চট্টগ্রামে চাঁদা দাবির পর আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠান এক্সাবাইট লিমিটেড এবং ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে কর্মচারীদের বেতনের জন্য রাখা নগদ ৩৫ লাখ টাকা ও ল্যাপটপ লুট করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে প্রতিষ্ঠানটির। নগরীর চকবাজার থানার কাছাকাছি স্থানেই ওই প্রতিষ্ঠানে ১০ মিনিট ধরে চালানো হয় তাণ্ডব।

আজ সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরের চকবাজার থানাধীন এক্সেস রোডে ডিডিএনের কার্যালয়ে এ হামলার ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরা থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল হঠাৎ কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। মুখে মাস্কপড়া এসব সন্ত্রাসী অফিসের কম্পিউটার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন মূল্যবান আসবাবপত্র ভাঙচুর করে।

একপর্যায়ে কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য অফিসে রাখা নগদ ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে যায়। এই হামলার পেছনে দুর্ধর্ষ ক্যাডার বড় সাজ্জাদের অনুসারী ডেভিড ইমনের সহযোগীরা জড়িত থাকার ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সম্প্রতি ইমন মোবাইল ফোনে ওই ব্যবসায়ীর কাছে ২ কোটি টাকা চাঁদা চায়, না দিলে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলারও হুমকি দেওয়া হয়। তাদের কথাবার্তার অডিও রেকর্ড থেকে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ডিডিএনের পরিচালক রিদোয়ানুল কবির বলেন, হঠাৎ ১৫-২০ জন অস্ত্রধারী আমাদের অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। তারা অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর করে এবং কর্মচারীদের বেতনের জন্য রাখা ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। অফিসের সব কম্পিউটার ভেঙে ফেলা হয়েছে।

হামলার ঘটনার পর সামনে এসেছে ডিডিএনের স্বত্বাধিকারীকে মোবাইফোনে হুমকির কল রেকর্ড। সেখানে ডেভিড ইমন নামে এক ব্যক্তি চাঁদা দাবি করেন। সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করায় এ হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইমন নগরীর শীর্ষ সন্ত্রাসী শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ ওরফে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর সন্ত্রাসী। তার নামে অন্তত ৭টি হত্যা মামলা রয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত পুলিশ হামলাকারীদের পরিচয় ও ঘটনা কাদের সংশ্লিষ্টতা আছে—সেই প্রসঙ্গে কিছুই জানায়নি।

এদিকে হামলার আগে ডিডিএনের স্বত্বাধিকারী আদিল বিন মানুনের মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়ার একটি কল রেকর্ড আজকে প্রকাশিত হয়েছে। ওই কলরেকর্ডে নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, আমি আপনাকে দুই দিনের সময় দিচ্ছি। এর মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলবেন। এখন আমাদের ছেলেরা ব্যবসা করবে। ব্যবসা করতে হলে আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হবে, না হলে ব্যবসা করবেন না। ১৭ বছর অনেক ব্যবসা করেছেন।

কলরেকর্ডে ইমন আরও বলেন, ইমনকে না চিনলে পুলিশ কমিশনারের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন। সাজ্জাদ গ্রুপের ডেভিড ইমন কল দিয়েছে।

এর জবাবে আদিল বিন মানুন বলেন, আপনারা কেন আমার ওপর এত ক্ষিপ্ত? এখানে তো আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে।? তখন অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, চট্টগ্রাম শহরের সবাই আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবসা করছে। ব্যবসা করতে হলে আমাদের সঙ্গে কমিটমেন্ট করে করবেন।

ডিডিএনের একটি সূত্রের দাবি, এককালীন ২ কোটি টাকা এবং পরে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। এতে সায় না দেওয়ায় হামলা করেছে সাজ্জাদ বাহিনী।

এই বিষয়ে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন বলেন, হামলার খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। মোবাইলফোনে হুমকির প্রসঙ্গে ওসি বলেন, আমরা সবকিছু বিবেচনায় রেখে তদন্ত চালাচ্ছি।

এ ঘটনার পর থেকে নগরের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ মোট ৭টি মামলার আসামি।

পুলিশের ভাষ্য, ইমন অন্তত ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেন—এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তাঁর ছিল বলে পুলিশের দাবি।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুজন। তাঁদের একজন ডেভিড ইমন। এর আগে দেশে এই দলের নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ।