সারা দেশে ভারি বর্ষণ ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্ট জেলার প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রতিও তিনি এমন নির্দেশনা দিয়েছেন। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী এ কথা জানিয়েছেন। এদিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী ১০ দফা পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে নিজের ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

প্রেস সচিব বলেন, ‘ভারি বর্ষণে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অজস্র পরিবার। প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে কথা বলছেন। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে দুর্গত মানুষজনের পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন।’ বিএনপির চেয়ারম্যান হিসাবে তারেক রহমান দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদেরও দ্রুত দুর্গত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে বলেছেন বলে জানান প্রেস সচিব।

মাহদী আমিন ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘সংকটময় এই সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রধানমন্ত্রী দ্রুততার সঙ্গে মানবিক ও কার্যকর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় দুর্যোগকবলিত এলাকার সার্বক্ষণিক তদারকি ও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সর্বোচ্চ সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলা, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সংসদ-সদস্যদের সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’

চট্টগ্রাম অঞ্চলে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ১০টি উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে-প্রধানমন্ত্রী নিজে সার্বক্ষণিক দুর্যোগকবলিত এলাকার খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং তদারকি করাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও নিয়মিতভাবে ডিসি, ইউএনও এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের দুর্যোগকবলিত এলাকায় এখন পর্যন্ত ১০৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে; যেখানে এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করেছে।

সাধারণ ত্রাণ কর্মসূচির আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার জন্য ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা অনুদান এবং ৩৪৫০ মেট্রিক টন চাল দুর্গত মানুষদের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

সরকারের নির্দেশনায় দুর্গত এলাকায় নিরাপদ খাবার পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুখাদ্য এবং তিনবেলা খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি প্রয়োজনবোধে সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বর্ষণে প্লাবিত অঞ্চল পরিদর্শন, ত্রাণ বিতরণ এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সহায়তার বার্তা পৌঁছে দিতে স্থানীয় সংসদ-সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা দুর্গত এলাকায় ছুটে গিয়ে সার্বক্ষণিক অবস্থান করছেন।

দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী এবং দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সবাই ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক উদ্যোগে ইতোমধ্যেই মাঠে নেমেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় সরকারের প্রশাসন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনাবাহিনী এবং কোস্ট গার্ড মাঠপর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত একযোগে কাজ করছে।

ভারি বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধস পরিস্থিতির কারণে দুর্গত এলাকায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

দুর্যোগে হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমবেদনা জানাতে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বাড়ি পরিদর্শন করেছেন।

টানা ভারি বর্ষণে তলিয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথ ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমাতে ৫ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার রেলপথের উচ্চতা বৃদ্ধির কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এছাড়া পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের জন্য সরকার নিরাপদ স্থানে আবাসনের ব্যবস্থা করবে।

মাহদী আমিন পোস্টে লিখেছেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত, মানবিক প্রয়াস ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হব, ইনশাআল্লাহ। প্রধানমন্ত্রী এই সংকটে গভীর ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে আছেন। জনগণের সরকার সব সময় আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।’

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী : এদিকে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, শুক্রবার প্রায় সারাদিন বন্যাকবলিত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে কথা বলে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানেন। একই সঙ্গে তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিবসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তাদের উদ্ধার, ত্রাণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে কার্যক্রম আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনার নির্দেশনা দেন। রুমন আরও জানান, বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে উদ্ধার, পুনর্বাসন ও চিকিৎসাসহ সার্বিক কার্যক্রম সমন্বয় করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিতকে দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন শনিবার (আজ) চট্টগ্রামে যাবেন।

যুবদলের জরুরি নির্দেশনা, মেডিকেল টিম গঠন : বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা ও মহানগর যুবদল নেতাদের প্রতি জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে যুবদল। একই সঙ্গে একটি মেডিকেল টিমও গঠন করা হয়েছে। শুক্রবার এক বিবৃতিতে এ নির্দেশনা দিয়েছেন যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়ন। বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বন্যা পরিস্থিতিতে পানিবন্দি ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হলো। এর মধ্যে রয়েছে, স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে সমন্বয় করে নিজ নিজ এলাকায় বন্যাকবলিত মানুষের পাশে থেকে উদ্ধার, ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য, ওষুধ, স্যালাইন, স্যানিটারি সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ ও বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ। শিশু, নারী, বয়স্ক, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সহায়তা প্রদান। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয়ভাবে গঠিত মেডিকেল টিমের সদস্যদের কাছ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে পরামর্শ গ্রহণ এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে দুর্গত এলাকায় মেডিকেল টিমের সদস্যদের উপস্থিতির প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিকে অবহিত করতে হবে।

বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়াবে ছাত্রদল : দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতিতে দুর্গত মানুষের উদ্ধার, জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনায় নেতাকর্মীদের প্রতি জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। শুক্রবার সংগঠনের পক্ষ থেকে দেওয়া এক নির্দেশনায় বলা হয়, টানা বর্ষণ ও ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের যে কোনো দুর্যোগ, দুর্বিপাক ও সংকটে দায়িত্বশীল সংগঠন হিসাবে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এবারও বন্যাদুর্গত মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় এবং ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট ইউনিটের নেতাকর্মীদের সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।