এই ভ্রমণকাহিনিতে কবির নিবাস ঘুরে দেখা কেবল স্থাপত্য বা স্মৃতিচারণা নয়; পাবলো নেরুদার জীবন, প্রেম, সমুদ্রপ্রীতি ও ইতিহাসের সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত অনুভব মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
লা চাসকোনা
সকালে হোস্টেল ম্যানেজার বারবারা আমায় লিখেয়ে-পড়িয়ে এবং রীতিমতো সাদা কাগজে নগরের মেট্রো রেলপথের মানচিত্র এঁকে এঁকে বারবার বুঝিয়ে দিচ্ছেন কীভাবে দুখানা মেট্রো ব্যবহার করে শহরের শেষ সীমানায় নেরুদার বাড়ি পৌঁছাব। তারপরে আর মেট্রো স্টেশন নেই, সেখানেই সান ক্রিস্টোবাল পাহাড়ের পাদদেশে নেরুদার বাড়ি।
ছোটবেলায় শিশু রবিঠাকুর একবার পিতার সঙ্গে হিমালয় যাত্রা করছিলেন। তাঁর বড় দাদা তাঁকে বারবার বলেছিলেন, ‘…বিশেষ দক্ষতা না থাকিলে রেলগাড়িতে চড়া এক ভয়ংকর সংকট—পা ফসকাইয়া গেলেই আর রক্ষা নাই। তারপর গাড়ি যখন চলিতে আরম্ভ করে, তখন শরীরের সমস্ত শক্তিকে আশ্রয় করিয়া খুব জোর করিয়া বসা চাই, নহিলে এমন ভয়ানক ধাক্কা দেয় যে, মানুষ কে কোথায় ছিটকাইয়া পড়ে তাহার ঠিকানা পাওয়া যায় না।’
কিন্তু রবিঠাকুর এত সহজেই রেলে উঠে বসলেন আর ভাবতে লাগলেন রেলে ওঠার আসল কাজটি বোধ হয় এখনো বাকি আছে। তিনি এরপর ন্যূনতম বিপদের আভাস না পাওয়াতে বরং বিমর্ষ হয়ে গিয়েছিলেন। আমার ক্ষেত্রেও বারবারা এতটাই বিচলিত ছিলেন আমার ‘লা চাসকোনা’ যাত্রায় যে রবিঠাকুর আমার স্মরণে এলেন।
সান ক্রিস্টোবাল পাহাড়ের ঢালে নেরুদার বাড়ি। পাবলো নেরুদা তাঁর ছদ্মনাম। একাধারে নোবেল বিজয়ী কবি, রাজনীতিক, কূটনীতিক। মাত্র ১৩ বছর বয়সে কবি স্বীকৃতি পেয়েছেন। চিলির জাতীয় শতাব্দীতে তাঁর একটি কবিতার বই বিক্রি হয়েছে ২০ মিলিয়নেরও বেশি।
এলাকাটি নিরিবিলি, শান্ত। পরিত্যক্ত একটা বাড়ি কিনে তৃতীয় স্ত্রী মাতিলদাকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী ডালিয়া বয়সে নেরুদার ২০ বছরের বড় ছিলেন। কথিত আছে ডালিয়ার কাছ থেকে আড়ালে থাকার জন্য এখানে বাড়ি কেনেন। তাঁর নতুন স্ত্রীর চুল ছিল কোঁকড়ানো। তাই এ বাড়ির নাম লা চাসকোনা, অর্থাৎ কোঁকড়ানো চুল।
বাড়ির নিচতলাতেই টিকিটের ব্যবস্থা।

টিকিট হাতে দিতে দিতে অফিসার মানুষটি জানালেন কক্ষের মধ্যে কোনো রকম ছবি তোলা যাবে না। যাবে না মানে যাবেই না। টিকিটের সঙ্গে একটি ছোট ডিভাইস ধরিয়ে দিলেন। দুই দশক আগে নকিয়ার মুঠোফোনগুলো দেখতে যেমন ছিল, ঠিক তেমন দেখতে, তবে তার চেয়ে ওজনে হালকা। গলায় ঝুলিয়ে নিলাম সেটাকে। অফিসার বললেন, প্রতিটি ছবি বা প্রদর্শিত দ্রব্যের পাশে একটি করে নম্বর দেওয়া আছে। ডিভাইসে সেই নম্বরটি চাপ দিলে ডিভাইস ওই ছবি সম্পর্কে তথ্য দিতে শুরু করবে।
অভ্যর্থনা কক্ষ পেরিয়ে বাইরে উঠানে এসে ছোট্ট একটি সিঁড়ি দিয়ে সরাসরি ওপরে উঠে গেলাম পাহাড়ের আরেকটু উঁচুতে। এখানে পাশাপাশি তিনটি ঘর। তিনটির একটি খাবার ঘর। মেঝে কাঠের। টেবিলে সাজানো আছে নানা দেশ থেকে আনা খাবার ও সুরা পরিবেশনের বিশেষ পাত্র। বন্ধুদের সুরা দিয়ে আপ্যায়ন করতে পছন্দ করতেন তিনি। কূটনীতিকের চাকরির কারণে পৃথিবীর নানা দেশে থাকতে হয়েছিল। যেখানেই গেছেন জিনিসপত্র নিয়ে এসেছেন। ঘরের জানালাগুলোতে দেখলাম তাঁর স্ত্রী মাতিলদার নামের আদ্যক্ষরের সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করেছেন।
পাশের কক্ষটিতে একটি বিছানা পাতা। দেখে মনে হলো শোবার ঘর। এ ঘরের জানালা জাহাজের জানালার মতো বৃত্তাকার। দীর্ঘ জীবন সমুদ্রে কাটিয়েছেন। সমুদ্রপ্রেমী ছিলেন। ছোটবেলায় নেরুদাকে তাঁর পিতা একবার সমুদ্র দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। নেরুদা সমুদ্রের ঢেউকে ভেবেছেন মাথার বহু মিটার ওপরে উঠে আসা বিশাল তুষারপাত, এক মহাবিশ্বের হৃৎস্পন্দন।
নেরুদা তাঁর কবিতায় বারবার সমুদ্রে ফিরে গেছেন, সমুদ্রকে নিজের বাড়ি ভেবেছেন। নিজেকে একজন ‘আর্মচেয়ার নাবিক’ ভাবতেন। কেউ কেউ পাবলো নেরুদার বাড়িকে বলেন সমুদ্রের মন্দির। তিনি তাঁর ভ্রমণে সমুদ্র এবং মহাসাগরের মুখোমুখি হয়েছেন বারবার। সমুদ্র এবং মহাসাগরের মেজাজ বর্ণনা করেছেন কবিতায়। কক্ষের বৃত্তাকার জানালা আমায় সে কথা মনে করিয়ে দেয়।

প্রতিটি ঘর থেকে বাগানে যাওয়া যায়। নিজের তদারকিতে নিজের পছন্দমতো ডিজাইনে এই বাড়িটি বানান। নেরুদার ঘরের দেয়ালে ঝুলছে লাতিন চিত্রকর দিয়েগো রিভেরার আঁকা ছবি। সে ছবিতে আঁকা হয়েছে নেরুদার স্ত্রী মাতিলদাকে। মাতিলদা এখানে বিশেষ ভঙ্গিমায়। চিত্রকলায় মাতিলদার দুটি মুখ কিন্তু মাথা একটি। মুখ দুটি দুদিকে। একটি মুখ দর্শকের দিকে অর্থাৎ সামনের দিকে; অপরটি বাঁয়ে তাকানো। মাতিলদার কোঁকড়া চুল। চিত্রকলার এই কোঁকড়া চুলে ভেসে উঠেছে নেরুদার মুখ।
দেয়ালের আরেকটি ছবি থেকে আমি মনোযোগ সরাতে পারছি না। সেটি আমাদের শ্রীলঙ্কার সমুদ্রসৈকতের ছবি। সৈকতে দাঁড়িয়ে নেরুদা। আকারে খুব ছোট সে ছবি, বেশ কাছে গিয়ে তাকাতে হয়, তবেই স্পষ্ট হয়। নেরুদার সাহিত্যিক খ্যাতি চিলির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। সে সময়কার একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেরুদাকে কিছু দেশের তালিকা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল কোথায় যেতে চাও কূটনীতিক হিসেবে।

তিনি এক অচেনা-অজানা শহরের নাম বলেছিলেন। সেটি আর কিছু নয়, একেবারে আমাদের পাশের দেশ বার্মা মানে বর্তমানের মিয়ানমার। বার্মার পরে তিনি সিলনে (আধুনিক শ্রীলঙ্কা) চিলিয়ান দূতাবাসে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। থাকতেন কলম্বোর ওয়েলাওয়াতে সমুদ্রতীরবর্তী একটি কুটিরে। শ্রীলঙ্কায় তাঁর দিনের রুটিন সম্পর্কে নেরুদা লিখেছিলেন কোনো এক নথিতে, ‘আমি তাড়াতাড়ি উঠে কয়েক ঘণ্টা সমুদ্রসৈকতে হাঁটাহাঁটি করি। তারপর আমি জলে স্নান করি, যা সর্বদা উষ্ণ থাকে এবং আমি সাঁতার কাটতে চেষ্টা করি। তারপর আমি একটি চমৎকার মধ্যাহ্নভোজের জন্য বাড়ি ফিরে যাই।’
দেয়ালের ছবিটি যেন শ্রীলঙ্কার সে সময়ের কথাই বলছে।
বাড়ি থেকে বের হতেই ছোট উঠান। হরেক রকম গাছ। উঠানে চেয়ার-টেবিল পাতা আছে। দর্শনার্থীরা বসতে পারেন সেখানে। আপাতত উঠানে আমি একা। আশপাশে কেউ নেই। স্টিলের ওপরে সাদা ধবধবে রং করা এক চেয়ারে বসে পড়লাম। আমি আমার ক্যামেরা বের করলাম। নির্দেশ ছিল ঘরের মধ্যে কোনো ছবি তোলা যাবে না। বাগানের ছবি তোলা যাবে না এমন তো বলেনি। আমি অতি সতর্কতায় বাগানের কিছু ছবি বন্দী করলাম ক্যামেরায়। ক্যামেরায় যখন ‘ক্লিক’ করে একটি ক্ষীণ শব্দ হয়, মনে হয় যন্ত্রটাকে দুমড়েমুচড়ে এমন দশা করি যেন সে আর শব্দ করতে না পারে।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, যেসব দেশে সমাজতন্ত্র কায়েম হয়েছিল একদা তারা ধীরে ধীরে অনেক সন্দেহপ্রবণ হয়েছে। সহসা তারা অন্য জাতিগোষ্ঠীর নাগরিককে বিশ্বাস করতে পারে না। এর অবশ্য যথেষ্ট কারণও আছে। নানা চরবৃত্তি বা গোয়েন্দাবৃত্তি ঘটেছে এসব দেশে নানা সময়ে। সেই সংশয় থেকে বারবার মনে হচ্ছে, না জানি কোন কোন গাছের ঝোপে আছে ক্যামেরা। কেউ বা কারা কোনো এক গোপন কক্ষে বসে সেগুলো তদারকি করছে। এই বুঝি আমাকে খপ করে ধরে আমার ক্যামেরা জব্দ করে আমায় জেলে ঢুকিয়ে দেবে। আমি আমার ক্যামেরা বন্ধ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম।
এ উঠান থেকে সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের আরেক অংশে উঠলে একটি বার, সামনে বৃহৎ কাচ দিয়ে ঘেরা। ভেতরে প্রবেশের সুযোগ নেই। তবে বাইরে থেকে তার সবটা স্পষ্ট দৃশ্যমান। নিকট বন্ধুদের নিয়ে পানাহার চলত এখানে। পাশের কক্ষে দর্শনীয় অনেক সামগ্রী। তার একটি আমার কোমর অবধি উঁচু কাপড়ের তৈরি হাতি। আমার গলায় ঝোলানো অডিও টেপটিতে চাপ দিলাম। যন্ত্রের ভার্চ্যুয়াল কণ্ঠটি বলে যাচ্ছে যা তা হলো—নেরুদা এটি সংগ্রহ করেছেন ভারত থেকে। তাইতো হবে কারণ যে কাপড় দিয়ে এ হাতি তৈরি তা তো ভারতীয়। সে আমি বেশ বুঝেছি।

এখান থেকে বেরিয়ে আরেক সিঁড়ি দিয়ে পাহাড়ের আরেক ধাপ ওপরে উঠে গেলাম। সেখানেও দু–তিনটি কক্ষ। একটি কক্ষ নেরুদার লাইব্রেরি। লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা দেখে মন ভারাক্রান্ত হলো। নেহাত কম। দেখি তো, অডিও যন্ত্র কী বলে? নেরুদার এত এত বই কোথায় গেল? গলায় ঝোলানো অডিও যন্ত্র বলছে নেরুদা তাঁর প্রায় সব বই বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করেছেন। বাকি সামান্য কিছু বই তাঁর তিন বাড়িতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে। আমার পরাণ শান্ত হলো।
চারদিক শান্ত। কোলাহলহীন। একজন নিরাপত্তাকর্মী দাঁড়িয়ে। একজন মালি গাছে পানি দিচ্ছেন। গাছের গোসল হচ্ছে। পাতাগুলো সজীব থেকে সজীবতর হচ্ছে। এ নির্জনতায় আমার মন বারবার ডেকে বলছে, নেরুদা, বাড়ি আছ? (শেষ)
ছবি: লেখক, উইকিপিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যম
নোট: লা চাসকোনার ভিতরে ছবি তোলা নিষেধ থাকায় কিছু ছবি সামাজিক মাধ্যম থেকে নেওয়া হয়েছে।








