ্রামে ভারী বৃষ্টিতে গুচ্ছগ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

রেললাইন পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে আটকে রয়েছে কক্সবাজারগামী ট্রেন। আজ দুপরে চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায়

অতি ভারী বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারেনি তিনটি ফ্লাইট। প্রায় সব ফ্লাইট ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা বিলম্বে চলাচল করেছে। ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ ছিল। একই কারণে চট্টগ্রাম নগরের সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল।

টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ, হালিশহর, রামপুরা, ঈশান মহাজন সড়ক, শমসের পাড়া, ফরিদারপাড়া, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, চকবাজার কাঁচাবাজার, মেহেদীবাগ, এম এম আলী সড়ক, ওয়াসা মোড় এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের রাউজান, হাটহাজারী ও রাঙ্গুনিয়ায় বিভিন্ন স্থানে সড়ক ডুবে গেছে। পাহাড়ি ঢলে অক্সিজেন-হাটহাজারীর কুইয়াশ সড়ক পুরোপুরি ডুবে গেছে। এ ছাড়া রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী চুয়েট এলাকায় পানি কাপ্তাই সড়ক-সংলগ্ন হাফেজ বজলুর রহমান সড়কে হাঁটুপানি হয়ে গেছে। মদুনাঘাট সেতুর গোড়া ধসে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছে যান চলাচল। পানি জমেছে রাঙ্গুনিয়া-রাঙামাটি সড়ক ও কাপ্তাই সড়কের একাধিক স্থানে। মিরসরাইয়ে পাহাড়ি ঢলে ডুবেছে তিন গ্রামের সড়ক। উপজেলা ওয়াহিদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ওয়াহিদপুর এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রামীণ রাস্তাও পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে চলাচলের দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামের বাসিন্দারা। পাহাড়ি ঢলে উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পোলমোগরা ও ফেনাপুনি এলাকায় বেশ কিছু সড়ক, ঘরবাড়ি ও একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে।

বাঘাইছড়িতে পাহাড়ধসে বৃদ্ধের মৃত্যু

রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে পাহাড়ধসে লক্ষ্মী বিলাস চাকমা (৭০) নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। আজ সকাল সাড়ে সাতটার দিকে বাঘাইছড়ি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম লাইল্যাঘোনা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। লক্ষ্মী বিলাস চাকমা ওই এলাকার মৃত ধরনাচাষ্য চাকমার ছেলে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মী চাকমার বাড়ি পাহাড়ের পাদদেশে। সকালে বাড়ির পাশে একটি গাছ কাটছিলেন লক্ষ্মী বিলাস চাকমা। এ সময় হঠাৎ তাঁর ওপর পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে। এ সময় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর।

টানা বৃষ্টিতে সড়ক তলিয়ে গেছে হাঁটু পানিতে। বন্ধ যানবাহন চলাচল। পানি ডিঙিয়ে শিক্ষার্থীসহ পথচারীরা ফিরছে গন্তব্যে। ছবিটি খাগড়াছড়ি–রাঙামাটি সড়কের মাইসছড়ি এলাকা থেকে তোলা

প্লাবিত খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়ক

টানা ভারী বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের একাধিক স্থানে পানি উঠে যাওয়ায় আজ সকাল থেকে এ সড়কে সরাসরি সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে খাগড়াছড়ির সঙ্গে রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গতকাল শুরু হওয়া একটানা ভারী বৃষ্টিতে মহালছড়ি উপজেলার চব্বিশ মাইল, মাইসছড়ি ও কেরেঙ্গেনালা এলাকায় সড়ক হাঁটুপানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার লোকজন চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

একটানা বৃষ্টি হওয়ায় জেলার চেঙ্গী, মাইনী নদীসহ বিভিন্ন খাল, ছড়ার পানি দ্রুত বাড়ছে। আজ দুপুর থেকে জেলা সদর, মহালছড়ি ও দীঘিনালার বিভিন্ন নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় বন্যার আশঙ্কা আরও বেড়েছে। দীঘিনালা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের বেলুন মেকার সুভূতি চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, আজ বেলা একটা পর্যন্ত ১৮ ঘণ্টায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।

ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। তবে আজ দুপুর পর্যন্ত জেলার কোথাও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেনি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কাজ শুরু করেছেন। জেলা সদরের শালবন, মোহাম্মদপুর, সবুজবাগ ও কুমিল্লা টিলা এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে। শুষ্ক খাবার ও পর্যাপ্ত সুপেয় পানি রাখা হয়েছে। তা ছাড়া বন্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন এলাকাগুলোর আশপাশের স্কুলগুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে তৈরি রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বান্দরবান ও সাজেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা

টানা দুই দিনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র গতকাল মঙ্গলবার থেকে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যটক ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

গত সোমবার রাতে জারি করা জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলায় অব্যাহত ভারী বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়াজনিত এই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় পর্যটক ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১০ জুলাই (শুক্রবার) পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বান্দরবানের পর রাঙামাটির পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতেও পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। আজ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় জেলা প্রশাসনের মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস এবং সাম্প্রতিক সময়ে রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় অব্যাহত ভারী বর্ষণের কারণে বিভিন্ন স্থানে ভূমিধস ও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে।

এদিকে প্রবল বর্ষণে বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম নাফাখুম জলপ্রপাত এলাকায় ঘুরতে গিয়ে আটকে পড়া ৭৯ পর্যটক ও গাইডকে আজ বিকেল নাগাদ থানচি উপজেলা সদরে আনা হয়েছে। তাঁরা সবাই সুস্থ আছেন। আবহাওয়া ভালো হলে তাদের জেলা সদরে ফিরিয়ে আনা হবে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এবং বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, চকরিয়া, রাউজান ও মিরসরাই প্রতিনিধি]