ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরদার করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ লক্ষ্যে রাশিয়ার জ্বালানি তেলের শীর্ষ ক্রেতাদের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক আমদানি শুল্ক (ট্যারিফ) আরোপের একটি সংশোধিত নিষেধাজ্ঞা বিল উত্থাপন করেছেন মার্কিন সিনেটের একদল সদস্য। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট দ্বিদলীয় এই বিলটিতে মূলত রাশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি তেল ও গ্যাস কেনা শীর্ষ পাঁচটি দেশকে নিশানা করা হয়েছে, যার মধ্যে সরাসরি আক্রান্ত হতে যাচ্ছে চীন ও ভারত।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করা রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিলটি পাসের তোড়জোড় শুরু হয়েছে।

গত শনিবার (১১ জুলাই) ৭১ বছর বয়সে সিনেটর গ্রাহামের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর মাত্র এক দিন আগে ইউক্রেন সফরকালে গ্রাহাম ঘোষণা করেছিলেন, এই বিলটি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর চূড়ান্ত আলোচনা হয়েছে। গ্রাহামের আকস্মিক মৃত্যুর পরই দুই দলের ২৬ জনেরও বেশি সিনেটরের সমর্থনে বিলটি দ্রুত পাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বিলটির পক্ষে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ‘এই বিলটি পাস হওয়ার দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। এটি লিন্ডসের অত্যন্ত প্রিয় একটি কাজ ছিল। তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতেই এটি করা হতে পারে’।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথালও উল্লেখ করেছেন, ইউক্রেন যখন যুদ্ধক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তখন রাশিয়ার অর্থের উৎস বন্ধ করতে এই বিলটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ভূমিকা রাখবে।

তবে সংশোধিত এই নতুন বিলে আগের খসড়ার তুলনায় কিছুটা নমনীয়তা দেখানো হয়েছে। আগে রাশিয়ার জ্বালানি তেল কেনা দেশগুলোর ওপর ঢালাওভাবে ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হলেও হোয়াইট হাউসের আপত্তির মুখে সমঝোতার ভিত্তিতে তা সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে নতুন এই নিয়মে একটি বিশেষ ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে যেসব দেশ রাশিয়ার মোট প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির ১৫ শতাংশের কম আমদানি করে এবং মস্কোর ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে, তারা এই শাস্তিমূলক শুল্কের আওতা থেকে সম্পূর্ণ ছাড় পাবে।

এই নিয়মের কারণেই মূলত ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জাপান ও হাঙ্গেরির মতো ইউরোপীয় ও পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা রাশিয়ার মোট গ্যাসের ১৫ শতাংশের কম আমদানি করে। কিন্তু রাশিয়ার অপরিশোধিত ক্রুড অয়েলের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা—চীন, ভারত, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও আজারবাইজানের ওপর এই ছাড় প্রযোজ্য হচ্ছে না। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সস্তায় রুশ তেল কেনার পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া চীন ও ভারতের ওপর সরাসরি এই শতভাগ শুল্কের খড়্গ পড়তে যাচ্ছে।

ভারত ও চীনকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের এমন অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত বছরও রুশ তেল কেনার অপরাধে ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন, যা পরে আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যাহার করা হয়। তবে চলতি বছরের ১৭ জুন ভারতের জন্য মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের দেওয়া বিশেষ সাময়িক ছাড়ের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে নতুন করে রুশ তেল কেনা নিয়ে আইনি জটিলতায় রয়েছে নয়াদিল্লি।

মার্কিন সিনেট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট চাইলে এই নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক সাময়িকভাবে শিথিল বা মওকুফ করার আইনি ক্ষমতা পাবেন। তবে মূল লক্ষ্য হলো চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে রুশ জ্বালানি বর্জন করতে বাধ্য করা। শুল্ক ছাড়াও এই বিলের মাধ্যমে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা, আর্থিক খাত এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে ব্যবহৃত রাশিয়ার শ্যাডো ফ্লিট বা ছায়া বহরের ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে।