তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শুরুর ঠিক আগের দিন ৬ জুলাই পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে উৎক্ষেপণ করে চীন। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) নৌবাহিনী জানায়, প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সিমুলেটেড ওয়ারহেড বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রশান্ত মহাসাগরে নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানে।

ছবি: চায়না মিলিটারি বিউগল

তবে, এ পরীক্ষা ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। চীনের এমন সামরিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর মধ্য দিয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে সামরিক প্রতিযোগীতাও স্পষ্ট হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, উৎক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল জেএল-৩ (JL-3)। এই দশকের শুরুতে চীনা নৌবাহিনীর টাইপ-০৯৪ শ্রেণির কৌশলগত পারমাণবিক সাবমেরিনের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে, এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের অল্প কিছুক্ষণ আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক করে চীন।

চীনের টাইপ-০৯৩, টাইপ-০৯৪ এবং নতুন ‘সেইলবিহীন’ নকশার পারমাণবিক সাবমেরিন/ ছবি: চায়না মিলিটারি বিউগল

বেইজিং দাবি করে, এটি তাদের বার্ষিক নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা লক্ষ্যবস্তুকে উদ্দেশ্য করে পরিচালিত হয়নি।

জানা গেছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি বোহাই সাগর থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং প্রায় ৭ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। পরীক্ষার সময় এটি জাপানের ওয়াকায়ামা প্রিফেকচারের হোনশু দ্বীপের দক্ষিণতম প্রান্ত কেপ শিও-এর দক্ষিণ দিকের জলসীমার ওপর দিয়ে উড়ে যায়।

জাপানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রের ডামি ওয়ারহেড জাপানের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (EEZ) বাইরে পড়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আসল উদ্বেগ ক্ষেপণাস্ত্র কোথায় পড়েছে তা নয় বরং চীন দ্রুতগতিতে তাদের সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা শক্তিশালী করছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, পরীক্ষায় চীনের সর্বাধুনিক জেএল-৩ (JL-3) সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। এমন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র চীনের উপকূল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম।

চীন বর্তমানে জিন-শ্রেণির (টাইপ-০৯৪) পারমাণবিক সাবমেরিন পরিচালনা করছে এবং আরও উন্নত ও অধিক গোপনীয় টাইপ-০৯৬ সাবমেরিন তৈরি করছে। এ ধরণের সাবমেরিন শনাক্ত করা আরও কঠিন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, চীনের এই নিরস্ত্র আন্তঃমহাদেশীয় পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাটি পর্যবেক্ষণ করেছে পেন্টাগন। ওয়াশিংটন অভিযোগ করেছে, চীনের দ্রুত ও অস্বচ্ছ পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

জাপানও চীনের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এই পরীক্ষাকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অস্বস্তিকর বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরকে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে আমরা আগ্রহী নই।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) পরীক্ষার পর এবার সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ বেইজিংয়ের পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতার নতুন প্রদর্শন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক পরিকল্পনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।

কেএম