বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়ে দেশটির তারকা স্ট্রাইকার নেইমার বলেছেন, ‘এখানেই সব শেষ হয়ে গেলো।’
এমনটি বলার পর নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে নিয়ে যখন জল্পনা তুঙ্গে, তখন ছেলেকে ফুটবল না ছাড়ার আবেগঘন আহ্বান জানিয়েছেন তার বাবা নেইমার ডি সিলভা সান্তোস সিনিয়র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দীর্ঘ এক বার্তায় তিনি ছেলেকে অনুরোধ করেন, হতাশা বা সমালোচনাকে পাশে সরিয়ে রেখে আবারও হাসিমুখে ফুটবল খেলতে।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় নরওয়ের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। ম্যাচ শেষে আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় নেইমার বলেছিলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি, কিন্তু এখানেই শেষ। আমি এখানেই থামছি।’ সেই বক্তব্যের পর থেকেই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, হয়তো ক্যারিয়ারের ইতি টানতে পারেন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
তবে ছেলের সেই হতাশার মুহূর্তে পাশে দাঁড়িয়ে ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন তার বাবা। ‘বাবা হিসেবে তোমার কাছে আমার একটি অনুরোধ।’ ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত দীর্ঘ চিঠির শুরুতেই তিনি স্মরণ করেন ছোট্ট নেইমারের ফুটবলযাত্রা।
‘মনে হয় যেন সেদিনের কথা। ছোট্ট একটি ছেলে, পায়ে একটি বল, বড় বড় স্বপ্ন দেখছে। তখনও ভাবিনি, ঈশ্বর তোমাকে এত দূর নিয়ে যাবেন। খুব ছোটবেলাতেই বুঝেছিলাম, তোমার মধ্যে শুধু প্রতিভা নয়, একটি বিশেষ উদ্দেশ্যও রয়েছে।’
এরপরই ছেলের উদ্দেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুরোধটি করেন তিনি। ‘বাবা হিসেবে তোমার কাছে আমার একটি অনুরোধ- ফুটবলটা খেলেই যাও।’ তিনি লিখেছেন, আবার যেন বল পায়ে আনন্দ ফিরে পায় নেইমার।
‘আবার বল পায়ে নিয়ে আনন্দ খুঁজে নাও। মাঠে আবার হাসো। আজ তুমি সুস্থ। ঈশ্বর তোমাকে আবারও সেই সুযোগ দিয়েছেন, যা তুমি ছোটবেলা থেকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে।’
নেইমারের বাবা মনে করেন, একজন ফুটবলারের জীবনে সমালোচনা, প্রত্যাশা কিংবা ব্যর্থতা থাকবেই; কিন্তু এগুলোর ভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া উচিত নয়। তিনি লিখেছেন, ‘জীবনের সিদ্ধান্ত, সমালোচনা, প্রত্যাশা কিংবা ব্যর্থতার বোঝা কাঁধে নিও না। কিছু বিষয় মানুষের হাতে থাকে, কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত শুধুই ঈশ্বরের।’
তার বিশ্বাস, একটি কঠিন মুহূর্ত কখনোই একজন মানুষের পুরো গল্প নির্ধারণ করে না। ‘আজকের একটি সিদ্ধান্ত তোমার পুরো জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে না। কোনো স্বপ্ন এখনও পূরণ না হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেটি শেষ হয়ে গেছে। জীবনের শেষ অধ্যায় লেখেন ঈশ্বর।’
চিঠিতে নেইমারের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের নানা মুহূর্তও স্মরণ করেছেন তিনি। প্রথম গোল, পেশাদার ফুটবলে অভিষেক, বিশ্বের বড় বড় স্টেডিয়ামে খেলা, ব্রাজিল জাতীয় দলে সাফল্য- সবই কাছ থেকে দেখেছেন একজন বাবা হিসেবে। তবে তার মতে, ছেলের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন ট্রফি নয়।
‘পেছনে তাকালে আমি শুধু ট্রফি, গোল কিংবা খ্যাতি দেখি না। আমি অলৌকিক ঘটনা দেখি। আমি ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি পূরণ হতে দেখি। ঈশ্বর তোমাকে আরও বড় কিছু দিতে পারেন।’
নেইমারের বাবার বিশ্বাস, ক্যারিয়ারের সেরা অধ্যায় এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তিনি লিখেছেন, ‘সেরাটা বয়স কিংবা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। সেরাটা নির্ভর করে ঈশ্বরের ওপর। সামনে এমন কিছু অধ্যায় থাকতে পারে, যা তুমি এখনও কল্পনাও করতে পারছ না। মানুষের ভালোবাসার আগে ঈশ্বরের ভালোবাসা।’
চিঠির শেষ অংশটি ছিল সবচেয়ে আবেগঘন। তিনি লিখেছেন, ‘আনন্দ নিয়ে ফুটবল খেলো। মানুষকে আবার আনন্দ দাও। ছোটবেলায় ঈশ্বর তোমার হাতে যে প্রতিভা তুলে দিয়েছিলেন, সেটাই আবার উপহার দাও পৃথিবীকে।’
সবশেষে ছেলের উদ্দেশে বলেন, ‘একটি কথা কখনো ভুলে যেও না- পৃথিবী তোমাকে ভালোবাসার অনেক আগেই ঈশ্বর তোমাকে ভালোবেসেছেন। আর বাবা হিসেবে আমি আবারও সবকিছু করতাম- প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি ভ্রমণ, প্রতিটি নির্ঘুম রাত, প্রতিটি প্রার্থনা।’
নেইমারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব
বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু জানাননি নেইমার। তবে বাবার এই আবেগঘন বার্তা ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ব্রাজিলের সমর্থকদের বড় একটি অংশও চাইছে, দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা যেন আবেগের বশে ক্যারিয়ারের ইতি না টানেন। বরং সুস্থ হয়ে আবার মাঠে ফিরে নিজের ফুটবলীয় জাদুতে দর্শকদের মুগ্ধ করেন।
আইএইচএস/








