ভাঙ্গা-কুয়াকাটা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করাসহ ৪ দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে বরিশালের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার মানুষ। রাজনৈতিক দলের বাইরে এ ধরনের উদ্যোগ এবারই প্রথম। এর আগে স্থানীয় নানা ইস্যুতে এলাকাভিত্তিক আন্দোলনের ইতিহাস থাকলেও সমন্বিত দাবিতে বিভাগজুড়ে আন্দোলনে নামার ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে ক্ষোভের ঝড় তুলেছেন বরিশাল অঞ্চলের সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিরা। রাজধানী ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে হয়েছে মানববন্ধন-বিক্ষোভ। একইভাবে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ হয়েছে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদী, বরিশাল নগরীসহ বিভিন্ন এলাকায়। বুধবার ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কজুড়ে মানববন্ধনের ঘোষণা দিয়েছে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার বাসিন্দারা। সবমিলিয়ে দিনদিন যেমন বাড়ছে আন্দোলনের বিস্তার, তেমনই দলমতনির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ যোগ দিচ্ছে এই আন্দোলনে।
সব সরকারের আমলে অবহেলিত হিসাবে চিহ্নিত বরিশাল বিভাগের উন্নয়নে কখনোই নেওয়া হয়নি সমন্বিত কোনো উদ্যোগ। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগে ব্যবহৃত একমাত্র সড়কটি রয়ে গেছে সিঙ্গেল লেনে। ২৪ ফুট থেকে কোথাও কোথাও ৩৬ ফুট প্রশস্ত এই সড়ক দিয়েই চলে ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণের ১০ জেলার যোগাযোগ। এমনকি পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা আর পায়রা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগেও ব্যবহার হয় এই সড়কটি। বহু আগে থেকেই সড়কটিকে ৬ লেনে উন্নীত করার দাবি ছিল বরিশাল অঞ্চলের মানুষের। পদ্মা সেতু চালুর পর সেই দাবি রূপ নেয় জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে। কেননা সেতু চালুর পর এই সড়কে আগের তুলনায় শতগুণ বেড়েছে যান চলাচল। সরু সড়কে লাখ লাখ যানবাহন চলতে গিয়ে প্রতিদিনই যেমন ঘটছে দুর্ঘটনা, তেমনই আহত-নিহত হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ।
বিএনপি এসব দাবি পূরণের উদ্যোগ নেবে বলে আশায় ছিল মানুষ। কেননা এখানে থাকা ২১টি নির্বাচনি এলাকার মধ্যে ১৮টিতেই জয়ী হয়েছেন বিএনপি ও বিএনপি সমর্থিত দলগুলোর প্রার্থীরা। বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটে এসব খাতে বিশেষ বরাদ্দ থাকবে বলে আশা করেছিলেন জনগণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আশা পূরণ হয়নি। বিশেষ বরাদ্দ না দেওয়ায় জাতীয় সংসদের বাজেট আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ জানান বরিশাল অঞ্চলের সংসদ-সদস্যরা। অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে সংসদে বক্তব্য দেন পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ-সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন, বরিশাল-৫ আসনের মজিবর রহমান সরোয়ার, বরিশাল-৩ আসনের অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, বরিশাল-২ আসনের সরফুদ্দিন সান্টু, ভোলা-১ আসনের আন্দালীব রহমান পার্থ, ভোলা-৪ আসনের নুরুল ইসলাম নয়ন, পিরোজপুর-৩ আসনের রুহুল আমিন দুলাল, পটুয়াখালী-২ আসনের ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, পটুয়াখালী-১ আসনের আলতাফ হোসেন চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন সংসদ-সদস্য। খোদ স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ পর্যন্ত হতাশা ব্যক্ত করেন ভোলা-বরিশাল সেতুর জন্য কোনো বরাদ্দ না থাকায়। জাতীয় সংসদে এমপিদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি সংসদের বাইরে রাজপথেও ছড়ায় ক্ষোভ। ২৭ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ভাঙ্গা-কুয়াকাটা সড়ক ৬ লেন করাসহ ৪ দাবি পূরণে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার দাবিতে মানববন্ধন-বিক্ষোভ করেন ঢাকায় বসবাসরত বরিশালের বাসিন্দারা। সেখানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সাবেক এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ একাধিক এমপি ও সুশীল সমাজের নেতারা।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবায়েদুল হক চান বলেন, উন্নয়নের ৪ দাবি আদায়ে সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিদের এভাবে একযোগে সংসদে কথা বলা বরিশাল অঞ্চলের ক্ষেত্রে এবারই প্রথম। তাছাড়া এগুলো তো কেবল দাবি নয়, দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লাইফলাইন। এখানে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা আছে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর আছে, পটুয়াখালীতে নির্মাণ হচ্ছে ইপিজেড। এখন সড়ক যদি অপ্রশস্ত থাকে, তাহলে কি এই ইপিজেড কিংবা পুরো বরিশাল অঞ্চলে নতুন কোনো শিল্প-কলকারখানা আসবে?
বরিশাল সদর আসনের এমপি মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, জরুরি এসব দাবি যাতে পূরণ হয়, সেজন্য এক হয়ে আলোচনা করেছি। সেখানে বরিশাল অঞ্চলের প্রায় সব এমপি ছিলেন। আমরা এখন বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করব। তিনি অবশ্যই এসব দাবি পূরণে ব্যবস্থা নেবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।








